• 30 Oct, 2026

নড়াইল শহরের মাছিমদিয়ায় চিত্রা নদীর তীরে এস এম সুলতানের (১৯২৪–১৯৯৪) স্মৃতি কমপ্লেক্স — প্রায় ২৬–২৭ একরে সমাধি, আদি বাসভবনের অংশ, দ্বিতল গ্যালারিতে ২৩টি চিত্রকর্ম, সংরক্ষিত শিশুস্বর্গ বজরা; সঙ্গে ভিক্টোরিয়া কলেজের পাশে জমিদারি আমলের বাঁধাঘাট।

বাংলাদেশের চিত্রকলায় যে নামটি মাটি আর মানুষের গন্ধ সবচেয়ে বেশি বহন করে, তিনি এস এম সুলতান (১৯২৪–১৯৯৪) — পেশিবহুল কৃষক, লাঙল-জোয়াল, ষাঁড় আর নদীর জগৎ নিয়ে যাঁর ক্যানভাস। নড়াইল শহরের মাছিমদিয়া এলাকায়, চিত্রা নদীর শান্ত পাড়ে, তাঁর নিজের বাড়ির আঙিনাতেই ঘুমিয়ে আছেন তিনি; আর চারপাশে গড়ে উঠেছে সুলতান কমপ্লেক্স — গ্যালারি, বাগান আর শিশুদের আঁকার স্কুল মিলিয়ে এক অদ্ভুত শান্ত স্মৃতিভূমি। নড়াইল এলে এটিই প্রথম ঠিকানা।

শিল্পীর জীবন: নড়াইলের মাটি থেকে বিশ্বমঞ্চ

সুলতানের জন্ম ১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট, নড়াইলের মাছিমদিয়াতেই (আজকের পত্রিকা)। চিরকুমার ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এই শিল্পীর আঁকায় বারবার ফিরে এসেছে বাংলার কৃষকজীবন — আর জীবনেও তিনি ছিলেন মাটির কাছাকাছি মানুষ: বাড়িতে ষাঁড়সহ নানা পশু-পাখি পুষতেন (রাইজিংবিডি)। স্বীকৃতির তালিকা দীর্ঘ: ১৯৮২ সালে একুশে পদক, ১৯৮৪ সালে সরকারের "রেসিডেন্ট আর্টিস্ট" স্বীকৃতি, ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা, ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদক; ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে "ম্যান অব দ্য ইয়ার", নিউ ইয়র্কের বায়োগ্রাফিক্যাল সেন্টার থেকে "ম্যান অব অ্যাচিভমেন্ট" ও এশিয়া উইক পত্রিকা থেকে "ম্যান অব এশিয়া" পুরস্কার (রাইজিংবিডি)। প্রসঙ্গত, তাঁর শিল্পহাতের ছোঁয়া এই অঞ্চলের আরেক ঐতিহ্যেও আছে — যশোরের বিখ্যাত মনিহার সিনেমা হলের অভ্যন্তরীণ সজ্জা তদারক করেছিলেন তিনিই। ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়; সমাহিত করা হয় নড়াইলে নিজ বাড়ির আঙিনায় (রাইজিংবিডি)। জীবনকালে নড়াইলের নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন "গোসাই"জ্ঞানে শ্রদ্ধেয়, শিষ্য-শিষ্যাও ছিলেন অসংখ্য (জীবনীসাহিত্য)। তাঁকে নিয়ে লেখা হয়েছে হাসনাত আব্দুল হাইয়ের গবেষণামূলক উপন্যাস "সুলতান" (১৯৯১), আর আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুনের "গুরু" (২০০৫) বইয়ে সংকলিত হয়েছে তাঁর ৬৮টি আলোকচিত্র (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

কমপ্লেক্সে যা দেখবেন: সমাধি, গ্যালারি, শিশুস্বর্গ

মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে সরকারি অর্থায়নে নিজ বাড়িতেই নির্মিত হয় এসএম সুলতান কমপ্লেক্স (রাইজিংবিডি; ভ্রমণগাইড অনুযায়ী কমপ্লেক্সের বর্তমান রূপ ২০০৩ সালের)। লাল সিরামিকে মোড়ানো কমপ্লেক্সটি চিত্রার তীরে প্রায় ২৬–২৭ একর জায়গাজুড়ে (বাংলা উইকিপিডিয়া/ভ্রমণগাইড), দুর্লভ প্রজাতির গাছপালায় ঢাকা — পাখির কলতানে মুখর থাকে দিনভর। কেন্দ্রে শিল্পীর সমাধি; সামনে তাঁর আদি বাসভবনের একটি ছোট অংশ সংরক্ষিত। পেছনে দ্বিতল আধুনিক আর্ট গ্যালারি — যেখানে সুলতানের চিত্রকর্ম ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র সংরক্ষিত আছে এবং গ্যালারিটি প্রতিদিন দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে (বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড)। প্রায় ৩৮ ফুট দীর্ঘ গ্যালারি-অংশে রয়েছে মোট ২৩টি ছবি — সভ্যতার ক্রমবিকাশ, ধান মাড়াই, জমি কর্ষণ, গাঁতা চাষসহ কৃষিজীবনের পরিচিত সব দৃশ্য (ভ্রমণগাইড)। কমপ্লেক্সের পাশে চিত্রার পাড়ে সংরক্ষিত আছে তাঁর তৈরি বিখ্যাত বজরা "শিশুস্বর্গ" — নদীতে ভাসমান এই নৌকাতেই শিশুদের ছবি আঁকা শেখাতেন তিনি; বর্তমানে কমপ্লেক্স সংলগ্ন শিশুস্বর্গে বাচ্চাদের আঁকা শেখানো হয় (ভ্রমণগাইড)। ২০২৬ সালের অক্টোবরেও তাঁর ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এখানে শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাসহ অনুষ্ঠান হয়েছে (আজকের পত্রিকা) — অর্থাৎ কমপ্লেক্সটি জীবন্ত, শুধু প্রদর্শনী নয়।

