• 29 Oct, 2026

রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য: সুন্দরবনের পর দেশের বৃহত্তম প্রাকৃতিক বন

রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য: সুন্দরবনের পর দেশের বৃহত্তম প্রাকৃতিক বন

হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য (১৯৮২, ১,৭৯৫.৫৪ হেক্টর) — ৬৩৮ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৩৭ স্তন্যপায়ী ও ১৬৭ প্রজাতির পাখি, মালায়ন বড় কাঠবিড়ালীর একমাত্র আবাস; ট্রেইল, ওয়াচটাওয়ার, রুট ও থাকার যাচাইকৃত গাইড।

একই চুনারুঘাট উপজেলায় আগের পোস্টে দেখা সাতছড়ি ছিল ২৪৩ হেক্টরের সাজানো উদ্যান; সেখান থেকে আরও ভেতরে গেলেই চরিত্র বদলে যায় — রেমা-কালেঙ্গা প্রায় সাত গুণ বড়, বুনো আর প্রাচীন। শতবর্ষী চাপালিশের গুঁড়ি জড়িয়ে থাকা মোটা লতা, তলা ছায়াময়, আর মাথার ওপরে ভীমরাজের ডাক — এটি বাংলাদেশের হাতে-গোনা টিকে থাকা প্রাকৃতিক বনগুলোর একটি, যাকে কেউ কেউ দেশের একমাত্র ‘কুমারী বন’ (ভার্জিন ফরেস্ট) বলেও থাকেন (শিক্ষক বাতায়ন)।

পরিচিতি: চার বিটের এক বন

  • প্রতিষ্ঠা: বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে ১৯৮২ সালে প্রথম ১,০৯৫ হেক্টর নিয়ে অভয়ারণ্য ঘোষিত; ১৯৯৬ সালের ৭ জুলাইয়ের প্রজ্ঞাপনে সম্প্রসারিত হয়ে বর্তমান ১,৭৯৫.৫৪ হেক্টর (বন অধিদপ্তরের তথ্য, আইনিউজ)। আশপাশের সংরক্ষিত বনাঞ্চল মিলিয়ে পুরো কমপ্লেক্সের আয়তন ~৬,০০০ হেক্টর বলেও কোনো কোনো সূত্রে পাওয়া যায় — তবে অভয়ারণ্যের সরকারি হিসাব ওই ১,৭৯৫.৫৪ হেক্টরই।
  • গঠন:রেমা, কালেঙ্গা, ছনবাড়ি ও রশিদপুর — এই চার বিটে ভাগ করা পুরো এলাকা; তরফ পাহাড় সংরক্ষিত বনের অংশ। পূর্ব-দক্ষিণে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, দক্ষিণ-পশ্চিমে রেমা চা বাগান (উইকিপিডিয়া/শিক্ষক বাতায়ন)। রক্ষণাবেক্ষণে রয়েছে ১১টি ইউনিট ও ৭টি ক্যাম্প।
  • মর্যাদা:সুন্দরবনের পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক বনভূমি এবং দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য বলে উইকিভ্রমণে উল্লেখ আছে; বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনাল এটিকে গুরুত্বপূর্ণ পাখি-এলাকা (আইবিএ) হিসেবে চিহ্নিত করেছে, আর এটি শকুনের নিরাপদ এলাকা-২ এর আওতাভুক্ত (ডেইলি ক্যাম্পাস/উইকিভ্রমণ)।
  • ভূপ্রকৃতি: পাহাড় খুব উঁচু নয় — সর্বোচ্চ ~৬৭ মিটার; অসংখ্য ছোট উপত্যকা আর শৈলশিরা মিলিয়ে বৈচিত্র্যময় আবাস (বিডিনিউজ/আইনিউজ)। বনটির বিস্তার বাড়তে শুরু করে ১৯৪০-এর দশক থেকে; পুরনো গাছগুলোর অনেকের বয়স শতবর্ষ ছুঁই ছুঁই (ডেইলি স্টার)।

