বাংলাদেশের সাত বীরশ্রেষ্ঠের একজন নূর মোহাম্মদ শেখ — তাঁর স্মৃতি ছড়িয়ে আছে দুই জেলায়: জন্মভূমি নড়াইলের মহিষখোলা গ্রামে, আর সমাধি যশোরের শার্শার কাশিপুরে। এই গাইডে রইল প্রথমটির কথা — যে গ্রামটি আজ নিজেই বহন করে তাঁর নাম: নূর মোহাম্মদ নগর। এখানে সরকার গড়ে তুলেছে স্মৃতি জাদুঘর ও পাঠাগার; আর প্রাঙ্গণের গল্পে লুকিয়ে আছে ৪৫ বছর নিখোঁজ থাকা একটা সাইকেলের ফিরে আসার মর্মস্পর্শী কাহিনি।
বীরের জীবন ও শেষ যুদ্ধ
নূর মোহাম্মদ শেখের জন্ম ১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি, নড়াইল সদর উপজেলার চন্ডিবরপুর ইউনিয়নের মহিষখোলা গ্রামে (বাসস/প্রথম আলো)। ১৯৫৯ সালে তিনি তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসে (ইপিআর, বর্তমান বিজিবি) যোগ দেন এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন ৮ নম্বর সেক্টরে। ১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর যশোরের গোয়ালহাটিতে পাক বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে তিনি শহীদ হন; সহযোদ্ধারা পরে যুদ্ধক্ষেত্রের পাশের এক ঝোপ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে সীমান্তবর্তী শার্শার কাশিপুরে সমাহিত করেন (ভ্রমণগাইড/প্রথম আলো)। বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাব "বীরশ্রেষ্ঠ" উপাধিতে ভূষিত করে। তাঁর কাশিপুরের সমাধি নিয়ে আমাদের আলাদা গাইড আছে — বেনাপোল ভ্রমণের সঙ্গে সেটি দেখে নেওয়া যায়।
কমপ্লেক্সে যা আছে: জাদুঘর, পাঠাগার, স্কুল-কলেজ
সাত বীরশ্রেষ্ঠের জন্মস্থানে স্মৃতি জাদুঘর ও পাঠাগার নির্মাণের সরকারি প্রকল্পের অংশ হিসেবে ২০০৮ সালে নূর মোহাম্মদ নগরে গড়া হয় এই কমপ্লেক্স (নিউ এজ)। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় বরাদ্দ দিয়েছিল ৬২ লাখ ৯০ হাজার টাকা; জাদুঘর-পাঠাগার ভবনটির উদ্বোধন হয় ২০০৮ সালের ১৮ মার্চ — উদ্বোধন করেন ৮ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল (অব.) আবু ওসমান চৌধুরী। একই বছর গ্রামটির নাম বদলে রাখা হয় "নূর মোহাম্মদ নগর" (ঢাকা ট্রিবিউন)। আড়াই একর জমির এই চত্বরে জাদুঘর-পাঠাগারের পাশাপাশি তাঁর নামে রয়েছে একটি উচ্চ বিদ্যালয় ও একটি কলেজও (ডেইলি স্টার); পাঠাগারে রয়েছে কয়েক হাজার বই (নিউ এজ)। ভ্রমণগাইডের তথ্য অনুযায়ী, কমপ্লেক্সটি সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। জন্মবার্ষিকী (২৬ ফেব্রুয়ারি) ও মৃত্যুবার্ষিকীতে (৫ সেপ্টেম্বর) ট্রাস্ট ও জেলা প্রশাসনের আয়োজনে এখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ, গার্ড অব অনার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয় (বাসস/প্রথম আলো)।
৪৫ বছর পর ফিরে আসা সাইকেলটি
কমপ্লেক্সের সবচেয়ে মানবিক গল্পটি একটি সাইকেলের। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই সাইকেলে চড়েই নূর মোহাম্মদ শেষবার পরিবারের কাছে এসেছিলেন; বিদায়ের সময় সাইকেলটি রেখে যান আত্মীয় আলিয়ার রহমানের কাছে (ঢাকা ট্রিবিউন)। "শেষবার তাঁকে দেখেছিলাম, যখন তিনি সাইকেলটি আলিয়ারকে দিয়েছিলেন" — বলেছেন তাঁর ভগ্নিপতি মোশিয়ার রহমান (ঢাকা ট্রিবিউন)। সাইকেলটি আলিয়ারের ছেলে এমদাদুল হক দীর্ঘদিন ব্যবহার করেছেন; হারিয়ে গেছে ভাবা সাইকেলটি ৪৫ বছর পর ২০১৬ সালে খুঁজে পেয়ে পরিবার তা জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানবসম্পদ সংকটে জাদুঘরের কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় সাইকেলটি ও তাঁর ব্যবহৃত একটি তরবারি জাদুঘরের গুদামঘরেই পড়ে ছিল — স্থানীয়দের দাবি ছিল, এগুলো প্রদর্শনীতে তোলা হোক (ঢাকা ট্রিবিউন)।
