• 29 Oct, 2026

মুহুরী প্রজেক্ট ভ্রমণ গাইড: তিন নদীর বাঁধ, দেশের প্রথম বায়ুবিদ্যুৎ আর মোহনার মৎস্য-রাজ্য

মুহুরী প্রজেক্ট ভ্রমণ গাইড: তিন নদীর বাঁধ, দেশের প্রথম বায়ুবিদ্যুৎ আর মোহনার মৎস্য-রাজ্য

সোনাগাজীর মুহুরী প্রজেক্টের পূর্ণ গাইড — দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেচ প্রকল্পের ৪০-গেটের রেগুলেটর ও মৌসুমি লেক, ২০০৪ সালের প্রথম বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র, দেশের সবচেয়ে বড় মৎস্য জোন, শীতের পাখি আর নৌভ্রমণ; যাতায়াত, খরচ ও থাকার তথ্যসহ।

একটা জায়গায় একই সঙ্গে সেচ প্রকল্পের প্রকৌশল, দেশের প্রথম বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র, সবচেয়ে বড় মৎস্য জোন আর শীতের হাজারো পাখি — এমন মিশেল বাংলাদেশে আর কোথাও নেই। ফেনীর সোনাগাজীতে, তিন নদীর মোহনার কাছে গড়ে ওঠা মুহুরী প্রজেক্ট তাই শুধু কৃষি-প্রকল্প নয়, পুরোদস্তুর ভ্রমণ গন্তব্য। এলাকাটির একাংশ পড়েছে পাশের মিরসরাই উপজেলাতেও — মিরসরাইয়ের ঝর্ণা-লেক দেখা থাকলে পড়ুন মিরসরাই ভ্রমণ গাইড।

প্রকল্পটা আসলে কী

মুহুরী সেচ প্রকল্প বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেচ প্রকল্প — কাজ শুরু ১৯৭৭–৭৮ অর্থবছরে, সম্পন্ন ১৯৮৫–৮৬ অর্থবছরে। ফেনী, মুহুরী ও কালিদাস পাহালিয়া — তিন নদীর মিলিত প্রবাহকে আড়ি বাঁধ (ক্লোজার ড্যাম) ও ৪০-গেটের বিশাল রেগুলেটর দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে ফেনীর পাঁচ উপজেলা (সদর, ছাগলনাইয়া, পরশুরাম, ফুলগাজী, সোনাগাজী) ও মিরসরাইয়ের একাংশে প্রায় ২০,১৯৪ হেক্টর জমিতে সেচ পৌঁছে দেওয়া আর বন্যার প্রকোপ কমানোই ছিল উদ্দেশ্য। শীতের শুরুতে গেট বন্ধ রাখলে বাঁধের ওপারে জমে ওঠে বিস্তীর্ণ শান্ত মৌসুমি লেক; বর্ষা এলে গেট খুলে দেওয়া হয় — এই দুই রূপই ভ্রমণকারীদের জন্য দুই আলাদা অভিজ্ঞতা।

