জামালপুর জেলার দক্ষিণ প্রান্তে, যমুনার পূর্ব তীরে সরিষাবাড়ী — জামালপুর শহরের আধ্যাত্মিক প্রশান্তির ঠিক উল্টো পিঠ: এ এক শিল্প-শহর, যার গল্পে আছে পাটের সোনালি যুগের জৌলুস, সেই যুগের পতনের দীর্ঘশ্বাস আর দেশের সবচেয়ে বড় সার কারখানার অনিশ্চিত বর্তমান। যমুনা ও ঝিনাই নদীবেষ্টিত এই উপজেলার আয়তন ২৬৩.৫০ বর্গ কিলোমিটার; থানা গঠিত হয় ১৯৬০ সালে, উপজেলা হয় ১৯৮৩ সালে (বাংলাপিডিয়া)।
পাটের শহর: নারায়ণগঞ্জের পরেই ছিল সরিষাবাড়ী
উন্নত জাতের পাটের জন্য সরিষাবাড়ীর খ্যাতি ব্রিটিশ আমল থেকেই — ইংরেজরা এখানকার পাট সরাসরি নৌপথে রপ্তানি করত। একসময় এখানে ছিল ২২টি পাটের কুঠি, যেখানে কাজ করত প্রায় ২২,০০০ শ্রমিক; পাট-বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে দেশে সরিষাবাড়ীর স্থান ছিল নারায়ণগঞ্জের পরেই (পাট-বিষয়ক প্রতিবেদন)। কিন্তু সেই শিল্পনগরী আজ মুমূর্ষু: একে একে প্রায় সব পাটকল বন্ধ হয়ে গেছে, বেকার হয়ে মানবেতর জীবনে পড়েছেন হাজার হাজার শ্রমিক পরিবার (প্রতিবেদন)। পাট-ঐতিহ্য বাঁচাতে নতুন উদ্যোগও এসেছে — বিজেএমসির উদ্যোগে ঝালুপাড়ায় পাট পাতা থেকে তৈরি পানীয়ের (পাট-চা) কারখানার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে; "বিশ্বের প্রথম" এমন কারখানা হিসেবে প্রকল্পটি ঘোষিত হয়েছিল (বিজেএমসি-সূত্রে প্রতিবেদন)।
যমুনা সার কারখানা: গর্ব আর গ্যাস-সংকটের টানাপোড়েন
সরিষাবাড়ীর পোগলদিঘা ইউনিয়নের তারাকান্দিতে দাঁড়িয়ে দেশের বৃহত্তম দানাদার ইউরিয়া কারখানা — যমুনা সার কারখানা (জেএফসিএল), যাকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দানাদার ইউরিয়া কারখানাও বলা হয় (মানবজমিন)। দৈনিক ১,৭০০ মেট্রিক টন উৎপাদনক্ষমতা নিয়ে ১৯৯১ সালে উৎপাদন শুরু; বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু ১৯৯২ সালের ১ জুলাই (কারখানা-সূত্র)। বিসিআইসির অধীন কারখানাটি প্রায় দুই হাজার ডিলারের মাধ্যমে উত্তরবঙ্গসহ ১৯–২১টি জেলায় সার সরবরাহ করে (প্রতিবেদনসমূহ)। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর গল্প মানেই বন্ধ আর চালুর টানাপোড়েন — পাঠকের জন্য তারিখসহ হালনাগাদ চিত্রটা জরুরি: গ্যাস-সংকটে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ২০২৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর গ্যাস সংযোগ ফিরে আসে এবং ৫–৬ অক্টোবর ২০২৬ রাতে পুরোদমে উৎপাদন শুরু হয় (প্রথম আলো); কিন্তু মাত্র দুই দিনের মাথায় বয়লার প্ল্যান্টের যান্ত্রিক ত্রুটিতে আবার বন্ধ হয়ে যায় (সংবাদ প্রতিবেদন, ৮ অক্টোবর); এরপর গ্যাস সংযোগ ফের বিচ্ছিন্ন হওয়ায় অক্টোবরের শেষ দিকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী কারখানাটি আবারও পুরোপুরি বন্ধ (মানবজমিন)। যাওয়ার আগে অবশ্যই সর্বশেষ অবস্থা জেনে নিন — কারখানাটি ভেতরে দেখার সুযোগ সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য নেই, বাইরে থেকে এর বিশাল কাঠামোই দেখা।
