"আমার বাড়ি যাইও ভ্রমর, বসতে দিবো পিঁড়ে" — পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের সেই আতিথ্যের ডাক আজও সত্যি ফরিদপুরের গোবিন্দপুর গ্রামে: কুমার নদের তীরে তাঁর টিনের ঘরের বাড়িতে দর্শনার্থীদের জন্য দরজা খোলা। আর বাড়ির উত্তর পাশে, পারিবারিক কবরস্থানে একটি ডালিম গাছের তলে শুয়ে আছেন কবি নিজে — হুবহু যেমনটি তিনি লিখেছিলেন তাঁর অমর কবিতা "কবর"-এ: "এইখানে তোর দাদির কবর ডালিম গাছের তলে।" সাহিত্য আর বাস্তব এমন মিলে যাওয়া বাংলাদেশে বিরল।
কবির জীবন এক নজরে
জসীমউদ্দীনের জন্ম ১৯০৩ সালের ১ জানুয়ারি, ফরিদপুরের তাম্বুলখানা গ্রামে মামাবাড়িতে; পৈতৃক বাড়ি এই গোবিন্দপুরেই (বাংলাপিডিয়া/ডেইলি স্টার)। প্রথম কাব্যগ্রন্থ "রাখালি" প্রকাশিত হয় ১৯২৭ সালে (বাংলাপিডিয়া); "নক্সী কাঁথার মাঠ"-এর মতো কাব্যে তিনি গ্রামবাংলার মাটি-মানুষকে বাংলা সাহিত্যের কেন্দ্রে এনে দেন — তাই উপাধি "পল্লীকবি"। ১৯৭৬ সালের মার্চে ঢাকায় মৃত্যুর পর তাঁকে নিজের গ্রামে এনে ডালিম গাছের তলায় সমাহিত করা হয় (বাংলাপিডিয়া/আদারব্যাপারী)। সাহিত্যিকের বাড়ি হিসেবে এই জায়গাটি হুমায়ূন আহমেদের নুহাশ পল্লী কিংবা মীর মশাররফ হোসেনের লাহিনীপাড়ার স্মৃতিবাড়িগুলোর সঙ্গেই এক সারিতে পড়ে।
বাড়িতে যা দেখবেন
প্রায় এক একর জমির ওপর (ডেইলি স্টার) বাড়িটিতে আছে চারটি পুরনো টিনের চালা ঘর (আদারব্যাপারী)। ঘরগুলোতে সংরক্ষিত কবির ব্যবহৃত জিনিসপত্র — বিছানা, চেয়ার, ক্যামেরা, তৈজসপত্র ও ছবি (ঘুরুঞ্চি/আলোনলি ট্রাভেলার); চত্বরজুড়ে প্রদর্শিত কবির নানা রচনার উদ্ধৃতি ও চিত্র। জন্মভিটা, পড়ার ঘর, মায়ের রান্নাঘর, ঢেঁকিঘর এমনকি কবির বাসরঘর পর্যন্ত সাজিয়ে রাখা হয়েছে (ঘুরুঞ্চি)। বাড়িটি পরিবারের উদ্যোগে সংরক্ষিত (ঘুরুঞ্চি); উত্তর পাশেই কবরস্থান — কবির কবরের পাশে বাবা আনছার উদ্দিন মোল্লা, মা আমেনা খাতুন, স্ত্রী মমতাজ জসীমউদ্দীনসহ পরিবারের অনেকের কবর (আদারব্যাপারী)। বাড়ির উল্টো দিকে নদীর পাড়ে টাঙানো একটি বোর্ডে লেখা আছে কবি নজরুলের এখানে বসে কবিতা লেখার স্মৃতিকথা — স্থানীয়দের কাছে প্রিয় গল্প (ঘুরুঞ্চি)।
কুমার নদ আর জসিম মেলা
বাড়ির গা ঘেঁষে বয়ে গেছে কুমার নদ — কবির অসংখ্য কবিতার পটভূমি এই নদী আর তার পাড়ের মাঠ। বিকেলে নদীর ধারে সূর্যাস্ত দেখা এই সফরের অন্যতম সেরা অংশ (আলোনলি ট্রাভেলার)। আর কবির জন্মদিন ঘিরে জানুয়ারির শুরুতে এখানে জসিম মেলা বসার ঐতিহ্য আছে (আলোনলি ট্রাভেলার) — মেলার সময় গেলে গ্রামীণ উৎসবের রূপটাও দেখা যায়।
যাতায়াত
বাড়িটি ফরিদপুর সদর উপজেলার অম্বিকাপুর এলাকায়, ফরিদপুর শহর/বাসস্ট্যান্ড থেকে মাত্র প্রায় ২ কিলোমিটার (আদারব্যাপারী/আলোনলি ট্রাভেলার) — রিকশা বা অটোতে সহজেই যাওয়া যায়। নামমাত্র টিকিটে প্রবেশ (ঘুরুঞ্চি; মূল্য বদলাতে পারে)। বাড়িটি একটি বসতবাড়ি-ভিত্তিক স্মৃতিস্থান — ঘরের ভেতরের জিনিসপত্র হাতে নেবেন না, কবরস্থানে নীরবতা বজায় রাখুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
জসীমউদ্দীনের বাড়ি কোথায়?
ফরিদপুর সদরের গোবিন্দপুর গ্রামে, কুমার নদের তীরে, অম্বিকাপুর রেলস্টেশনের উত্তরে (আদারব্যাপারী)।
কবির কবর কোথায়?
বাড়ির উত্তর পাশে পারিবারিক কবরস্থানে, ডালিম গাছের তলে — তাঁর "কবর" কবিতার মতোই (ডেইলি স্টার)।
বাড়িতে কী দেখবেন?
চারটি টিনের ঘরে কবির ব্যবহৃত জিনিসপত্র, রচনার প্রদর্শনী, কবরস্থান ও কুমার নদের পাড় (ঘুরুঞ্চি)।
জসিম মেলা কখন হয়?
ঐতিহ্যগতভাবে জানুয়ারির শুরুতে, কবির জন্মদিন (১ জানুয়ারি) ঘিরে (আলোনলি ট্রাভেলার)।
ফরিদপুর শহর থেকে কত দূর?
মাত্র প্রায় ২ কিলোমিটার; রিকশা-অটোতে যাওয়া যায় (আদারব্যাপারী)।
শেষকথা
জসীমউদ্দীনের বাড়ি কোনো জাঁকজমকপূর্ণ জাদুঘর নয় — এটি তাঁর কবিতারই সম্প্রসারণ: টিনের ঘর, মাটির উঠান, ডালিম গাছ আর নদীর হাওয়া। বাংলা সাহিত্যের পাঠক হোন বা না হোন, কুমার নদের তীরে এই নীরব দুপুরটা আপনার মনে থেকে যাবে।