• 30 Oct, 2026

মাগুরার শ্রীপুরে দুটি সাহিত্য-ছোঁয়া ঐতিহ্য — প্রতাপাদিত্যের পুত্রবধূ বিভা পালের শ্রীপুর জমিদার বাড়ি, যার গল্প নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন "বৌঠাকুরানীর হাট"; আর মুজদিয়া গ্রামে কুমার নদের তীরে "শিক্ষকের মর্যাদা" খ্যাত কবি কাজী কাদের নওয়াজের ভগ্নপ্রায় বাড়ি।

মাগুরার শ্রীপুর উপজেলায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে বাংলা সাহিত্যের দুটি বিখ্যাত ঠিকানা। একটি জমিদার বাড়ি, যার মেয়ের জীবনের গল্প তুলে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন তাঁর প্রথম উপন্যাসগুলোর একটি — "বৌঠাকুরানীর হাট"। অন্যটি এক কবির বাড়ি, যাঁর "শিক্ষকের মর্যাদা" কবিতা প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাঠ্যবইয়ে পড়েছে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা। দুটি বাড়িই আজ ভগ্নপ্রায় — কিন্তু সেই ভাঙনের মধ্যেই তাদের দেখার তাড়না সবচেয়ে বেশি।

শ্রীপুর জমিদার বাড়ি: বিভা পাল, উদয়াদিত্য আর বৌঠাকুরানীর হাট

শ্রীপুর উপজেলা সদর থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে, শ্রীপুর-সাচিলাপুর সড়কের পাশেই পাল রাজার প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ — শ্রীপুর জমিদার বাড়ি। স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, সারদারঞ্জন পাল চৌধুরী নবাব আলীবর্দী খাঁর কাছ থেকে এই জমিদারি কিনে নেন (ভ্রমণগাইড/বাংলাদেশ পোস্ট)। তাঁর মেয়ে বিভা পাল চৌধুরীর বিয়ে হয় বাংলার বারো ভূঁইয়ার অন্যতম, যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের ছেলে উদয়াদিত্যের সঙ্গে; প্রতাপাদিত্যের আর্থিক সহায়তায় সারদারঞ্জন নির্মাণ করেন এই প্রাসাদোপম বাড়ি (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)। রাজকীয় জেদি শ্বশুর প্রতাপাদিত্য আর সহজ-সরল বাবা সারদারঞ্জনের বিপরীত চরিত্রের টানাপোড়েনে বিভা-উদয়াদিত্যের দাম্পত্য জীবন করুণ হয়ে ওঠে — এই কাহিনি নিয়েই রবীন্দ্রনাথ রচনা করেন "বৌঠাকুরানীর হাট", যেখানে বিভা পালের চরিত্রের নাম "সুরমা" (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)। উদয়াদিত্য স্ত্রীকে নিয়ে প্রায়ই এই বাড়িতে আসতেন বলেও ইতিহাসে উল্লেখ আছে। আজ বাড়িটির প্রধান সাক্ষী ভগ্ন সিংহদ্বার — ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে (২০১৭) দেয়ালে ফাটল আর সিলিং থেকে খসে পড়া প্লাস্টারের ছবি উঠে এসেছে; স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি, এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে সংরক্ষণ করা হোক। শ্রীপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজের সাবেক শিক্ষক ও গবেষক মাজেদা খাতুনের ভাষ্যে, এটি "আমাদের গৌরবময় ঐতিহ্য" এবং অনন্য পর্যটন কেন্দ্র হতে পারত (বাংলাদেশ পোস্ট); জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও জেলার ঐতিহাসিক স্থানগুলো সংরক্ষণের চিন্তার কথা জানানো হয়েছে (বাংলাদেশ পোস্ট)।

মুজদিয়ায় কবি কাজী কাদের নওয়াজের বাড়ি

শ্রীপুর উপজেলারই মুজদিয়া গ্রামে, কুমার নদের তীরে দাঁড়িয়ে কবি কাজী কাদের নওয়াজের প্রাসাদোপম বাড়ি — দোতলা ভবনটিতে ১০টি কক্ষ, প্রশস্ত বারান্দা, ২৫ ইঞ্চি পুরু দেয়াল আর ৩০টি স্তম্ভ; ভবনটি মূলত ২০০ শতক জমির উপর (ডেইলি স্টার)। কবির জন্ম ১৯০৯ সালের ১৫ জানুয়ারি মুর্শিদাবাদে মামাবাড়িতে, পৈতৃক নিবাস বর্ধমানের মঙ্গলকোটে; কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এমএ করে শিক্ষকতায় কাটে তাঁর জীবনের বড় অংশ — দিনাজপুর জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে অবসর নেন তিনি (ডেইলি স্টার)। অবসরের পর মুজদিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন; ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেন (ভ্রমণগাইড); ১৯৮৩ সালের ৩ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর শ্রেষ্ঠ পরিচয় অবশ্য কবিতায় — "শিক্ষকের মর্যাদা" তাঁর সবচেয়ে পরিচিত রচনা (ঢাকা ট্রিবিউন)।

