শরতের ভোরে খুলনা শহর থেকে ঘণ্টা দেড়েকের পথ পাড়ি দিলেই চোখে পড়ে এক অদ্ভুত দৃশ্য — যতদূর চোখ যায় পানি আর পানি, আর সেই পানির বুকে সবুজ পদ্মপাতার গালিচায় মাথা তুলে আছে হাজারো লাল, গোলাপি আর সাদা পদ্ম ও শাপলা। এটি তেরখাদা উপজেলার ভূতিয়ার বিল — নড়াইলের কিছু অংশ নিয়েও বিস্তৃত প্রায় সাড়ে তিন হাজার হেক্টরের বিশাল জলাভূমি, যার চরকুশলা গ্রামের দিকের চল্লিশ-পঞ্চাশ হেক্টর অংশজুড়ে প্রতি বর্ষা-শরতে ফুটে ওঠে দেশের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক পদ্ম-শাপলার আসরগুলোর একটি। শহর-ভ্রমণের সঙ্গে এই অর্ধেক দিনের প্রকৃতি-ভ্রমণ জুড়তে চাইলে প্রথমে দেখে নিন আমাদের খুলনা শহর গাইড — এই পোস্টে শুধু বিলের গল্প।
কখন যাবেন: মৌসুম আর ভোরের ঘণ্টা
ভূতিয়ার বিলের পরিকল্পনায় দুটি সময় সবচেয়ে জরুরি — বছরের মৌসুম আর দিনের ঘণ্টা। পদ্ম-শাপলা ফোটার প্রধান মৌসুম বর্ষার শেষ থেকে শরৎ, বিশেষ করে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে বিল পূর্ণ রূপ পায়; পানি ও ফুলের অবস্থা অনুযায়ী কখনো কখনো মৌসুম কিছুটা আগে-পিছে হয়। আর দিনের সেরা সময় একদম ভোর — সকাল ছয়টা থেকে সাড়ে ছয়টা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পদ্মের পাপড়ি বুজে আসে, তাই দেরি করে গেলে 'ফুলের বিল' দেখা হলেও পূর্ণ ফোটা পদ্মের সেই দৃশ্য পাওয়া যাবে না। সহজ কৌশল: আগের রাতে খুলনা শহরে থেকে ভোর পাঁচটার দিকে রওনা দিন, সূর্য ওঠার মুখে বিলে পৌঁছে যান।
ডিঙি নৌকায় ফুলের ভেতর দিয়ে
বিল দেখার একমাত্র উপায় ছোট ডিঙি নৌকা — তেরখাদা বাজারের দিক থেকে বা চরকুশলা গ্রামে নেমে স্থানীয় মাঝিদের নৌকা ভাড়া পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক পত্রিকা প্রতিবেদন অনুযায়ী ছোট নৌকার ভাড়া সাধারণত দুই শ থেকে পাঁচ শ টাকার মধ্যে থাকে (সময় ও দূরত্ব অনুযায়ী দরদাম বদলাতে পারে)। হোগলাবন আর কচুরিপানার ফাঁক দিয়ে নৌকা এগিয়ে যায় ফুলের ঘন অংশের দিকে — ভোরের আলোয় পদ্মপাতায় জমে থাকা পানির ফোঁটা, পাখির ওড়াউড়ি আর চারপাশের নীরবতা মিলিয়ে অভিজ্ঞতাটা ছবির চেয়েও সুন্দর। ফুল ফোটার মৌসুমে এই নৌকা ঘোরানোর কাজে স্থানীয় অনেক যুবকের মৌসুমি কর্মসংস্থান হয়, যা এই ভ্রমণের একটি সুন্দর পার্শ্বপ্রভাব। অনুরূপ আরেক ফুলের জলাভূমি দেখতে চাইলে সিলেটের ডিবির হাওরের শাপলা বিলের গাইডটিও পড়ুন — সেখানে লাল শাপলার রাজ্য।
বছরজুড়ে বিলের বদলে যাওয়া রূপ
ভূতিয়ার বিল প্রতিটি ঋতুতে আলাদা। বর্ষায় পানি থৈ থৈ — পুরো বিল তখন এক বিস্তীর্ণ জলরাশি, নৌকাই একমাত্র যান। শরতে পানির উপর ফুলের গালিচা, সেই সঙ্গে পরিযায়ী মৌসুমের শুরুতে পাখির আনাগোনা বাড়ে। শীতে পানি নেমে গেলে দৃশ্য পুরো বদলে যায়: জাল আর পোলো দিয়ে দেশি মাছ ধরার ব্যস্ততা, বিলের অগভীর অংশে কৃষকদের উপস্থিতি, ভেজা মাটির উপর পাখির খোঁজাখুঁজি। গ্রীষ্মে বিল সবচেয়ে শীর্ণ রূপ নেয়। অর্থাৎ ফুলের টানে যারা যাবেন তাদের ঠিকানা শরৎ, আর বিলের জীবনযাত্রা দেখতে চাইলে শীতও খারাপ সময় নয় — শুধু প্রত্যাশাটা মৌসুম অনুযায়ী সাজিয়ে নিতে হবে।
সৌন্দর্যের আড়ালে: জলাবদ্ধতার বাস্তবতা
