ঢাকা থেকে মাত্র ৩৫ কিলোমিটার দূরে এমন রাজকীয় প্রাসাদ-চত্বর যে আজও প্রায় অক্ষত দাঁড়িয়ে আছে, তা অনেকেরই অজানা — মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটি গ্রামে বালিয়াটি জমিদার বাড়ি (বালিয়াটি প্রাসাদ) বাংলাদেশের ঔপনিবেশিক আমলের সবচেয়ে বড় ও সুসংরক্ষিত জমিদার কমপ্লেক্সগুলোর একটি। সিংহমূর্তি শোভিত ফটক পেরোলেই চোখের সামনে সারিবদ্ধ সাতটি প্রাসাদ — যেন ঊনবিংশ শতকের বঙ্গে হঠাৎ পা রেখেছেন।
লবণের ব্যবসা থেকে জমিদারি
এই সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন গোবিন্দ রাম সাহা — ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ের খ্যাতনামা লবণ ব্যবসায়ী, যিনি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ব্যবসা বাড়িয়ে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন, যা একসময় নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল (বাংলা উইকিপিডিয়া/অ্যাসাইনমেন্ট পয়েন্ট)। প্রাসাদগুলো একসঙ্গে তৈরি নয়: গোবিন্দ রামের চার ছেলের পরবর্তী প্রজন্ম — বিভিন্ন উত্তরাধিকারী — ১৯শ শতকের মাঝামাঝি থেকে ২০ শতকের প্রথমভাগ পর্যন্ত পৃথক পৃথক সময়ে ভবনগুলো নির্মাণ করেন (বাংলা উইকিপিডিয়া/টাইমস অব বাংলাদেশ)। পরিবারটি শিক্ষা-বিস্তারে বিখ্যাত ছিল: কিশোরীলাল রায় চৌধুরীর পিতা ছিলেন ঢাকার জগন্নাথ কলেজের (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ তাঁর নামেই (বাংলা উইকিপিডিয়া)। কিশোরী রায় চৌধুরী নিজে ১৯২৩ সালে বালিয়াটিতে নিজ খরচে দাতব্য অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও সরকারি ব্যবস্থাপনায় চলছে (টাইমস অব বাংলাদেশ)। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পরিবারের সদস্যরা ভারতে চলে গেলে প্রাসাদ পরিত্যক্ত হয়; ১৯৮৭ সাল থেকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এটি সংরক্ষণ ও পরিচালনা করছে (অ্যাসাইনমেন্ট পয়েন্ট/গ্রিনবেল্ট)।
সাত প্রাসাদ, দুইশ কক্ষ
প্রায় ৫.৮৮ একর মূল চত্বরে (পুরো এস্টেট আরও বড়) পরিখা ও প্রাচীরে ঘেরা কমপ্লেক্সে দক্ষিণমুখী সাতটি দালান (বাংলা উইকিপিডিয়া)। সামনের সারির চারটি বহুতল প্রাসাদ চার উত্তরাধিকারীর অংশ — ব্যবসায়িক ও কাছারি কাজে ব্যবহৃত হতো; পেছনের অংশ অন্দরমহল, পরিবারের বসবাসের জন্য; পেছনে পুকুর (ছয় ঘাটবিশিষ্ট বড় পুকুরসহ) (ভ্রমণগাইড/টাইমস অব বাংলাদেশ)। মোট কক্ষ প্রায় ২০০টি। স্থাপত্যে রেনেসাঁধর্মী-রোমান রীতির ঝলক: সারি সারি