দুই বাড়িরই বর্তমান অবস্থা: গৌরব আর অবহেলা

ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন (২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭) অনুযায়ী, কাদের নওয়াজের বাড়িটিও তখনই ছিল ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে — সিলিং থেকে খসে পড়ছে প্লাস্টার, দেয়াল ও ছাদ বেয়ে উঠেছে গাছপালা, কক্ষগুলো ময়লা-আবর্জনায় ভরা; কবির মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীরা বাড়িটি বিক্রি করে দিয়েছেন, আর সংস্কারে প্রয়োজন বড় অঙ্কের অর্থ। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বাড়ির টেরাকোটার সৌকর্য হারানো আর স্থানীয়দের ইট-দরজা-জানালা খুলে নেওয়ার কথাও এসেছে। কবি ও তাঁর আত্মীয়দের কবর বাড়িটির পাশেই (ঢাকা ট্রিবিউন) — দর্শনার্থী গেলে সম্মানের সঙ্গে কবরস্থানটির পাশ দিয়ে যান। দুটি বাড়ির ক্ষেত্রেই পরামর্শ একটাই: ছবি তুলুন বাইরে থেকে, ভগ্ন কাঠামোর ভেতরে ঢুকবেন না, আর মনে রাখুন — পরিচর্যার অভাবে হারিয়ে যাওয়ার আগেই এই স্থাপনাগুলো দেখে যাওয়া এক ধরনের দায়িত্বও।

কীভাবে যাবেন

মাগুরা সদর থেকে শ্রীপুর উপজেলা সদর প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তরে — বাস চলাচল করে (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস/আদার বেপারী)। শ্রীপুর স্ট্যান্ড থেকে জমিদার বাড়ি রিকশা-ইজিবাইকে মাত্র এক কিলোমিটার; মুজদিয়া গ্রামের কবির বাড়িও একই উপজেলায় — স্থানীয় পরিবহনে দুটোই এক বেলায় দেখা যায়। কাছাকাছি ঐতিহ্য-জুটি হিসেবে আগের দিন মোহাম্মদপুরের সীতারাম রাজধানী দেখে নিন — প্রতাপাদিত্যের যুগেরই আরেক রাজকাহিনি; আর বিভার শ্বশুরবাড়ির রাজধানী দেখতে চাইলে সাতক্ষীরার ঈশ্বরীপুরের যশোরেশ্বরী মন্দির এই তালিকার স্বাভাবিক সম্প্রসারণ।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

বৌঠাকুরানীর হাটের সঙ্গে শ্রীপুরের সম্পর্ক কী?

জমিদার সারদারঞ্জন পাল চৌধুরীর মেয়ে বিভা পালের বিয়ে হয়েছিল প্রতাপাদিত্যের ছেলে উদয়াদিত্যের সঙ্গে; তাঁদের করুণ দাম্পত্যের কাহিনি নিয়ে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস — বিভাই উপন্যাসের "সুরমা" (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)।

জমিদার বাড়িটি কোথায়, এখন কী অবস্থা?

শ্রীপুর উপজেলা সদর থেকে ~১ কিলোমিটার, মাগুরা সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার উত্তরে। প্রাসাদের মধ্যে টিকে আছে ভগ্ন সিংহদ্বার ও কক্ষসমূহ; সংস্কারের অভাবে ধ্বংসের পথে (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)।

কাজী কাদের নওয়াজ কে ছিলেন?

বাংলা সাহিত্যের কবি ও শিক্ষাবিদ (১৯০৯–১৯৮৩), "শিক্ষকের মর্যাদা" কবিতার জন্য সর্বাধিক পরিচিত; দিনাজপুর জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন, অবসরের পর মুজদিয়ায় বসবাস ও সেখানেই মৃত্যু।

কবির বাড়িতে কী দেখা যায়?

কুমার নদের তীরে দোতলা প্রাসাদোপম বাড়ি — ১০ কক্ষ, ৩০ স্তম্ভ, পুরু দেয়াল (ডেইলি স্টার); পাশে কবি ও আত্মীয়দের কবর। তবে ভবনটি ভগ্নপ্রায় — ভেতরে প্রবেশ না করাই নিরাপদ।

দুটো বাড়ি কি একদিনে দেখা যায়?

হ্যাঁ — দুটোই শ্রীপুর উপজেলায়; এক বেলায়ই দুটো দেখে ফেলা যায়।

শেষকথা

একই উপজেলায় দুটি বাড়ি — একটি উপন্যাসের জন্ম দিয়েছে, অন্যটি এক কবির জীবনের আর্কাইভ। শ্রীপুরের এই ভাঙা ইটের দেয়ালগুলো আসলে বাংলা সাহিত্যেরই পৃষ্ঠা; পৃষ্ঠাগুলো ছিঁড়ে যাওয়ার আগেই একবার চোখে দেখে যান।