সিআরবি শিরিষতলা ভ্রমণ গাইড: ১৮৭২ সালের রেল ভবন আর বন্দরনগরীর ‘ফুসফুস’
চট্টগ্রামের সিআরবি এলাকার সম্পূর্ণ গাইড — ১৮৭২ সালে নির্মিত সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং, শতবর্ষী শিরিষ-গর্জনের ছায়ায় শিরিষতলা, পয়লা বৈশাখের বলী খেলা আর শহরের প্রিয় আড্ডার চত্বর।

মশাল হাতে আলুটিলার রহস্যময় গুহা, ঢালু পাথরে গড়িয়ে নামা রিসাং ঝর্ণা, ঝুলন্ত সেতুর হার্টিকালচার পার্ক, পাহাড়চূড়ার দেবতা পুকুর আর গহিনের তৈদুছড়া — খাগড়াছড়িতে ঘুরতে যাওয়ার সেরা ৫টি জায়গা নিয়ে সম্পূর্ণ ভ্রমণ গাইড।
তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে খাগড়াছড়ি যেন সবচেয়ে কম চেনা, অথচ বিস্ময়ে ভরপুর। অনেকের কাছে জেলাটা শুধু সাজেক যাওয়ার পথের নাম — কিন্তু খাগড়াছড়ি নিজেই লুকিয়ে রেখেছে অন্ধকার রহস্যময় গুহা, ঢালু পাথর বেয়ে গড়িয়ে নামা ঝর্ণা, পাহাড়ের চূড়ায় কখনো না-শুকানো পুকুর আর গহিন বনের ঝর্ণা। পাহাড়ের বাকি দুই জেলার কথা আমরা ঘোরাফেরায় আগেই বলেছি — যেমন ‘বান্দরবান - মেঘ পাহাড়ের দেশ’ লেখাটি। এবার খাগড়াছড়ির পালা।
বেছেছি এমন ৫টি জায়গা, যা দিয়ে জেলাটার সব রূপ ধরা পড়ে: রোমাঞ্চের জন্য আলুটিলা গুহা, গা ভেজানোর জন্য রিসাং ঝর্ণা, পরিবার নিয়ে আরামের জন্য ঝুলন্ত সেতুর পার্ক, লোককথা আর প্রশান্তির জন্য দেবতা পুকুর, আর খাঁটি ট্রেকিংয়ের জন্য তৈদুছড়া।
এক নজরে:
Table of contents [Show]
খাগড়াছড়ির সবচেয়ে বিখ্যাত ঠিকানা আলুটিলা। শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার পশ্চিমে, প্রায় ৩,০০০ ফুট উঁচু আলুটিলা (আরবারী) পাহাড়ের চূড়ায় পর্যটন কেন্দ্র — এখান থেকে পুরো খাগড়াছড়ি শহর আর আঁকাবাঁকা চেঙ্গী নদী দেখা যায় পাখির চোখে, বিশেষ করে তারেং ভিউ পয়েন্ট থেকে। কিন্তু আসল আকর্ষণ পাহাড়ের ভেতরে।
স্থানীয়দের কাছে ‘মাতাই হাকড়’ বা ‘দেবতার গুহা’ নামে পরিচিত প্রায় ৩৫০ ফুট লম্বা প্রাকৃতিক সুড়ঙ্গ-গুহাটিতে সূর্যের আলো পৌঁছায় না একদমই। ফটক থেকে টিকিট কেটে, সিঁড়ি বেয়ে নেমে, মশাল বা টর্চের আলোয় গুহায় ঢুকতে হয়; পায়ের নিচে শীতল ঝরনার পানি, মাথার ওপর পাথুরে ছাদ — কোথাও আবার ছাদ এত নিচু যে মাথা নুইয়ে, এমনকি হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে হয়। এক মুখ দিয়ে ঢুকে অন্য মুখ দিয়ে বের হতে লাগে ১০–১৫ মিনিট, কিন্তু রোমাঞ্চটা মনে থাকে অনেক দিন।