জীববৈচিত্র্য: সংখ্যায় ও নামে

  • ৬৩৮ প্রজাতির গাছপালা ও লতাগুল্ম; ৩৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৬৭ প্রজাতির পাখি, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৭ প্রজাতির উভচর (উইকিভ্রমণ/বিডিনিউজ)।
  • মালায়ন বড় কাঠবিড়ালী — দেশে পাঁচ প্রজাতির কাঠবিড়ালীর মধ্যে এই বিরল প্রজাতিটির একমাত্র বসবাস এই বনেই (বিডিনিউজ)। তিন প্রজাতির বানর — কুলু, রেসাস ও লজ্জাবতী বানর; আরও মুখপোড়া হনুমান, চশমা হনুমান, উল্লুক, মায়া হরিণ, মেছোবাঘ, গন্ধগোকুল, বন্য শূকর, সজারু, হোগ বেজার (হগ ব্যাজার) ও চিতা বিড়াল (ভ্রমণগাইড/ডেইলি ক্যাম্পাস)।
  • বড় বিড়ালের গল্প: ষাটের দশকে বাঘ ছিল বলে শোনা যায়; সর্বশেষ নিশ্চিত বাঘ-দর্শন ১৯৭১ সালে। চিতাবাঘ এখন নিয়মিত বাসিন্দা নয়, তবে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতীয় বন থেকে মাঝে মাঝে ঢুকে পড়ে (ডেইলি ক্যাম্পাস)। সরীসৃপের মধ্যে কোবরা, অজগর, সবুজ বোড়া উল্লেখযোগ্য — পথে সতর্ক থাকুন।
  • পাখি: ভীমরাজ (বড় র‍্যাকেট-লেজের ফিঙে), হিল ময়না, ধনেশ, লাল মাথা ট্রগন (কুচকুচি), টিয়া, সিপাহি বুলবুল, মথুরা, বনমোরগ, শকুন, ঈগল, মাছরাঙা — পাখিপ্রেমীদের জন্য বনটি আলাদা টান (উইকিভ্রমণ)।

ঘুরে দেখা: ট্রেইল, টাওয়ার, লেক ও পাড়া

  • সাতছড়ির মতো এখানেও তিনটি নির্ধারিত ট্রেইল — আধা ঘণ্টা, এক ঘণ্টা ও তিন ঘণ্টার (টিবিএস গাইড/ডেইলি ক্যাম্পাস)। বন বড় ও পথ বিভ্রান্তিকর — স্থানীয় গাইড ছাড়া গভীরে যাবেন না; প্রবেশ ও গাইডের নিয়ম কালেঙ্গা বিট অফিস/তথ্যকেন্দ্র থেকে জেনে নিন।
  • বনের ভেতরে ওয়াচ টাওয়ার থেকে ক্যানোপি ও দূরের পাহাড় দেখা যায়; পাদদেশে বন্যপ্রাণীর পানির জন্য তৈরি কৃত্রিম লেক — পাখি-প্রাণীর আনাগোনার জায়গা। সীমান্তবর্তী টাওয়ার থেকে ত্রিপুরার বনভূমিও চোখে পড়ে (শিক্ষক বাতায়ন)।
  • বনের ভেতর-আশপাশে ত্রিপুরা, সাঁওতাল, তেলেগু ও ওঁরাও জনগোষ্ঠীর পাড়া — তাঁদের জীবন বননির্ভর; পাড়ায় গেলে সম্মান ও অনুমতির সংস্কৃতি মেনে চলুন (ডেইলি ক্যাম্পাস)।
  • বোনাস ইতিহাস: কাছের চাকলাপুঞ্জি চা বাগানের বালুনদী এলাকা থেকে ১৯৯৬ সালে নব্যপ্রস্তরযুগের ৮৩টি প্রত্নবস্তু উদ্ধার হয়েছে — এই পাহাড়ি ভূখণ্ডে মানুষের বসবাস প্রাগৈতিহাসিক (‘হবিগঞ্জের ইতিহাস’ গ্রন্থের উদ্ধৃতি, শিক্ষক বাতায়ন)।

