খুলনাকে বেশির ভাগ মানুষ চেনে সুন্দরবনে যাওয়ার পথের শহর হিসেবে — রাতের ট্রেনে পৌঁছে ভোরে লঞ্চে উঠে সোজা বনে। কিন্তু রূপসা আর ভৈরব নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা এই বিভাগীয় শহরটা নিজেও অন্তত একদিনের গন্তব্য হওয়ার যোগ্য: এখানে আছে দেশের অন্যতম বড় জাদুঘর, গান্ধী থেকে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত ইতিহাস জমে থাকা একটি পার্ক, আর সন্ধ্যাবেলা পুরো শহর যেখানে হাঁটতে বেরোয় — রূপসা নদীর উপর সেই খানজাহান আলী সেতু। সুন্দরবন ট্যুরের আগের বা পরের দিনটা খুলনায় রেখে দিলে এই শহর হতাশ করবে না।
খুলনা বিভাগীয় জাদুঘর: দক্ষিণের ইতিহাস এক ছাদে
শিববাড়ী মোড়ে, জিয়া পাবলিক হলের পাশে ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত খুলনা বিভাগীয় জাদুঘর আয়তনের দিক থেকে দেশের বৃহত্তম জাদুঘরগুলোর একটি; প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই জাদুঘর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইতিহাসের সেরা প্রবেশদ্বার। ভেতরে সাজানো আছে গুপ্ত, পাল, সেন, মোগল ও ব্রিটিশ আমলের নিদর্শন — পোড়ামাটি আর কষ্টি পাথরের মূর্তি, মোগল আমলের স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, প্রাচীন তৈজসপত্র, অস্ত্র আর শিলালিপি। বিশেষ আকর্ষণ খননকাজ থেকে পাওয়া নিদর্শনগুলো: ঝিনাইদহের বারবাজার, যশোরের ভরত ভায়না আর বাগেরহাটে খান জাহান আলীর সমাধি প্রাঙ্গণ থেকে ওঠা প্রত্নবস্তু এখানেই সংরক্ষিত। সুন্দরবন ভ্রমণকারীদের জন্য বাড়তি পাওনা এখানকার পৃথক সুন্দরবন গ্যালারি, আর ওঠার সিঁড়িঘরজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্র। সাধারণ দর্শনার্থীর প্রবেশমূল্য মাত্র ২০ টাকা (বিদেশি পর্যটকের জন্য ১০০ টাকা)। জাদুঘর সাধারণত মঙ্গলবার থেকে শনিবার খোলা থাকে (গ্রীষ্মে সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা, শীতে সকাল ৯টা–বিকেল ৫টা), রবিবার বন্ধ আর সোমবার অর্ধদিবস — যাওয়ার আগে সূচিটা যাচাই করে নিন। রাজধানীর সংগ্রহের সঙ্গে তুলনা টানতে চাইলে আমাদের বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর পোস্টটিও পড়ে দেখতে পারেন।
শহীদ হাদিস পার্ক: যে মাঠে ইতিহাস কথা বলে
পি সি রায় রোডে, বাংলাদেশ ব্যাংক খুলনা শাখার ঠিক পশ্চিমে শহরের প্রাণকেন্দ্রের এই পার্কটির বয়স প্রায় দেড় শতক। ১৮৮৪ সালে 'খুলনা মিউনিসিপ্যাল পার্ক' নামে যাত্রা শুরু; ১৯২৫ সালের ১৬ জুন এখানে বক্তৃতা দেন মহাত্মা গান্ধী, তাঁর সম্মানে নাম হয় গান্ধী পার্ক। দেশভাগের পর কিছুকাল জিন্নাহ পার্ক নাম থাকলেও শেষ পর্যন্ত পার্কটির নাম জড়িয়ে গেছে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে: ১৯৬৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আইয়ুববিরোধী মিছিলে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন বাগেরহাটের তরুণ শেখ হাদিসুর রহমান বাবু — তারপর থেকেই এটি শহীদ হাদিস পার্ক। পার্কের ভেতরে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে নির্মিত নতুন শহীদ মিনার, বড় পুকুরের উপর ঝুলন্ত ছোট সেতু আর সন্ধ্যায় রঙিন আলোর ফোয়ারা এখন জায়গাটির পরিচয়। সকালে শত মানুষের হাঁটা-যোগব্যায়াম, বিকেলে পরিবার নিয়ে ভিড় — খুলনার সামাজিক জীবনের প্রাণ এই পার্ক। প্রবেশ বিনামূল্যে; সকাল থেকে রাত পর্যন্ত খোলা থাকে।