সেরা সময়: সারা বছরই যাওয়া যায়; বর্ষায় গুহার ভেতরের পানির ধারা বেশি থাকে।
জেনে রাখুন: পর্যটন কেন্দ্রের প্রবেশ টিকিট আনুমানিক ৪০–৫০ টাকা; গুহার মুখে মশাল কিনতে পাওয়া যায় (মোবাইলের টর্চও চলবে)। ভেতরটা পিচ্ছিল — শক্ত গ্রিপের জুতা পরুন। সিঁড়ি মিলিয়ে ওঠানামা বেশ খানিকটা, বয়স্কদের ক্ষেত্রে ধীরে যান।
আলুটিলা থেকে মাত্র ২–৩ কিলোমিটার দূরে, মাটিরাঙ্গার সাপমারা গ্রামে রিসাং ঝর্ণা — শহর থেকে মোট প্রায় ১১ কিলোমিটার। মারমা ভাষায় ‘রিসাং’ মানে উঁচু জায়গা থেকে গড়িয়ে পড়া পানি; নামের মতোই এই ঝর্ণা খাড়া পাহাড় থেকে ঝাঁপ দেয় না, বরং প্রায় ৩০ মিটার উঁচু ঢালু পাথরের গা বেয়ে স্লাইডের মতো গড়িয়ে নামে। এ কারণেই রিসাংয়ে পর্যটকরা শুধু ছবি তোলে না, পানিতে নেমে গা ভিজিয়ে নেয় নির্দ্বিধায়।
পাকা সিঁড়িপথ বেয়ে ঝর্ণার কাছে পৌঁছানো সহজ। আরেকটু ভেতরে, প্রায় ২০০ গজ দূরে আছে দ্বিতীয় ঝর্ণা ‘অপু ঝর্ণা’ — হাতে সময় থাকলে সেটাও দেখে আসুন। চারদিকে জুমের পাহাড়, বুনো ফুল আর পাখির ডাক মিলিয়ে জায়গাটা পিকনিকের জন্যও দারুণ।
সেরা সময়: বর্ষা ও বর্ষার ঠিক পরে (জুন–অক্টোবর) পানি সবচেয়ে বেশি; শীতে ধারা কমে যায়।
জেনে রাখুন: গাড়ি ঝর্ণা থেকে কিছুটা দূরে নামিয়ে দেয়, বাকি পথ হাঁটা। ভেজা পাথর পিচ্ছিল — সাবধানে নামুন, আর অতিরিক্ত এক সেট কাপড় সঙ্গে রাখলে গা ভেজানোটা নিশ্চিন্তে উপভোগ করা যায়।
শহরের জিরো মাইল এলাকায়, শহর থেকে মাত্র ৩–৪ কিলোমিটার দূরে ২২ একর পাহাড় জুড়ে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের হার্টিকালচার হ্যারিটেজ পার্ক। পার্কের প্রাণ হলো দুটি পাহাড়কে জোড়া লাগানো ঝুলন্ত সেতু — হাঁটলে সেতুটা অল্প দুলে ওঠে, সেই দোলাটাই ছেলে-বুড়ো সবার আনন্দ।
এ ছাড়া আছে পাহাড়ের ভাঁজে কৃত্রিম লেক (বোট রাইডিংসহ), টয় ট্রেন, কিডস জোন, দোলনা, সুইমিং পুল, অবজারভেশন টাওয়ার, ফুল-ফলের বাগান আর পিকনিক স্পট; সম্প্রতি যোগ হয়েছে জিপলাইন ও জায়ান্ট সুইংয়ের মতো রাইডও। পশ্চিম পাশ থেকে খাগড়াছড়ি শহরের ভিউটা বিকেলে অসাধারণ লাগে।
সেরা সময়: বিকেল; ছুটির দিনে ভিড় বেশি থাকে।
জেনে রাখুন: পার্ক সাধারণত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে, প্রবেশ ফি জনপ্রতি আনুমানিক ৩০–৪০ টাকা; রাইডগুলোর খরচ আলাদা।