যা দেখবেন ও করবেন

  • রেগুলেটর ও লেক: বাঁধের ওপর হাঁটতে হাঁটতে একদিকে থেমে থাকা লেকের নীল জল, অন্যদিকে গেট দিয়ে ছাড়া পানির ধারা — দুপাশ বাঁধানো পাথর আর ওপরে ঘাসের সবুজ চাদর। সূর্যাস্তের সময়টা সবচেয়ে ছবি-বান্ধব।
  • নৌভ্রমণ: লেকের জলে নৌকায় ঘুরতে পারবেন — রিজার্ভ নৌকা ৮০০–৯০০ টাকা, শেয়ারে গেলে জনপ্রতি প্রায় ৫০ টাকা (গাইড-সূত্রের হার; যাওয়ার সময় দরদাম যাচাই করে নিন)।
  • বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র: রেগুলেটরের কাছেই খোয়াজের লামছি গ্রামে ২০০৪–০৫ সালে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বসায় চারটি ২২৫ কিলোওয়াটের বায়ুকল (মোট ৯০০ কিলোওয়াট) — এটাই দেশের প্রথম বায়ু শক্তিচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র। টারবাইনগুলো এখন কতটা সক্রিয় তা নিয়ে নানা সময় নানা খবর এসেছে, তবে লেকের পাড়ে সারিবদ্ধ বিশাল পাখাগুলো দেখাটাই ইতিহাসের এক পাতা ছোঁয়ার মতো।
  • মৎস্য জোন: প্রকল্প এলাকা এখন দেশের সবচেয়ে বড় মৎস্য জোন — প্রায় দুই হাজার বাণিজ্যিক মৎস্য প্রকল্প, যার মধ্যে বড় বড় শিল্পগ্রুপের খামারও রয়েছে। রাস্তার দুধারে যতদূর চোখ যায় শুধু ঘের আর পুকুর — আকাশে প্রতিবিম্ব পড়ে অপূর্ব।
  • পাখি ও প্রকৃতি: শীতকালে নৌভ্রমণে কাছ থেকে দেখা মেলে নানা প্রজাতির হাঁসসহ প্রায় ৫০ জাতের পাখির ঝাঁক; বনায়ন আর মাছের অভয়ারণ্য মিলিয়ে জায়গাটা প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য আকর্ষণীয়।

মোহনা ও চরাঞ্চলের টান

বাঁধের দক্ষিণে ফেনী নদী এগিয়ে গেছে বঙ্গোপসাগরের দিকে — মোহনা-ঘেঁষা এই ভূগোলেই প্রজেক্টের আলাদা চরিত্র: জোয়ার-ভাটার ছোঁয়া, চরের সবুজ আর জেলেদের নৌকার আনাগোনা। তবে মোহনা-চর এলাকা মানে সতর্কতাও — স্থানীয়দের জিজ্ঞেস না করে দূরের চরে একা হাঁটতে যাবেন না, ভাটার সময় মাথায় রাখুন, আর নদীর ধারে শিশুদের চোখে চোখে রাখুন।

ছবির জন্য সেরা জায়গাগুলো

বাঁধের রাস্তা ধরে হাঁটলেই দুপাশে দুই দৃশ্য — একদিকে ধরে রাখা লেকের জল, আরেকদিকে সারি সারি মৎস্য ঘের; এই রাস্তার যেকোনো বাঁকই ভালো ফ্রেম। রেগুলেটরের ব্রিজ থেকে নদীর ওপারের খোলা আকাশ, টারবাইন পয়েন্ট থেকে লেকের পটভূমিতে বায়ুকল, আর বাঁধের শেষ প্রান্ত থেকে মোহনা-মুখী নদী — তিনটে জায়গায় থামতেই হবে। শীতের ভোরে কুয়াশার ভেতর পাখির ঝাঁক ও মাছ ধরার নৌকার দৃশ্য সবচেয়ে মনকাড়া; ড্রোন উড়াতে চাইলে কর্তৃপক্ষ/স্থানীয়দের অনুমতি নিয়ম মেনে চলুন — এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পানি-অবকাঠামো এলাকা।

উল্লেখ্য, ফেনী নদীর পানি বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের দীর্ঘ আলোচনার কেন্দ্রেও এই নদী — মোহনায় মৌসুমি পানির প্রবাহের ওঠানামা তাই শুধু প্রকৃতির খেয়াল নয়, কূটনীতিরও বিষয়। প্রকল্প এলাকায় দাঁড়িয়ে সেই বৃহত্তর প্রসঙ্গটা ভাবলে ভ্রমণটা আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে।

একদিনের নমুনা পরিকল্পনা

সকাল ৮–৯টায় ফেনী শহর (বা জোরারগঞ্জ) থেকে রওনা → ১০টার মধ্যে প্রজেক্ট → প্রথমে রেগুলেটর ও বাঁধের রাস্তা হাঁটা (১ ঘণ্টা) → লেকে নৌভ্রমণ (১ ঘণ্টা) → দুপুরে স্থানীয় হোটেলে তাজা মাছের খাবার → বিকেলে বায়ুকল পয়েন্ট ও মৎস্য জোনের রাস্তা ধরে ঘোরাঘুরি → সূর্যাস্ত দেখে ফেরা। ঢাকা থেকে গেলে আগের রাতেই ফেনী পৌঁছে থাকলে দিনটা স্বস্তিতে মেলে।

