• 31 Oct, 2026

তাজহাট জমিদার বাড়ি ভ্রমণ গাইড — মান্না লাল রায়ের তাজ-বাণিজ্য থেকে নামের উৎপত্তি, গোপাল লাল রায়ের ১৯০৮–১৯১৭ সালের প্রাসাদ, হাইকোর্ট বেঞ্চ থেকে জাদুঘর হওয়ার ইতিহাস, প্রদর্শনী ও রংপুর শহর ভ্রমণের তথ্য।

রংপুর শহর থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরে মাহিগঞ্জের তাজহাট গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে জমকালো জমিদার প্রাসাদ — তাজহাট জমিদার বাড়ি। লাল ইট আর সাদা পাথরের এই প্রাসাদ দেখতে অনেকটা ঢাকার আহসান মঞ্জিলের মতো, তবে এর জন্মকথা একেবারে আলাদা: এর শুরু এক রত্ন ব্যবসায়ীর মুকুটের হাট থেকে।

"তাজ" থেকে তাজহাট: মান্না লাল রায়

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে পাঞ্জাব থেকে আগত রত্ন ব্যবসায়ী মান্না লাল রায় ব্যবসার কারণে রংপুরের মাহিগঞ্জে বসতি গাড়েন (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস/ভ্রমণগাইড)। তিনি হীরা-জহরত আর রত্নখচিত "তাজ" (মুকুট) বেচতেন; সেই তাজ বিক্রির হাটই কালক্রমে পরিচিত হয় "তাজহাট" নামে, আর জমিদারি ও প্রাসাদের নামও সেখান থেকেই (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)। মান্না লালের পর প্রজন্ম ধরে জমিদারি চলে — বর্ণনায় গোবিন্দ লাল রায়ের নাম আসে মাঝের প্রজন্মে; ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে প্রথম আমলের ভবন ধ্বংস হয়ে যায় (আদার ব্যাপারী/ব্লগ বর্ণনা)। তারপর গোবিন্দ লালের পুত্র গোপাল লাল রায় হাতে নেন নতুন প্রাসাদের পরিকল্পনা।

প্রাসাদ: ১৯০৮–১৯১৭, দুই হাজার রাজমিস্ত্রি

বর্তমান প্রাসাদটি নির্মিত হয় ১৯০৮ থেকে ১৯১৭ সালের মধ্যে — প্রায় ২,০০০ রাজমিস্ত্রি টানা দশক ধরে কাজ করেন, ব্যয় হয় তৎকালীন প্রায় দেড় কোটি টাকা (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস/ভ্রমণগাইড)। সম্মুখভাগ ৭৬.২০ মিটার (প্রায় ২১০ ফুট) প্রশস্ত, উচ্চতায় চারতলা ভবনের সমান; উপকরণ লাল ইট, সাদা ও চুনা পাথর, আর ইতালীয় মার্বেল — কেন্দ্রীয় সিঁড়ির ৩১টি ধাপই মার্বেলে তৈরি, মেঝেও তাই (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস/আদার ব্যাপারী)। মাঝখানে বিশাল গম্বুজ ও দুই পাশে ছড়ানো দালানে মুঘল-অনুপ্রাণিত ইন্দো-ইউরোপীয় গঠন (আদার ব্যাপারী)। প্রাসাদের পেছনে গুপ্ত সিঁড়িপথ (বর্তমানে বন্ধ), ভেতরে অসংখ্য কক্ষ, গোসলখানা ও অতিথি শয়নকক্ষ (ভ্রমণগাইড)। চত্বরে বিশাল মাঠ, প্রাসাদের দুই পাশে পুকুর, আর কামিনী-মেহগনি-আম-কাঁঠালের বাগান (ভ্রমণগাইড)। মানিকগঞ্জের বালিয়াটির সাত দালানের সঙ্গে তুলনা করলে বোঝা যায়, তাজহাট একক প্রাসাদ হিসেবে কতটা মনুমেন্টাল।

