• 30 Oct, 2026

পুরান ঢাকার ইসলামপুরে বুড়িগঙ্গার তীরে আহসান মঞ্জিল — ১৮৫৯–১৮৭২ সালে নবাব আবদুল গনির গড়া, পুত্র আহসানউল্লাহর নামে নামকরণ করা গোলাপি প্রাসাদের ইতিহাস, জাদুঘরের গ্যালারি, টিকিট-সময়সূচি ও পুরান ঢাকা হাঁটার পূর্ণ গাইড।

পুরান ঢাকার ইসলামপুরের কুমারটুলীতে, বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে গোলাপি রঙের যে প্রাসাদটি দেড় শতাব্দী ধরে ঢাকার মুখচ্ছবি হয়ে আছে, সেটিই আহসান মঞ্জিল — ঢাকার নবাবদের বাসভবন ও দরবার। ইন্দো-সারাসেনিক স্থাপত্যের এই প্রাসাদ আজ বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের অধীনে একটি জাদুঘর (কুহুডাক) — যার মূল ভবন শাহবাগের বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর। নবাবি আমলের আসবাব, চিত্রকর্ম আর দরবারের জৌলুস দেখতে দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীদের কাছে এটি পুরান ঢাকা ভ্রমণের প্রথম ঠিকানা।

রংমহল থেকে নবাবদের প্রাসাদ

এই জায়গার গল্প প্রাসাদের চেয়েও পুরনো। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি জামালপুর পরগনার জমিদার শেখ ইনায়েতউল্লাহ বুড়িগঙ্গার এই তীরে গড়েছিলেন প্রমোদভবন "রংমহল"; পরে জায়গাটি ফরাসি বণিকদের কুঠি হিসেবে ব্যবহৃত হয় (কুহুডাক)। ১৮৩০ সালের দিকে খাজা আলীমুল্লাহ — নবাব আবদুল গনির পিতা — জায়গাটি কিনে বসবাস শুরু করেন। এরপর ১৮৫৯ সালে নবাব আবদুল গনি নতুন প্রাসাদের নির্মাণ শুরু করেন, যা শেষ হয় ১৮৭২ সালে; প্রিয় পুত্র খাজা আহসানউল্লাহর নামানুসারে তিনি প্রাসাদের নাম দেন "আহসান মঞ্জিল" (কুহুডাক/ভ্রমণপ্রিয়)। প্রাসাদটি ঢাকার প্রথম ইট-পাথরের স্থাপনা হিসেবে খ্যাত, আর নবাবদের হাতেই এখানে প্রথম বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবস্থা হয় বলে জানা যায় (অ্যামেজিং ট্যুরস)। ১৮৮৮ সালের টর্নেডো ও ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত প্রাসাদটি পরে পুনর্নির্মাণ করা হয় (ইভেন্ডো)। নবাব খাজা সলিমুল্লাহর (আহসানউল্লাহর পুত্র) আমলে এই প্রাসাদ ছিল বাংলার রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্র — ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে এই নবাব পরিবারের নাম ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে।

জাদুঘরে যা দেখবেন

১৯৮৫ সালে জাতীয় জাদুঘর হিসেবে ঘোষণার পর ১৯৯২ সালে আহসান মঞ্জিল দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত হয় (গরলি/অ্যামেজিং ট্যুরস)। প্রাসাদের ৩১টি কক্ষের মধ্যে ২৩টিতে গ্যালারি সাজানো — নবাবদের সিংহাসনকক্ষ, ভোজনকক্ষ, গ্রন্থাগারসহ নয়টি কক্ষ সাজানো হয়েছে ঠিক নবাবি আমলের আদলে; সংগৃহীত নিদর্শনের সংখ্যা চার হাজারের বেশি (অ্যামেজিং ট্যুরস/গরলি)। দোতলা প্রাসাদের বিশাল গম্বুজ, নদীর দিকে মুখ করা বারান্দা আর সুবিশাল আঙিনা মিলিয়ে ভেতরে ঘণ্টাখানেক সহজেই কেটে যায়। সংরক্ষিত প্রাসাদ-জাদুঘরের বিপরীতে, অযত্নে ক্ষয়ে যাওয়া জমিদারবাড়ির রূপ দেখতে চাইলে লক্ষ্মীপুরের দালাল বাজার জমিদার বাড়ি ভালো তুলনা দেবে।