বাঁধাঘাট ও চিত্রার পাড়

কমপ্লেক্স দেখে চিত্রা নদীর পাড় ধরে হাঁটুন ভিক্টোরিয়া কলেজের দিকে — কলেজ সংলগ্ন পাড়ে রয়েছে বাঁধাঘাট: জমিদারি আমলে জমিদাররা নৌ-বিহারের জন্য এই ঘাটটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন; এখানে বসেই তাঁরা নদীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতেন (বিডিফিশ)। ঘাটটি আজ নড়াইলের মানুষের বিকেলের নদীতীর-আড্ডার প্রিয় জায়গা। নদীকেন্দ্রিক আরও রিসোর্ট ও শিশু পার্কও গড়ে উঠেছে চিত্রার পাড়ে — শহরের ব্যস্ততা ছাড়াই একটা পুরো বিকেল কাটানোর মতো পরিবেশ।

সুলতান মেলা ও যাওয়ার পরিকল্পনা

প্রতি বছর ১০ আগস্ট শিল্পীর জন্মদিন উপলক্ষে কমপ্লেক্সকে ঘিরে আয়োজিত হয় নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা ও সাত দিনব্যাপী সুলতান মেলা — সেই সময় দূরদূরান্ত থেকে হাজারো দর্শনার্থীর ভিড় জমে (ভ্রমণগাইড)। মেলা ছাড়া অন্য সময়ে গেলে পাবেন নির্জন, সবুজ, ধ্যানমগ্ন পরিবেশ — গ্যালারি ঘুরে, সমাধির পাশে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে, শিশুস্বর্গের বজরাটি দেখে ফিরুন। ঢাকা থেকে সড়কপথে নড়াইল (পদ্মা সেতু হয়ে বা আরিচা ফেরি পথে); কমপ্লেক্সটি শহরের মাছিমদিয়া এলাকায় — শহরে পৌঁছে রিকশাতেই যাওয়া যায়। আঞ্চলিক ছকে আগের দিন মাগুরার মোহাম্মদপুর ঘুরে নড়াইলে রাত্রিযাপন করলে দুই জেলার ঐতিহ্য এক সফরেই জুড়ে যায়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

সুলতান কমপ্লেক্স কোথায়?

নড়াইল শহরের মাছিমদিয়া এলাকায়, চিত্রা নদীর তীরে — শিল্পীর নিজ বাড়িতে গড়া স্মৃতি কমপ্লেক্স, যেখানে তাঁর সমাধিও রয়েছে।

গ্যালারিতে কী কী আছে?

দ্বিতল আধুনিক গ্যালারিতে সুলতানের চিত্রকর্ম ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র; ৩৮ ফুট দীর্ঘ অংশে ২৩টি চিত্রকর্ম — ধান মাড়াই, জমি কর্ষণ, গাঁতা চাষসহ কৃষিজীবনের দৃশ্য (ভ্রমণগাইড)। গ্যালারি প্রতিদিন খোলা থাকে (পর্যটন বোর্ড)।

শিশুস্বর্গ কী?

শিশুদের আঁকা শেখানোর জন্য সুলতানের তৈরি একটি বজরা নৌকা — চিত্রার পাড়ে কমপ্লেক্সের পাশে সংরক্ষিত; সংলগ্ন কেন্দ্রে এখনো শিশুদের আঁকা শেখানো হয়।

সুলতান মেলা কখন হয়?

প্রতি বছর ১০ আগস্ট (শিল্পীর জন্মদিন) থেকে সাত দিনব্যাপী — সঙ্গে চিত্রা নদীতে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা।

এস এম সুলতান কোন কোন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন?

একুশে পদক (১৯৮২), রেসিডেন্ট আর্টিস্ট স্বীকৃতি (১৯৮৪) ও স্বাধীনতা পদক (১৯৯৩)।

শেষকথা

সুলতান সারাজীবন এঁকেছেন এই মাটির মানুষকে, আর মাটিই তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছে সবচেয়ে বড় গ্যালারি — নদীর পাড়, গাছের ছায়া আর শিশুদের রং-তুলি। নড়াইলের এই কমপ্লেক্সে না গেলে বাংলাদেশের শিল্প-ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।