খাগড়াছড়ি-মহালছড়ি-রাঙামাটি সড়কে শহর থেকে প্রায় ১১–১২ কিলোমিটার গেলে মাইসছড়ি; সেখান থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার পশ্চিমে নুনছড়ি ত্রিপুরা গ্রাম। গ্রাম ছাড়িয়ে প্রায় দেড় হাজার সিঁড়ি বেয়ে পাহাড়ের চূড়ায় উঠলেই অবিশ্বাস্য দৃশ্য — চূড়ার ওপর প্রায় ৫ একর জুড়ে টলটলে পানির পুকুর, দেবতা পুকুর বা মাতাই পুখিরি।
ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, জলদেবতা নিজে স্থানীয়দের জন্য এই পুকুর খনন করেছেন; এত উঁচুতে থেকেও এর পানি কখনো শুকোয় না বলে কথিত। প্রতি বছর চৈত্র সংক্রান্তি/বৈসু উপলক্ষে এখানে তীর্থ মেলা বসে, তখন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন। মেলা ছাড়া সময়ে জায়গাটা একদম নীরব — চারদিকে পাহাড়, মাঝখানে স্থির সবুজ পানি।
সেরা সময়: শীতকাল; সিঁড়ি ওঠা গরমে বেশ কষ্টের। তীর্থ মেলার অভিজ্ঞতা চাইলে চৈত্র সংক্রান্তির সময়টা বেছে নিন।
জেনে রাখুন: এটি সক্রিয় তীর্থস্থান — পুকুর ও চত্বরের পবিত্রতা রক্ষা করুন, আবর্জনা ফেলবেন না। পথে পানির ব্যবস্থা সীমিত, সঙ্গে পানি রাখুন।
খাগড়াছড়ির সবচেয়ে বড় ঝর্ণা বলা হয় তৈদুছড়াকে — আর সবচেয়ে দুর্গমও। এখানে ঝর্ণা একটা নয়, ধাপে ধাপে দুটি: প্রথমটি প্রায় ৬০ ফুট উঁচু থেকে পাথুরে ধাপ বেয়ে নামে, তার পাশের খাড়া ঢাল বেয়ে উঠলে দ্বিতীয়টি। মাঝখানের পথ ঝিরি-পথে হাঁটুপানি, কোথাও বুকপানি পেরিয়ে, চারদিকে ঘন বন আর পাহাড়ি গ্রাম।
দুটি রুট আছে: সহজটা সীমানা পাড়া হয়ে — শাপলা মোড় থেকে দীঘিনালার পথে প্রায় ৯ কিলোমিটার গিয়ে নামতে হয়, সেখান থেকে গ্রাম পর্যন্ত হাঁটা, তারপর গাইড নিয়ে ট্রেকিং (পথে আরেকটি ঝর্ণা থাংঝাংও পড়ে)। কঠিন রুটটি দীঘিনালা হয়ে, পোমাংপাড়া থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার ট্রেকিং — ৪–৫ ঘণ্টার হাঁটা। দুটো রুটেই স্থানীয় গাইড নেওয়া জরুরি; দীঘিনালা রুটে বিজিবি থেকে অনুমতি নেওয়ার নিয়মও আছে।
সেরা সময়: বর্ষা ও বর্ষার পরে পানি সবচেয়ে বেশি; শীতে ট্রেকিং সহজ হলেও পানি কম থাকে।
জেনে রাখুন: সকাল ৭টার মধ্যে রওনা দিলে সন্ধ্যার আগে ফেরা যায় — দেরি করবেন না। গ্রিপওয়ালা জুতা, শুকনো খাবার ও পানি সঙ্গে রাখুন; ভেজা কাপড় বদলানোর ব্যবস্থাও সঙ্গে রাখা ভালো।
একদিনে (সবচেয়ে জনপ্রিয় রুট): সকালে আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র ও গুহা, তারপর কাছেই রিসাং ঝর্ণা (গা ভিজিয়ে দুপুর), শহরে ফিরে বিকেলটা হার্টিকালচার পার্কে — ঝুলন্ত সেতুতে সূর্যাস্তের আলো। এই তিনটি একই দিকে ও কাছাকাছি বলে এক চাঁদের গাড়ি রিজার্ভেই হয়ে যায়।