কখন যাবেন

নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি সেরা সময় — লেক পুরো রূপে থাকে, পরিযায়ী পাখি থাকে, পিকনিকের ভিড়ও এই সময়েই (ছুটির দিনে উপচে পড়া ভিড় এড়াতে সকালে পৌঁছান)। বর্ষায় গেট খোলা অবস্থায় পানির তেজ দেখাটাও এক অভিজ্ঞতা, তবে নৌভ্রমণ তখন আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল।

কীভাবে যাবেন

ফেনী শহর থেকে সোনাগাজী প্রায় ২০ কিলোমিটার; সেখান থেকে মুহুরী প্রজেক্ট আরও ১০–২০ কিলোমিটার (গাইডভেদে মোট দূরত্ব ৩০–৪০ কিলোমিটার বলা হয়)। ঢাকা থেকে এনা, শ্যামলী, হানিফসহ বিভিন্ন পরিবহনের বাসে সরাসরি ফেনী (এসি/নন-এসি ভেদে ভাড়া ৪৫০–৬০০ টাকা, সময় ৪–৫ ঘণ্টা)। ফেনীর লালপোল থেকে মিল্লাত, জয়, ফারাবি, প্রতিশ্রুতি পরিবহনের বাসে সোনাগাজী; সেখান থেকে রিজার্ভ সিএনজি (~২০০ টাকা) প্রজেক্ট পর্যন্ত, অথবা বাসে বাদামতলী নেমে রিকশা। চট্টগ্রাম দিক থেকে এলে মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ নেমে সিএনজি রিজার্ভ করে যাওয়া সবচেয়ে সহজ।

থাকা ও খাওয়া

কাছেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডাকবাংলো আছে (অনুমতি/বুকিং সাপেক্ষ)। সোনাগাজীতে জেলা পরিষদ ডাকবাংলো ও সাধারণ আবাসিক হোটেল; বিস্তৃত বিকল্পের জন্য ফেনী শহরে বিভিন্ন মানের হোটেল রয়েছে। প্রজেক্ট এলাকার খাবার মূলত স্থানীয় হোটেল-দোকান নির্ভর — পিকনিকে এলে অনেকেই খাবার সঙ্গে করে আনেন। প্রজেক্টের মাছের খামারের কারণে স্থানীয়ভাবে তাজা মাছের নানা পদ পাওয়া যায় — সুযোগ থাকলে চেখে দেখুন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

মুহুরী প্রজেক্টে প্রবেশ ফি লাগে?

প্রকল্প এলাকা উন্মুক্ত — সাধারণত কোনো প্রবেশ ফি নেই; নৌকা ও যানবাহনের ভাড়াই মূল খরচ।

বায়ুকলগুলো কি এখনো চলে?

ইউনিটগুলো দেশের প্রথম বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে; কোনো নির্দিষ্ট সময়ে কতটা উৎপাদন হচ্ছে তা স্থানীয়ভাবে জেনে নিন।

পরিবার নিয়ে পিকনিকে যাওয়া যাবে?

হ্যাঁ — শীতে এখানে পিকনিকের ভিড়ই সবচেয়ে বেশি। নিজেদের আবর্জনা সঙ্গে করে ফেরত আনুন; লেকের পানি ও পাখিদের অভয়ারণ্য পরিষ্কার রাখুন।

শেষকথা

সেচ, বিদ্যুৎ, মাছ আর পাখি — মুহুরী প্রজেক্ট বাংলাদেশের ‘কাজের প্রকল্প’ থেকে ‘ভ্রমণের ঠিকানা’ হয়ে ওঠার সেরা উদাহরণ। মোহনার ওপারের দ্বীপজীবন দেখতে হলে এরপরের গন্তব্য হতে পারে সন্দ্বীপ ভ্রমণ গাইড।