যাওয়া, থাকা ও সেরা সময়

  • দূরত্ব: ঢাকা থেকে ~১৩০–১৫০ কিমি; হবিগঞ্জ শহর থেকে ~৩১ কিমি; শ্রীমঙ্গলের খুব কাছে।
  • রুট ১ (শায়েস্তাগঞ্জ হয়ে): ঢাকা থেকে সিলেটগামী বাস/ট্রেনে শায়েস্তাগঞ্জ; সেখান থেকে সিএনজি/অটোরিকশায় চুনারুঘাট হয়ে কালেঙ্গা (গাইড-রিপোর্টে সিএনজি ভাড়া ~৫০০–৬০০ টাকা বলা হয়েছে, যাত্রার আগে দর কষে নিন)।
  • রুট ২ (শ্রীমঙ্গল হয়ে): শ্রীমঙ্গল থেকে জিপে কালেঙ্গা (~২,০০০–৩,০০০ টাকা, গাইড-রিপোর্ট অনুযায়ী) — বনপথের ড্রাইভটাই অভিজ্ঞতা, তবে বর্ষায় কঠিন। নিজের গাড়িতে এলে সিলেট মহাসড়ক থেকে হবিগঞ্জ-চুনারুঘাট মোড় ধরে সুরমা ও চাকলাপুঞ্জি চা বাগান ও সাতছড়ি পেরিয়ে এগোতে হয়; শেষ ~৪ কিমি কাঁচা রাস্তা (ডেইলি স্টার)।
  • থাকা: কালেঙ্গায় বন বিভাগের রেস্ট হাউস (আগাম অনুমতি লাগে), কাছাকাছি পরিবেশ-বান্ধব কটেজ (নিসর্গ তরফ হিল কটেজ পরিচিত নাম), অথবা হবিগঞ্জ শহরের হোটেল (~৮০০–২,৫০০ টাকা, টিবিএস গাইডের তথ্য)। বনের ভেতরে খাবারের ব্যবস্থা নেই — খাবার-পানি সঙ্গে নিন।
  • সেরা সময়:অক্টোবর–এপ্রিল (এশিয়ান এজ); বর্ষায় বন সবুজতম হলেও ট্রেইল কর্দমাক্ত ও পিচ্ছিল — পিছিয়ে রাখাই ভালো। বন্যপ্রাণীর জন্য ভোরের ট্রেইলই সেরা।
  • হুমকি (জানা থাকা ভালো): নির্বিচারে গাছ চুরি ও বন ধ্বংসে অভয়ারণ্যটি হুমকির মুখে (উইকিপিডিয়া) — ভ্রমণকারী হিসেবে নিজে কোনো ক্ষতির অংশ হবেন না, অবৈধ কাঠ পাচার চোখে পড়লে বন বিভাগকে জানান।

দুই বন মিলিয়ে একদিনের নমুনা সূচি

  • ভোর: কালেঙ্গা থেকে রেমা-কালেঙ্গায় তিন ঘণ্টার ট্রেইল — পাখির ভোর ও প্রাচীন বন।
  • দুপুর: ওয়াচ টাওয়ার ও কৃত্রিম লেক; স্থানীয় পাড়ার পথে হালকা বিরতি।
  • বিকেল: ফেরার পথে সাতছড়িতে আধা ঘণ্টার ট্রেইল বা চা বাগানে চা-বিরতি; সন্ধ্যায় শায়েস্তাগঞ্জ/শ্রীমঙ্গল।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

সাতছড়ি আর রেমা-কালেঙ্গার মধ্যে কোনটি আগে দেখব?

সময় কম থাকলে সাতছড়ি সহজ ও সাজানো; গভীর প্রাকৃতিক বনের অভিজ্ঞতা চাইলে রেমা-কালেঙ্গা — একই দিনে দুটোই সম্ভব, পথেই পড়ে।

বাঘ-চিতা দেখা যাবে কি?

প্রায় নিশ্চিতভাবে না — বাঘ ১৯৭১-এর পর দেখা যায়নি; চিতাবাঘের স্থায়ী বসবাসও নেই। এখানকার আকর্ষণ পাখি, প্রাইমেট আর প্রাচীন বন।

রাতে থাকা যায়?

বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে রেস্ট হাউসে থাকা যায়; সন্ধ্যার পর বনে ঢোকা নিষেধ — নিরাপত্তা ও বন্যপ্রাণীর শান্তির জন্যই।

শেষকথা

সাতছড়ি সাজানো উদ্যান, রেমা-কালেঙ্গা বুনো প্রাচীন বন, আর সিলেটের খাদিমনগর শহরঘেঁষা সবুজ — বিভাগীয় বন-ত্রয়ী পূর্ণ হলো। পরের পোস্টে হবিগঞ্জের অন্য রূপ: বানিয়াচং — এশিয়ার বৃহত্তম গ্রামের ইতিহাস।