দুদিনে: প্রথম দিন ওপরের রুটটা; দ্বিতীয় দিন ভোরে দেবতা পুকুর (সিঁড়ি ওঠা সকালের ঠান্ডায় সহজ), দুপুরে শহরে ফিরে শাপলা চত্বরের আশপাশ আর নিউজিল্যান্ড পাড়ার সবুজ প্রান্তরে বিকেল। তৈদুছড়া রাখুন তৃতীয় দিনের জন্য — ওটা নিজেই একটা পুরো দিনের অভিযান।
খাগড়াছড়ি পৌঁছানো: ঢাকা থেকে সরাসরি বাস আছে (রাতের বাসে গেলে ভোরে পৌঁছাবেন); চট্টগ্রামের অক্সিজেন মোড় থেকে বাসে প্রায় ৪–৫ ঘণ্টা। আরেকটি জনপ্রিয় তথ্য: সাজেক ভ্যালি রাঙামাটি জেলায় হলেও যাতায়াত খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা হয়েই — তাই সাজেকের ট্রিপের সঙ্গে এই জায়গাগুলো মিলিয়ে নেওয়া যায় সহজে।
খাগড়াছড়ি ভ্রমণের সেরা সময় কখন?
ঝর্ণার জন্য বর্ষা থেকে শরৎ (জুন–অক্টোবর), আর আরামে সব দেখার জন্য শীতকাল (নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি)। কোন জায়গা কোন ঋতুতে সেরা, তা ওপরে প্রতিটি অংশে আলাদা করে দেওয়া আছে।
পরিবার ও শিশুদের জন্য কোনগুলো সহজ?
আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র (গুহা বাদে চূড়ার ভিউ সবার জন্য) ও হার্টিকালচার পার্ক — দুটোই সহজ ও কাছাকাছি। তৈদুছড়া ও দেবতা পুকুরে অনেক হাঁটা ও সিঁড়ি আছে।
খাগড়াছড়ি আর সাজেক কি এক ট্রিপে সম্ভব?
অবশ্যই — সাজেকের রাস্তা দীঘিনালা হয়েই যায়। খাগড়াছড়িতে ২ দিন রেখে তারপর সাজেক যোগ করলেই পূর্ণাঙ্গ পাহাড়ি ট্রিপ।
খাগড়াছড়ি অনেক দিন শুধু ‘সাজেকের পথ’ হয়েই ছিল; অথচ নিজের গুহা, ঝর্ণা আর পাহাড়চূড়ার পুকুর মিলিয়ে এই জেলাই পূর্ণ একটি গন্তব্য। এই ৫টি দিয়ে শুরু করুন — তারপর মন চাইবে পাশের জেলাগুলোর দিকেও: বান্দরবানের মেঘ কিংবা লামার নদী-পাহাড়ের গল্প। আপনার খাগড়াছড়ি ভ্রমণ হোক নিরাপদ আর বিস্ময়ে ভরা!
চট্টগ্রামের সিআরবি এলাকার সম্পূর্ণ গাইড — ১৮৭২ সালে নির্মিত সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং, শতবর্ষী শিরিষ-গর্জনের ছায়ায় শিরিষতলা, পয়লা বৈশাখের বলী খেলা আর শহরের প্রিয় আড্ডার চত্বর।
কালুরঘাটের পূর্ণ গাইড — ১৯৩০ সালের রেল সেতুর ইতিহাস, গঠন ও বর্তমান অবস্থা, আর ১৯৭১-এর ২৬–৩০ মার্চের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ঐতিহাসিক ভূমিকা; যাতায়াত ও দর্শনের বাস্তব টিপসসহ।
কর্ণফুলীতে নৌকা ভ্রমণের ব্যবহারিক গাইড — কোন ঘাট থেকে সাম্পান ভাড়া করবেন, কোন দিকে যাবেন (মোহনা বা কালুরঘাট), ভাড়া ঠিক করার কৌশল, সেরা সময় ও নিরাপত্তা টিপস।


