ঢাকার যান্ত্রিক প্রাণকেন্দ্রে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দুটি সবুজ পরিসর — রমনা পার্ক আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান — আসলে একই ঐতিহাসিক ভূখণ্ডের দুই অধ্যায়। একটি শহরের "ফুসফুস", অন্যটি জাতির জন্মের সাক্ষী ময়দান। পাশেই কার্জন হলের লাল ইট আর শাহবাগের জাতীয় জাদুঘর — চারটি মিলে শাহবাগ-রমনা এলাকাই ঢাকার সবচেয়ে সমৃদ্ধ হাঁটা-পরিসর।
বাগ-ই-বাদশাহী থেকে রমনা পার্ক
বণিক বার্তা ও বাংলা উইকিপিডিয়ার বিবরণ অনুযায়ী, ১৬১০ সালে মোঘল শাসন পাকাপোক্ত হওয়ার পর এখানে তৈরি হয় রাজকীয় বাগান "বাগ-ই-বাদশাহী" — তখন ইস্কাটন থেকে ঢাকা মেডিকেল পর্যন্ত পুরো এলাকাটাই ছিল রমনা। কোম্পানি আমলে এলাকাটি জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়ে; ১৮২৫ সালে ব্রিটিশ কালেক্টর ডয়েসের উদ্যোগে দক্ষিণাংশে ঘোড়দৌড়ের রেসকোর্স গড়ে ওঠে, আরেক অংশ "রমনা গ্রিন" হিসেবে আজকের পার্কের সূচনা করে (বাংলা উইকিপিডিয়া)। ঢাকার নবাবরা এখানে গড়েন "শাহবাগ" নামের রাজকীয় বাগান ও একটি চিড়িয়াখানা (পরে মিরপুরে স্থানান্তরিত)। ১৯০৮ সালে লন্ডনের কিউ গার্ডেনের কর্মী আর. এল. প্রাউডলকের নকশায় পার্কের আধুনিক উন্নয়ন শুরু হয়, যা শেষ হতে লাগে প্রায় ২০ বছর; আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ১৯৪৯ সালে (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। আজকের রমনা পার্ক ৬৮.৫ একর, মাঝখানে প্রায় ৮.৭৬ একরের লেক, শতাধিক প্রজাতির গাছ — কৃষ্ণচূড়া, রেইনট্রি, মহুয়া, পাদাউক (ইংরেজি উইকিপিডিয়া/আরবিএস প্রপার্টি)। পার্কের দক্ষিণ-পশ্চিমের বিখ্যাত বটগাছের ছায়ায় — রমনা বটমূলে — প্রতি পহেলা বৈশাখে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান বসে, যা দিয়ে লাখো মানুষের বাংলা নববর্ষ শুরু হয়।
রেসকোর্স ময়দান থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান
পাশের খোলা মাঠটির ইতিহাস আরও ভারী। ব্রিটিশ আমলের রেসকোর্স ময়দানটিতে পাকিস্তান আমলেই ঘোড়দৌড় নিষিদ্ধ হয়। ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের পর কারামুক্ত শেখ মুজিবুর রহমানকে এই মাঠেই সংবর্ধনা দিয়ে "বঙ্গবন্ধু" উপাধি দেওয়া হয় (বণিক বার্তা)। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ এখান থেকেই তিনি দেন ঐতিহাসিক ভাষণ — "এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম"। আবার ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ এই মাঠেই স্বাক্ষরিত হয় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিল (বণিক বার্তা/ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। স্বাধীনতার পর মাঠটির নাম হয় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান।
আজ যা দেখবেন
৭ মার্চের ভাষণের নির্দিষ্ট স্থানটিতে জ্বলছে শিখা চিরন্তন — ১৯৯৭ সালের ৭ মার্চ নেলসন ম্যান্ডেলা, সুলেইমান দেমিরেল ও ইয়াসির আরাফাতের উপস্থিতিতে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজ্বলিত হয় (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। উদ্যানে আরও রয়েছে স্বাধীনতা স্তম্ভ ও ভূগর্ভস্থ স্বাধীনতা জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ এবং তিন নেতার মাজারের দিকে যাওয়ার পথ। প্রতি ফেব্রুয়ারিতে অমর একুশে বইমেলা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ থেকে বিস্তৃত হয় এই উদ্যান পর্যন্ত — বইমেলার সময় এলাকাটি উৎসবে রূপ নেয়। ব্যবহারিক তথ্য: রমনা পার্ক সাধারণত প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খোলা থাকে এবং প্রবেশ বিনামূল্যে (আরবিএস প্রপার্টি); ভোরেই প্রাতঃভ্রমণকারীদের ভিড় সবচেয়ে বেশি, আর সরকারি অনুষ্ঠান বা বইমেলার দিনে উদ্যানের প্রবেশপথে ভিড় ও নিরাপত্তা-তল্লাশি থাকে — সময় হাতে রাখুন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বড় রাজনৈতিক সমাবেশের দিনগুলোতে সাধারণ ঘোরাঘুরি সীমিত হতে পারে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
রমনা পার্ক কত বড়?
৬৮.৫ একর, মাঝখানে প্রায় ৮.৭৬ একরের লেক; উদ্বোধন ১৯৪৯ সালে (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আগের নাম কী ছিল?
রমনা রেসকোর্স ময়দান — ব্রিটিশ আমলে এখানে ঘোড়দৌড় হতো (বণিক বার্তা)।
৭ই মার্চের ভাষণ কোথায় হয়েছিল?
তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে, আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে — সেই স্থানে এখন শিখা চিরন্তন জ্বলছে (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)।
রমনা বটমূল বিখ্যাত কেন?
প্রতি পহেলা বৈশাখে এখানে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান হয় — বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের প্রাণকেন্দ্র (আরবিএস প্রপার্টি)।
পার্কে প্রবেশে টিকিট লাগে কি?
রমনা পার্কে প্রবেশ সাধারণত বিনামূল্যে; সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খোলা থাকে (আরবিএস প্রপার্টি)।
শেষকথা
একদিকে বটমূলের ভোরের গান, অন্যদিকে শিখা চিরন্তনের অনির্বাণ শিখা — রমনা-সোহরাওয়ার্দী একই মাটিতে ঢাকার আনন্দ আর আত্মত্যাগ দুটোকেই ধরে রেখেছে। এই শহরে ইতিহাসকে সবচেয়ে কাছ থেকে ছুঁতে চাইলে এই দুই সবুজ পরিসরেই তার শুরু।