আন্দরকিল্লার ছোট্ট পাহাড়ের চূড়ায়, সমতল থেকে প্রায় ৩০ ফুট উঁচুতে দাঁড়িয়ে আছে চট্টগ্রামের সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদগুলোর একটি — আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ। সাড়ে তিন শতাব্দীরও বেশি পুরনো এই মসজিদ শুধু নামাজের জায়গা নয়; এটি মুঘলদের চট্টগ্রাম বিজয়ের জীবন্ত স্মারক। শহরের আরেক ঐতিহ্যের গল্প পড়ুন লালদীঘি: চট্টগ্রামের ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি-তে।
নামের গল্প ও নির্মাণ
এই পাহাড়ে একসময় ছিল মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের আস্তানা ‘কিল্লা আরকানি’। ১৬৬৬ সালের ২৭ জানুয়ারি বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খাঁর ছেলে বুজুর্গ উমেদ খাঁ সেই কেল্লার অন্দরে (ভেতরে) প্রবেশ করে চট্টগ্রাম জয় করেন — ‘অন্দর কিল্লা’ থেকেই নাম আন্দরকিল্লা। বিজয়ের স্মৃতি ধরে রাখতে সম্রাট আওরঙ্গজেবের নির্দেশে ১৬৬৭ সালে এখানে মসজিদটি নির্মাণ করা হয় (মসজিদের ফার্সি শিলালিপিতেও সেই সালের উল্লেখ আছে); প্রচলিত আছে, প্রথম ইমাম নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল পবিত্র মদিনা থেকে।
পাথরের স্থাপতত্য
- মসজিদটি ২.৪২ একর জমির পাহাড়চূড়ায়; মূল ভবন প্রায় ১৬–১৭ মিটার লম্বা ও সাড়ে ৭ মিটার চওড়া, দেয়াল প্রায় ২.২ মিটার পুরু।
- চুন-সুরকি আর বড় বড় পাথরে গড়া বলেই এর আরেক নাম ‘পাথরের মসজিদ’ বা জামে সঙ্গীন; স্থাপত্যে দিল্লির জামে মসজিদের প্রভাব লক্ষ করা যায়।
- ছাদে একটি বড় ও দুটি ছোট গম্বুজ, মোট পাঁচটি প্রবেশদ্বার (পূর্বে তিনটি) ও তিনটি মেহরাব।
অন্ধকার অধ্যায় ও প্রত্যাবর্তন
১৭২৩ সালে কাছেই কদম রসূল মসজিদ গড়ে উঠলে এই মসজিদ ধীরে ধীরে লোকশূন্য হয়ে পড়ে। ১৭৬১ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এটিকে গোলাবারুদ রাখার গুদামে পরিণত করে — নামাজ বন্ধ থাকে দীর্ঘ দশকজুড়ে। ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে ঐতিহাসিক হামিদুল্লাহ খাঁদের আবেদন ও প্রচেষ্টায় মসজিদটি আবার মুসল্লিদের জন্য উন্মুক্ত হয়।
বর্তমান চিত্র: বড় সংস্কারের পথে
সরকারিভাবে মসজিদটিকে কেন্দ্র করে একটি বড় সংস্কার ও সম্প্রসারণ প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে (প্রায় ৪০০ কোটি টাকার পরিকল্পনা; মদিনার মসজিদে নববীর সম্প্রসারণের অভিজ্ঞতা অনুসরণে নকশা করা)। পরিকল্পনায় মূল ঐতিহাসিক ভবনের গম্বুজ ও মেহরাব অক্ষুণ্ণ রেখে চারপাশে আধুনিক সুবিধা ও প্রায় ৯ হাজার মুসল্লির ধারণক্ষমতা যোগ করার কথা আছে; বুয়েট ও স্থপতিদের তত্ত্বাবধানে কাজ এগোবে। তাই এই সময়ে দর্শনে গেলে কমপ্লেক্সে নির্মাণকাজ চলমান থাকতে পারে — আসল মুঘল ভবনটি দেখার সুযোগ এখনই সেরা।
দর্শনের নিয়ম
এটি সক্রিয় মসজিদ — নামাজের সময় ছাড়া অন্যসময়ে দর্শন করা ভালো; শালীন পোশাক, মাথা ঢাকা (মহিলাদের ক্ষেত্রে) ও নীরবতা বজায় রাখুন। শুক্রবার জুমায় এখানে শহরের অন্যতম বড় জমায়েত হয়।
কীভাবে যাবেন
আন্দরকিল্লা মোড় (শহরের কেন্দ্রীয় এলাকা) থেকে পাহাড়ের পথে হেঁটেই ওঠা যায়; জিইসি, নিউ মার্কেট বা কোতোয়ালি থেকে রিকশা/সিএনজিতে কয়েক মিনিট।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
মসজিদটি কত সালে তৈরি?
১৬৬৭ সালে — মুঘলদের চট্টগ্রাম বিজয়ের (১৬৬৬) পরের বছর।
‘আন্দরকিল্লা’ নাম কেন?
জলদস্যুদের কেল্লার ‘অন্দরে’ প্রবেশ করে বিজয় অর্জিত হয়েছিল বলে।
পর্যটকরা কি ভেতরে যেতে পারেন?
এটি সক্রিয় মসজিদ; নামাজের সময়ের বাইরে ও কর্তৃপক্ষের নিয়ম মেনে বাইরের চত্বর ও স্থাপত্য দেখা যায়।
শেষকথা
আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ চট্টগ্রামের মুঘল-অধ্যায়ের সবচেয়ে মজবুত সাক্ষী — পাথরের দেয়ালে লেখা বিজয়, বিস্মৃতি আর প্রত্যাবর্তনের গল্প। পাহাড়ি ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এরপর পড়ুন সীতাকুণ্ড: একেক মৌসুমে একেক সাজ।