যমুনার পাড়ের জীবন
শিল্পের বাইরে সরিষাবাড়ীর আসল রূপ যমুনার তীরে: ভাঙন-গড়নের চর, খেয়া নৌকার পারাপার আর নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা। ঐতিহ্যের খাতায় বাংলাপিডিয়া রেখেছে দুটি নাম — পাঁচ গম্বুজবিশিষ্ট রসপাল জামে মসজিদ (ঊনবিংশ শতক) আর নরপাড়া দুর্গ (ষোড়শ শতক)। চরের মানুষের জন্য সুখবর এসেছে সম্প্রতি: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ সাতপোয়া ইউনিয়নের ঘোড়ামারা চরে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছে যমুনার শাখা নদীর ওপর ২৭৮ মিটার দীর্ঘ আরসিসি সেতুর — এলজিইডির প্রকল্পে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য এই সেতু সরিষাবাড়ীকে যুক্ত করবে সিরাজগঞ্জের কাজীপুরের সঙ্গে; এতদিন এই পথে চলত খেয়া নৌকা, শুষ্ক মৌসুমে হেঁটে পার হতে হতো বালুচর (সংবাদ প্রতিবেদন, অক্টোবর ২০২৬)। নদীভ্রমণের স্বাদ নিতে পাশের জেলার সিরাজগঞ্জের যমুনা-পাড়ের গল্পটাও এই সিরিজেরই অংশ।
ভ্রমণ তথ্য
যাওয়া: জামালপুর শহর থেকে বাস/সিএনজিতে সরিষাবাড়ী; জেলা পর্যটন পাতা অনুযায়ী সার কারখানা সরিষাবাড়ী শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার। কী দেখবেন: কারখানার বাইরের দৃশ্য (প্রবেশ সংরক্ষিত), যমুনার তীর ও চর, রসপাল মসজিদ; সূর্যাস্তে নদীর পাড় সবচেয়ে সুন্দর। সতর্কতা: নদীভাঙনপ্রবণ এলাকা — অচেনা চরে একা যাবেন না, স্থানীয়দের পরামর্শ নিন; শিল্প এলাকায় ছবি তোলার নিয়ম মেনে চলুন। কখন: শীতকালে চর সবচেয়ে স্থিতিশীল ও ভ্রমণ-উপযোগী।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সরিষাবাড়ী কীসের জন্য বিখ্যাত ছিল?
পাট শিল্পের জন্য — একসময় ২২টি পাটকুঠি ও প্রায় ২২,০০০ শ্রমিক নিয়ে এটি ছিল নারায়ণগঞ্জের পর দেশের দ্বিতীয় পাট-বাণিজ্য কেন্দ্র (প্রতিবেদন)।
যমুনা সার কারখানা কোথায়?
সরিষাবাড়ীর তারাকান্দিতে (পোগলদিঘা ইউনিয়ন); দৈনিক ক্ষমতা ১,৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া (প্রথম আলো)।
কারখানা এখন চালু আছে কি?
অক্টোবর ২০২৬-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় বন্ধ; অবস্থা ঘন ঘন বদলায় — যাওয়ার আগে খোঁজ নিন।
যমুনার ওপর নতুন সেতু হচ্ছে কোথায়?
ঘোড়ামারা চরে (সাতপোয়া) — ২৭৮ মিটার দীর্ঘ সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছে ১৯ অক্টোবর ২০২৬।
সরিষাবাড়ী কবে উপজেলা হয়?
থানা ১৯৬০ সালে, উপজেলায় রূপান্তর ১৯৮৩ সালে (বাংলাপিডিয়া)।
দেখার মতো পুরোনো স্থাপনা কী আছে?
বাংলাপিডিয়ার তালিকায় রসপাল জামে মসজিদ (ঊনবিংশ শতক) ও নরপাড়া দুর্গ (ষোড়শ শতক)।
শেষকথা
সরিষাবাড়ী পর্যটনের প্রচলিত ছকে পড়ে না — এখানে আসা মানে বাংলাদেশের শিল্প-ইতিহাসের উত্থান-পতন চোখে দেখা: বন্ধ পাটকলের নীরবতা, সার কারখানার অনিশ্চিত চিমনি আর তার পাশ দিয়েই বয়ে চলা চিরচঞ্চল যমুনা। সেই বৈপরীত্যই এই জনপদের আসল গল্প।