প্রাসাদ থেকে হাইকোর্ট, হাইকোর্ট থেকে জাদুঘর

১৯৪৭ সালে বাড়িটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে ৫৫ একর জমিসহ কৃষি ইনস্টিটিউটকে দেওয়া হয়; ১৯৮৪ সালের ১৮ মার্চ তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এরশাদ এটিকে হাইকোর্ট বেঞ্চ হিসেবে উদ্বোধন করেন; ১৯৯১ সালে বেঞ্চের কার্যক্রম বন্ধ হয় (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)। ১৯৯৫ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এটিকে সংরক্ষিত স্থাপনা হিসেবে নথিভুক্ত করে, আর ২০০৫ সালে রংপুর জাদুঘর প্রাসাদে স্থানান্তরিত হয় (ভ্রমণগাইড/ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)। জাদুঘরের সংগ্রহে আছে দশম-একাদশ শতাব্দীর টেরাকোটা শিল্পকর্ম, আওরঙ্গজেবের আমলের কুরআনের পাণ্ডুলিপি, আরবি ও সংস্কৃত ভাষায় লেখা মহাভারত-রামায়ণসহ প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, কালো পাথরের বিষ্ণুমূর্তি — মোট প্রায় ৩০০টি নিদর্শন (ভ্রমণগাইড)। ওপরের তলাগুলোতে গোপাল লাল রায়ের ব্যবহৃত জিনিসপত্রও রাখা আছে (ভ্রমণগাইড)।

রংপুর শহর: বিভাগীয় সদরের পরিচয়

বিভাগীয় শহর রংপুর উত্তরবঙ্গের প্রশাসন আর বাণিজ্যের কেন্দ্র; তাজহাট তার সবচেয়ে বড় ঐতিহ্য-ঠিকানা। শহরে রাত কাটিয়ে সকালে তাজহাট দেখে দুপুরে ফেরা সবচেয়ে আরামদায়ক ছন্দ — এরপরের গন্তব্য হিসেবে কারমাইকেল কলেজ আর বেগম রোকেয়ার পায়রাবন্দ একই সার্কিটে পড়ে (সেগুলো নিয়ে আমাদের পরের পোস্ট আসছে)।

ভ্রমণ তথ্য

শহর থেকে রিকশা/অটোতে তাজহাট (~৬ কিমি)। জাদুঘর-সময় মেনে যান; প্রাসাদ ও বাগান মিলিয়ে ২–৩ ঘণ্টা রাখুন। সেরা সময় শীতকাল; বাগান-পুকুরের জন্য বিকেলের আলো ভালো। প্রাসাদের ভেতরে ছবি তোলার নিয়ম জাদুঘর কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলুন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

তাজহাট নাম এলো কীভাবে?

মান্না লাল রায়ের রত্নখচিত "তাজ" (মুকুট) বিক্রির হাট থেকে (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)।

বর্তমান প্রাসাদ কে, কবে গড়েন?

গোপাল লাল রায়, ১৯০৮–১৯১৭ সালে, ~২,০০০ রাজমিস্ত্রি দিয়ে (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)।

প্রাসাদে এখন কী আছে?

রংপুর জাদুঘর — টেরাকোটা, পাণ্ডুলিপি ও প্রায় ৩০০টি নিদর্শন (ভ্রমণগাইড)।

হাইকোর্ট ছিল কবে?

১৯৮৪ সালে বেঞ্চ উদ্বোধন হয়, ১৯৯১ সালে কার্যক্রম বন্ধ হয় (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)।

শহর থেকে কত দূর?

প্রায় ৬ কিলোমিটার, মাহিগঞ্জের তাজহাট গ্রামে (ভ্রমণগাইড)।

শেষকথা

একটা মুকুটের হাট থেকে জন্ম নেওয়া প্রাসাদ, যা এক যুগে জমিদারের বিলাস, আরেক যুগে বিচারকের এজলাস, আজ জাদুঘর — তাজহাটের দেয়ালে উত্তরবঙ্গের তিন শতকের গল্প জমে আছে। রংপুর ভ্রমণ শুরু হোক এখান থেকেই।