• 29 Oct, 2026

বোয়ালখালী ভ্রমণ গাইড: করলডেঙ্গা পাহাড়ের চণ্ডীতীর্থ মেধস মুনির আশ্রম

বোয়ালখালী ভ্রমণ গাইড: করলডেঙ্গা পাহাড়ের চণ্ডীতীর্থ মেধস মুনির আশ্রম

কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরের উপজেলা বোয়ালখালীর সম্পূর্ণ গাইড — ৫০০ ফুট করলডেঙ্গা পাহাড়চূড়ায় চণ্ডীতীর্থ মেধস মুনির আশ্রম, কিংবদন্তির প্রথম দুর্গাপূজার ভূমি, সীতার পুকুর, বু-আলী কালান্দরের মাজার ও জ্যৈষ্ঠপুরার পাহাড়ি বন।

কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে, চট্টগ্রাম শহরের একদম গা-ঘেঁষা উপজেলা বোয়ালখালী — অথচ এর পাহাড়ে লুকিয়ে আছে উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন তীর্থকথা। উপজেলার প্রায় ৩৭ বর্গকিলোমিটারজুড়ে করলডেঙ্গা ও জ্যৈষ্ঠপুরা পাহাড়ি বনাঞ্চল, আর সেই বনের চূড়ায় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু তীর্থ। শহর থেকে আধঘণ্টার পথ — সীতাকুণ্ড: একেক মৌসুমে একেক সাজ-এর চন্দ্রনাথের মতোই এটি আরেক পাহাড়ি তীর্থের গল্প।

চণ্ডীতীর্থ মেধস মুনির আশ্রম

বোয়ালখালী সদর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে, প্রায় ৫০০ ফুট উঁচু করলডেঙ্গা (সন্ন্যাসী) পাহাড়ের চূড়ায় শ্রী শ্রী চণ্ডীতীর্থ মেধস মুনির আশ্রম — প্রায় ৬৮ একর পাহাড়ি জমিজুড়ে বিস্তৃত। ধর্মীয় কিংবদন্তি অনুযায়ী, রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি এই পাহাড়েই মেধস মুনির কাছে শ্রীশ্রীচণ্ডী পাঠ শুনে প্রথম দুর্গাপূজা (বাসন্তী পূজা) করেছিলেন — সেই বিশ্বাসে জায়গাটিকে পৃথিবীর প্রথম দুর্গাপূজার স্থান হিসেবে গণ্য করা হয়। শাস্ত্রে উল্লেখ থাকলেও বিস্মৃতপ্রায় আশ্রমটি শতবর্ষের বেশি আগে বেদানন্দ স্বামী পুনরুদ্ধার করেন।

প্রধান ফটক থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার পথ পেরিয়ে ১৪০টির বেশি সিঁড়ি বেয়ে চূড়ায় উঠতে হয়। সেখানে ১০টি মন্দির — চণ্ডী মন্দির, শিব মন্দির, সীতা মন্দির, কামাখ্যা মন্দির, তারা কালী মন্দিরসহ; পাশে সীতার পুকুর, পেছনে ঝরনা আর সাধু-ভক্তদের থাকার বিশ্রামাগার। ১৯৭১ সালের এপ্রিলে পাকিস্তানি বাহিনী আশ্রমটি ধ্বংস করে দিয়েছিল — পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে পাথরের মূর্তি স্থাপনের মাধ্যমে এটি পুনর্নির্মিত হয়। প্রতিবছর মহালয়ার মাধ্যমে দেবীপক্ষের সূচনা এখানে বড় আয়োজনে পালিত হয় — তখন হাজারো ভক্তের সমাগম ঘটে; সারা বছরই দেশ-বিদেশের পুণ্যার্থীরা আসেন।

পাদদেশে আরও যা আছে

  • বু-আলী কালান্দর শাহের মাজার: পাহাড়ি বনাঞ্চলের পাদদেশে বিখ্যাত দরবেশ হযরত বু-আলী কালান্দর শাহের মাজার — হিন্দু তীর্থের পাশেই মুসলিম দরবেশের এই আবাস বোয়ালখালীর সম্প্রীতির ছবি।
  • আহলা দরবার শরীফ: বাগদাদ থেকে আগত সুলতান বোগদাদীর মাজার-কেন্দ্রিক এই দরবারও কাছেই।
  • জ্যৈষ্ঠপুরা পাহাড়ি বন: আশ্রম ঘিরে থাকা সবুজ বনাঞ্চলে হাঁটা ও পাহাড়চূড়া থেকে কর্ণফুলী উপত্যকার দৃশ্য উপভোগ করা যায়।
  • আরও একটি কৌতূহল: কধুরখীল উচ্চ বিদ্যালয়কে বলা হয় দেশের বৃহত্তম মাটির (মৃৎ) ভবনবিশিষ্ট বিদ্যালয় — পথে পড়লে দেখে নিতে পারেন।

কীভাবে যাবেন

  • রুট: চট্টগ্রাম শহর থেকে কালুরঘাট সেতু পেরিয়ে বোয়ালখালী সদর; সেখান থেকে সিএনজি/রিজার্ভ গাড়িতে মধ্যম করলডেঙ্গা গ্রামে আশ্রমের প্রধান ফটক (সদর থেকে প্রায় ৮ কিমি)। শহর থেকে পুরো পথ সাধারণত ১ ঘণ্টার মধ্যে।
  • টিপস: চূড়ায় ওঠা শারীরিকভাবে মাঝারি কষ্টের — জল সঙ্গে নিন, বর্ষায় সিঁড়ি পিচ্ছিল থাকে। মহালয়া ও দুর্গাপূজার সময় ভিড় অনেক বেশি; শান্ত পরিবেশ চাইলে অন্য সময় বেছে নিন। ধর্মীয় স্থানের শালীনতা বজায় রাখুন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

মেধস আশ্রম কেন বিখ্যাত?
ধর্মীয় বিশ্বাসে এখানেই প্রথম দুর্গাপূজা হয়েছিল; সেই সূত্রে এটি অন্যতম প্রধান চণ্ডীতীর্থ।

আশ্রমে উঠতে কতক্ষণ লাগে?
ফটক থেকে আধা কিলোমিটার পথ ও ১৪০+ সিঁড়ি — ধীরে উঠলে ৩০–৪০ মিনিট।

শহর থেকে দিনে গিয়ে ফেরা যাবে?
অবশ্যই — আধা দিনের ট্রিপেই আশ্রম ও পাদদেশের মাজার দেখা যায়।

শেষকথা

করলডেঙ্গার চূড়ায় দাঁড়ালে একসঙ্গে মেলে পুরাণ, ইতিহাস আর পাহাড়ের নীরবতা — বোয়ালখালী শহরের এত কাছে থেকেও যেন অন্য জগৎ। পাহাড়ি তীর্থের ধারাবাহিকতায় এরপর পড়ুন বান্দরবান - মেঘ পাহাড়ের দেশ। আপনার তীর্থভ্রমণ হোক শান্তিময়!