করিন্থীয় স্তম্ভ, ঢালাই লোহার ঘূর্ণায়মান সিঁড়ি, রঙিন কাচের জানালা, বিশাল বেলজিয়ান আয়না, ঝাড়বাতি ও অলঙ্কৃত দেয়াল (টাইমস অব বাংলাদেশ); দেয়াল প্রায় ২০ ইঞ্চি পুরু, নির্মাণে চুন-সুরকি ও লোহার পাত (ভ্রমণগাইড)। কেন্দ্রীয় ব্লকের "রংমহল" নামে খ্যাত ভবনে এখন প্রত্নতত্ত্ব জাদুঘর — পরিবারের ব্যবহৃত আসবাব ও নিদর্শন দেখা যায় (ভ্রমণগাইড)। জমিদার বাড়ির এই ধারাবাহিকতা দেশজুড়েই — লক্ষ্মীপুরের দালাল বাজার জমিদার বাড়ি কিংবা মাগুরার শ্রীপুর জমিদার বাড়ির সঙ্গে তুলনা করলে বোঝা যায়, বালিয়াটির স্কেল কতটা বিরল।
সময়, টিকিট ও যাতায়াত
সময়সূচি: গ্রীষ্মে (এপ্রিল–সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা, শীতে (অক্টোবর–মার্চ) সকাল ৯টা–বিকেল ৫টা; মাঝে দুপুরের বিরতি থাকে (শুক্রবার বাদে ১টা–১:৩০, শুক্রবার ১২:৩০–২:৩০ নামাজের বিরতি)। রবিবার পূর্ণদিবস বন্ধ এবং সোমবার শুধু দুপুর ২টার পর খোলে; সরকারি ছুটির দিনেও বন্ধ (ভ্রমণগাইড) — দিন মিলিয়ে না গেলে ফিরে আসতে হতে পারে। টিকিট: জনপ্রতি ৩০ টাকা (ভ্রমণগাইডের হালনাগাদ তথ্য; বদলাতে পারে)। যাওয়া: ঢাকার গাবতলী থেকে মানিকগঞ্জগামী বাসে সাটুরিয়া, সেখান থেকে লেগুনা/রিকশায় বালিয়াটি; মানিকগঞ্জ শহর থেকেও প্রাসাদটি প্রায় ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে (বাংলা উইকিপিডিয়া)। চত্বরে ঘোরার জন্য অন্তত দুই ঘণ্টা রাখুন — রংমহল জাদুঘরের ভেতরটা ধীরে দেখার মতো।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বালিয়াটি জমিদার বাড়ি কে প্রতিষ্ঠা করেন?
লবণ ব্যবসায়ী গোবিন্দ রাম সাহা ১৮ শতকের মাঝামাঝি জমিদারির গোড়াপত্তন করেন (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
এখানে কয়টি ভবন ও কক্ষ আছে?
সাতটি প্রাসাদ-দালান, মোট প্রায় ২০০টি কক্ষ (ভ্রমণগাইড)।
কোন দিন বন্ধ থাকে?
রবিবার পূর্ণদিবস বন্ধ; সোমবার দুপুর ২টার পর খোলে; সরকারি ছুটির দিনেও বন্ধ (ভ্রমণগাইড)।
রংমহল কী?
কেন্দ্রীয় ব্লকের ভবন, যেখানে এখন প্রত্নতত্ত্ব জাদুঘর স্থাপিত হয়েছে (ভ্রমণগাইড)।
ঢাকা থেকে কীভাবে যাবেন?
গাবতলী থেকে বাসে সাটুরিয়া, সেখান থেকে লেগুনা/রিকশায় বালিয়াটি (বাংলা উইকিপিডিয়া/গ্রিনবেল্ট)।
শেষকথা
বাংলাদেশে জমিদার প্রাসাদ অনেক আছে, কিন্তু এতগুলো প্রাসাদ একই প্রাচীরের ভেতরে প্রায় অক্ষত অবস্থায় পাওয়া বালিয়াটিতেই সম্ভব। ঢাকার এত কাছে এমন ইউরোপীয় ধাঁচের রাজচত্বর — একদিনের ভ্রমণের তালিকায় এর জায়গা সবচেয়ে ওপরের দিকে।