সৎভাবে বলা দরকার — এই সৌন্দর্যের পেছনে বিলপাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ আছে। স্থানীয় সূত্রে পত্রিকার প্রতিবেদনে এসেছে, ২০০৩ সাল থেকে এই এলাকার প্রায় বিশ হাজার একর জমি স্থায়ী জলাবদ্ধতার কবলে; চাষাবাদ ব্যাহত হওয়ায় অনেক পরিবার জীবিকার জন্য এখন মাছ ধরা আর মৌসুমি পর্যটনের উপর নির্ভরশীল। বিলটি আবার কৈ, শিং, মাগুর, শোল, গজারসহ নানা দেশি মাছের প্রাকৃতিক আবাস — শীতে পানি কমলে জাল ফেলে মাছ ধরা হয়। অর্থাৎ দর্শনার্থী হিসেবে আমাদের দায়িত্ব দুটো: স্থানীয় মাঝি ও গাইড ব্যবহার করে অর্থটা এলাকাতেই রাখা, আর ফুল ছিঁড়ে এই সম্পদ নষ্ট না করা। কিছু দর্শনার্থীর অতিরিক্ত ফুল তোলার অভিযোগ স্থানীয়রাই তুলেছেন — একটি পদ্ম ছিঁড়লেই সেটি আর কারোর চোখে ফুটবে না। ছবি তুলুন যত খুশি, ফুল থাকুক জলেই।
কীভাবে যাবেন
খুলনা শহর থেকে রুটটি সহজ: শহরের জেলখানা ঘাট পার হয়ে বাস বা সিএনজিতে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে তেরখাদা বাজার; সেখান থেকে ইজিবাইকে চরকুশলা গ্রামের পদ্মবিল অংশ। পত্রিকার সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী শহর থেকে বিল পর্যন্ত পৌঁছাতে মোট সময় লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা। ভোরে পৌঁছানোর হিসাব মাথায় রেখে রওনার সময় ঠিক করুন — প্রয়োজনে তেরখাদা বা খুলনায় আগের রাতে থাকুন। বিলে কোনো সাজানো পর্যটন অবকাঠামো নেই; খাবার-পানি সঙ্গে রাখুন, আর ফেরার যান আগে থেকে ঠিক করে রাখলে সুবিধা হয়।
টিপস
ভোরের আলোই এখানকার আসল সম্পদ — ক্যামেরা বা ফোনের চার্জ পূর্ণ করে নিন। নৌকায় ওঠার আগে ভাড়া ও ঘোরার সময় পরিষ্কার করে নিন। বর্ষার পানিতে মোবাইল ফেলে দেওয়ার ঝুঁকি এড়াতে জলরোধী পাউচ নিতে পারেন। শিশুদের নৌকায় চড়ালে বাড়তি সতর্কতা রাখুন — ডিঙি নৌকা ছোট ও দোল খায়। ফুলের মৌসুম বাদে গেলে বিলটি ফাঁকা জলাভূমি হিসেবে দেখতে হবে — প্রত্যাশা সেই অনুযায়ী রাখুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ভূতিয়ার পদ্মবিল কোথায়?
খুলনা জেলার তেরখাদা উপজেলায় — বিলটি নড়াইলের কিছু অংশেও বিস্তৃত। খুলনা শহর থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টার পথ; চরকুশলা গ্রামের দিকের অংশে পদ্ম-শাপলা ফোটে।
পদ্ম দেখার সেরা সময় কখন?
বছরের হিসাবে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর, আর দিনের হিসাবে ভোর ছয়টা থেকে সাড়ে ছয়টা — বেলা বাড়লে পদ্মের পাপড়ি বুজে আসে।
নৌকা ভাড়া কত?
সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ছোট ডিঙি নৌকার ভাড়া সাধারণত ২০০ থেকে ৫০০ টাকা; সময় ও দূরত্ব অনুযায়ী দরদামে বদলাতে পারে।
ছয় মাসের অন্য সময়ে গেলে কি ফুল পাব?
পদ্মের প্রধান আসর বর্ষা-শরতের; শীতে পানি কমে গেলে বিলের চরিত্র বদলে যায় — তখন মাছ ধরার মৌসুম। ফুল দেখাই লক্ষ্য হলে মৌসুমেই যান।
ফুল তুলে আনা যাবে কি?
না — ফুল ছিঁড়লে বিলের সৌন্দর্য ও ফলন দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, স্থানীয়রাও এতে বিরক্ত। ছবি তুলে স্মৃতি নিন, ফুল জলে রেখে আসুন।
শেষকথা
ভূতিয়ার পদ্মবিল খুলনা ভ্রমণের সেই অধ্যায়, যা ভোরে ওঠার কষ্টটুকুকে মুহূর্তেই উসুল করে দেয়। শহরের ইতিহাস-জাদুঘরের পাশাপাশি একটি ভোর এই বিলে কাটালে বোঝা যায়, এই জেলার প্রকৃতি কতটা বৈচিত্র্যময় — আর সেই সৌন্দর্য টিকে থাকুক, সেটা আমাদের সবারই যত্নে।