টিকিট, সময়সূচি ও সতর্কতা

সাম্প্রতিক অনলাইন টিকিট-হার অনুযায়ী প্রবেশমূল্য: বাংলাদেশি প্রাপ্তবয়স্ক ৪০ টাকা, শিশু ২০ টাকা, সার্কভুক্ত দেশের দর্শনার্থী ৩০০ টাকা, অন্যান্য বিদেশি ৫০০ টাকা (গরলি; হার পরিবর্তন হতে পারে — গেটে/অনলাইনে যাচাই করুন)। সময়সূচি: শনিবার থেকে বুধবার সকাল ১০:৩০ – বিকেল ৪:৩০ (টিকিট বিক্রি শেষ বিকেল ৪টায়), শুক্রবার বিকেল ৩টা – সন্ধ্যা ৭টা; বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক বন্ধ, সরকারি ছুটির দিনেও বন্ধ (কুহুডাক/গরলি)। সতর্কতা: ছুটির দিনগুলোতে প্রচণ্ড ভিড় হয় — সকালে গেলেই আরামে দেখা যায়; জাদুঘরের ভেতরে ছবি তোলার নিয়ম গ্যালারিভেদে ভিন্ন হতে পারে, কর্মীদের নির্দেশনা মানুন।

আশপাশে পুরান ঢাকা হাঁটা

আহসান মঞ্জিল দেখে একই হাঁটায় পুরান ঢাকার আরও কয়েকটি স্তর ছোঁয়া যায়: কাছেই বুড়িগঙ্গার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের চিরচেনা ভিড়, ওয়াইজঘাটের পুরনো ঘাট-এলাকা, আর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে বাহাদুর শাহ পার্ক — ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের স্মৃতিবিজড়িত সবুজ চত্বর। দুপুরের খাবারে পুরান ঢাকার বিখ্যাত বিরিয়ানি-কাচ্চির কোনো পুরনো দোকানে ঢুঁ মারাটা এই সফরের প্রায় বাধ্যতামূলক অংশ। যাতায়াত: গুলিস্তান/সদরঘাট থেকে রিকশায় সরাসরি আহসান মঞ্জিল গেট; পুরান ঢাকার সরু গলি ও যানজটের কারণে হাতে বাড়তি সময় রাখুন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

আহসান মঞ্জিল কে, কবে নির্মাণ করেন?

নবাব আবদুল গনি ১৮৫৯ সালে নির্মাণ শুরু করেন, শেষ হয় ১৮৭২ সালে; নাম রাখেন পুত্র খাজা আহসানউল্লাহর নামে (কুহুডাক)।

আহসান মঞ্জিল কখন বন্ধ থাকে?

বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক বন্ধ; সরকারি ছুটির দিনেও বন্ধ থাকে (কুহুডাক/গরলি)।

টিকিটের দাম কত?

সাম্প্রতিক হার অনুযায়ী বাংলাদেশি প্রাপ্তবয়স্ক ৪০ টাকা, শিশু ২০ টাকা, সার্ক ৩০০, বিদেশি ৫০০ টাকা (গরলি) — যাওয়ার আগে যাচাই করুন।

জাদুঘরে কী কী আছে?

২৩টি গ্যালারিতে চার হাজারের বেশি নিদর্শন; নবাবি আমলের আদলে সাজানো সিংহাসনকক্ষসহ নয়টি কক্ষ (অ্যামেজিং ট্যুরস)।

আহসান মঞ্জিল কোথায়?

পুরান ঢাকার ইসলামপুরের কুমারটুলীতে, বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে — সদরঘাটের কাছেই।

শেষকথা

ঢাকা যতই আকাশছোঁয়া হোক, তার জন্মপরিচয় লেখা আছে বুড়িগঙ্গার এই তীরে — আহসান মঞ্জিল সেই পরিচয়ের সবচেয়ে সুন্দর পাতা। গোলাপি প্রাসাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকালে নবাবি ঢাকা আর আজকের ঢাকা একই ফ্রেমে ধরা দেয়।