সৎ প্রত্যাশা: শ্রদ্ধার স্থান, সীমিত সংগ্রহ
একটি কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার: এই কমপ্লেক্সে গেলে ঝকঝকে বড় জাদুঘরের অভিজ্ঞতা আশা করবেন না। নিউ এজের প্রতিবেদনে (ডিসেম্বর ২০১৬) এসেছে, কমপ্লেক্সে যাওয়ার প্রায় ৪ কিলোমিটার সড়কের বেহাল অবস্থা দর্শনার্থীদের পিছিয়ে দিত, আর প্রদর্শনীতে বীরশ্রেষ্ঠের ব্যবহৃত জিনিসপত্র ছিল মাত্র কয়েকটি — তাঁর ছেলে গোলাম মোস্তফার ভাষ্যে, প্রদর্শিত ছিল তাঁর ব্যবহৃত তিনটি বাটি। সাম্প্রতিক অবস্থা সরেজমিনে যাচাই করা যায়নি — সড়ক ও প্রদর্শনী এখন ভালো হয়ে থাকতে পারে। তবু জন্মভূমির মাটি, পাঠাগারের কয়েক হাজার বই, আর পাশের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি — এই ত্রয়ী মিলে স্থানটি তার মর্যাদা ধরে রেখেছে।
কীভাবে যাবেন
কমপ্লেক্সটি নড়াইল জেলা শহর থেকে প্রায় ৯–১২ কিলোমিটার দূরে, সদর উপজেলার চন্ডিবরপুর ইউনিয়নে — শহর থেকে চন্ডিবরপুর হয়ে অটোরিকশায় যাওয়া যায় (ভ্রমণগাইড/ডেইলি স্টার)। একদিনের ছক: সকালে সুলতান কমপ্লেক্স, দুপুরে নূর মোহাম্মদ নগর; আর বীরশ্রেষ্ঠের দুটি স্মৃতিস্থল এক সফরে দেখতে চাইলে শার্শা-বেনাপোলের দিকে বাড়িয়ে কাশিপুরের সমাধিতেও শ্রদ্ধা জানিয়ে আসুন। ২৬ ফেব্রুয়ারি বা ৫ সেপ্টেম্বরে গেলে আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধানুষ্ঠানের সাক্ষী হতে পারবেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
কমপ্লেক্সটি কোথায়?
নড়াইল সদর উপজেলার চন্ডিবরপুর ইউনিয়নের নূর মোহাম্মদ নগর (সাবেক মহিষখোলা) গ্রামে — জেলা শহর থেকে প্রায় ৯–১২ কিলোমিটার।
কে এই নূর মোহাম্মদ শেখ?
সাত বীরশ্রেষ্ঠের একজন — ১৯৩৬ সালে মহিষখোলায় জন্ম, ইপিআর সদস্য, ৮ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধা; ১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর গোয়ালহাটিতে শহীদ হন।
তাঁর কবর কোথায়?
যশোরের শার্শা উপজেলার কাশিপুরে — জন্মভূমিতে স্মৃতি কমপ্লেক্স, সমাধি কাশিপুরে; দুই জায়গাতেই বার্ষিক শ্রদ্ধানুষ্ঠান হয়।
কমপ্লেক্স কবে ও কীভাবে গড়া হয়?
সাত বীরশ্রেষ্ঠের জন্মস্থানে জাদুঘর-পাঠাগার প্রকল্পের অধীনে ২০০৮ সালে; উদ্বোধন ১৮ মার্চ ২০০৮, সেক্টর কমান্ডার আবু ওসমান চৌধুরীর হাতে (ডেইলি স্টার)।
জাদুঘরে কী দেখা যায়?
তাঁর ব্যবহৃত স্মৃতিচিহ্ন, আলোকচিত্র ও মুক্তিযুদ্ধের নথি; তবে প্রতিবেদন অনুযায়ী সংগ্রহ সীমিত ছিল — তাঁর সাইকেল ও তরবারি গুদামে পড়ে থাকার খবরও এসেছে (ঢাকা ট্রিবিউন)।
শেষকথা
বীরশ্রেষ্ঠের জন্মভূমিতে দাঁড়ানো মানে শুধু একটি জাদুঘর দেখা নয় — একটি গ্রামের নিজের নাম বদলে ফেলার মধ্য দিয়ে এই প্রজন্মের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সাক্ষী হওয়া। রাস্তা যেমনই হোক, এই শ্রদ্ধা জানিয়ে যাওয়াটাই আসল প্রাপ্তি।