জাতিসংঘ পার্ক ও শহরের আরও সবুজ
খানজাহান আলী রোডে অবস্থিত জাতিসংঘ শিশু পার্ক শহরের আরেক পরিচিত সবুজ ঠিকানা — ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ও ১৯৯৫ সালে উদ্বোধন করা এই পার্কটি বিশেষ করে শিশুদের রাইড আর পারিবারিক বিকেলের জন্য জনপ্রিয়। এছাড়া গল্লামারী লিনিয়ার পার্ক ময়ূর নদীর পাড় ধরে হাঁটার সুন্দর জায়গা। হাতে সময় থাকলে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাস এলাকা বা কবি কৃষ্ণচন্দ্র ইনস্টিটিউটের দিকেও একবার ঘুরে আসা যায় — শহরের ভেতরের এই জায়গাগুলো মিলিয়ে খুলনার একটা স্বস্তির, ধীর ছবি তৈরি হয়।
খানজাহান আলী সেতু ও রূপসার পাড়ে সন্ধ্যা
খুলনা ভ্রমণের সেরা মুহূর্তটা রাখা আছে দিনের শেষে — খানজাহান আলী সেতুতে সূর্যাস্ত। রূপসা নদীর উপর প্রায় দেড় কিলোমিটার লম্বা এই সেতু (রূপসা সেতু নামেও পরিচিত) জাপানি সহায়তায় নির্মিত হয়ে চালু হয় ২০০৫ সালের ২১ মে; শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরের এই সেতুই খুলনাকে মংলা বন্দর ও দক্ষিণের জেলাগুলোর সঙ্গে যুক্ত করেছে বলে একে বলা হয় খুলনার প্রবেশদ্বার। সেতুর বিশেষত্ব হলো দুই প্রান্তে দুটি করে মোট চারটি সিঁড়ি — পথচারীরা সিঁড়ি বেয়ে মূল সেতুতে উঠে হাঁটতে পারেন, পাশাপাশি আছে অযান্ত্রিক যানের আলাদা লেন। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেতুর উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নিচে রূপসার জল, দূরে শহরের আলো আর নদীতে লঞ্চ-ট্রলারের চলাচল দেখা যায়। সেতুর খুলনা প্রান্তে রূপসা ঘাট আর জেলখানা ঘাট এলাকাটাও দেখে নিন — এখান থেকেই ভোরে সুন্দরবনের পর্যটক জাহাজগুলো ছাড়ে (বিস্তারিত আমাদের সুন্দরবন ভ্রমণ গাইডে)। সন্ধ্যার পর ঘাটের পাড়ে চা আর হালকা খাবারের দোকানগুলোতে বসে নদীর হাওয়া খাওয়াটা খুলনা ভ্রমণের স্বাভাবিক সমাপ্তি।
একদিনে খুলনা: নমুনা সূচি
সকালে পৌঁছে প্রথমে শিববাড়ী মোড়ের বিভাগীয় জাদুঘর (খোলার সময় ধরে সকাল ১০টার দিকে গেলে ভিড় কম) — দেড় থেকে দুই ঘণ্টা রাখুন। দুপুরে শহরের কোনো পরিচিত রেস্তোরাঁয় খেয়ে বিকেলের শুরুতে শহীদ হাদিস পার্ক; পুকুরপাড়ে হেঁটে, শহীদ মিনার দেখে ঘণ্টাখানেক কাটান। শিশু সঙ্গে থাকলে মাঝে জাতিসংঘ পার্কেও ঢুঁ মারা যায়। বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ রওনা দিন খানজাহান আলী সেতুর দিকে — সূর্যাস্ত সেতু থেকে দেখে, সন্ধ্যায় রূপসা ঘাটে চা খেয়ে দিন শেষ। সুন্দরবন ট্যুর থাকলে এই সূচিটা ট্যুরের আগের দিনে রাখলে পরদিন ভোরের জাহাজ ধরতে সুবিধা হয়।
কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে খুলনা যাওয়ার উপায় তিনটি — বাস, ট্রেন আর সড়কপথে নিজের গাড়ি। ট্রেনে সুন্দরবন এক্সপ্রেস, চিত্রা এক্সপ্রেস, রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস ও বেনাপোল এক্সপ্রেস কমলাপুর থেকে খুলনা যায়; রাতের ট্রেনে গেলে সকালে পৌঁছে সারাদিন হাতে থাকে। বাস ছাড়ে গাবতলী, সায়েদাবাদ ও কল্যাণপুর থেকে, নামতে হয় সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনালে। যশোর বিমানবন্দর ব্যবহার করে সড়কপথে খুলনা আসাও একটি বিকল্প — যশোর থেকে খুলনা প্রায় দেড় ঘণ্টার পথ। শহরের ভেতরে চলাচলের জন্য রিকশা ও ইজিবাইকই ভরসা; জাদুঘর, হাদিস পার্ক আর সেতু — তিনটিই শহরের ভেতরে বা কাছাকাছি দূরত্বে।
কোথায় থাকবেন, কী খাবেন
সোনাডাঙ্গা ও শিববাড়ী এলাকায় বিভিন্ন বাজেটের হোটেল আছে — সুন্দরবন ট্যুরের আগের রাত কাটানোর জন্য এই এলাকাই সুবিধাজনক, কারণ সকালে ঘাটের দিকে যাওয়া সহজ। খাবারে খুলনার নিজস্ব গর্ব আছে (তা নিয়ে আমাদের আলাদা পোস্ট আসছে): আপাতত এটুকু জেনে রাখুন, শহরের রেস্তোরাঁগুলোতে গলদা চিংড়ির পদ আর চুইঝাল দিয়ে রান্না খাসির মাংস চেখে না দেখলে খুলনা ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। নদীর তাজা মাছের হোটেলভাতও শহরের সর্বত্র মেলে সহজে।
টিপস
জাদুঘরের বন্ধের দিন (রবিবার) মাথায় রেখে সূচি সাজান। হাদিস পার্কে সকালের দিকটা সবচেয়ে শান্ত; ছুটির দিনের বিকেলে ভিড় বেশি থাকে। সেতুতে হাঁটার সময় যানবাহনের লেন থেকে সরে পথচারী অংশেই থাকুন, আর ঝড়ো আবহাওয়ার দিনে সেতুর মাঝামাঝি না যাওয়াই ভালো। সুন্দরবনের জাহাজ ধরতে হলে আগের রাতে অপারেটরের দেওয়া রিপোর্টিং সময় ও ঘাটের ঠিকানা নিশ্চিত করে রাখুন — ভোরের ঘাটে ভিড় থাকে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
খুলনায় একদিনে কী কী দেখা যায়?
বিভাগীয় জাদুঘর, শহীদ হাদিস পার্ক, জাতিসংঘ পার্ক আর সন্ধ্যায় খানজাহান আলী সেতু — স্বস্তিতে একদিনেই এই চারটি দেখা যায়।
বিভাগীয় জাদুঘর কবে বন্ধ থাকে?
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী রবিবার পূর্ণ বন্ধ ও সোমবার অর্ধদিবস; মঙ্গলবার থেকে শনিবার পূর্ণ সময় খোলা। সরকারি ছুটির দিনে সূচি বদলাতে পারে।
খানজাহান আলী সেতুতে কি হেঁটে ওঠা যায়?
যায় — সেতুর দুই প্রান্তে সিঁড়ি আছে, পথচারীদের জন্য আলাদা অংশও রয়েছে। বিকেল-সন্ধ্যায় এখানে হাঁটতে আসাই স্থানীয়দের প্রিয় অভ্যাস।
খুলনা থেকে সুন্দরবনের জাহাজ কোথা থেকে ছাড়ে?
শহরের রূপসা-জেলখানা ঘাট এলাকা থেকে বেশির ভাগ পর্যটক জাহাজ ছাড়ে; অপারেটরভেদে রিপোর্টিং পয়েন্ট বদলায়, বুকিংয়ের সময় নিশ্চিত করুন।
ঢাকা থেকে খুলনা ট্রেনে কতক্ষণ লাগে?
ট্রেনভেদে মোটামুটি সাত থেকে নয় ঘণ্টা। রাতের ট্রেনে গেলে সকালে পৌঁছে পুরো দিনটা শহর ঘোরায় ব্যবহার করা যায়।
শেষকথা
খুলনা শুধু সুন্দরবনের দরজা নয় — নিজের ইতিহাস, নদী আর ধীর শহুরে ছন্দ নিয়ে সে নিজেই একটি গন্তব্য। সুন্দরবনের পথে একটা দিন এই শহরকে দিলে যাত্রাটা পূর্ণতা পায়: জাদুঘরে দক্ষিণের হাজার বছরের গল্প, হাদিস পার্কে গণমানুষের ইতিহাস, আর শেষে রূপসার উপরে সূর্যাস্ত।