রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে পদ্মার পাড়ে এমন এক ক্যাম্পাস, যেখানে প্রতিদিন কুচকাওয়াজের তালে ইতিহাসের তিন যুগ একসঙ্গে বাস করে — সারদা, বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি। চারঘাট উপজেলার এই এলাকায় ওলন্দাজ নীলকুঠি, ব্রিটিশ প্রশিক্ষণ কলেজ আর আজকের জাতীয় একাডেমি স্তরে স্তরে জমেছে; সঙ্গে আছে পদ্মার বিস্তীর্ণ পাড়। রাজশাহী শহরের বড়কুঠির গল্পের ধারাবাহিকতাও এখানে।
১৭৮১: ওলন্দাজ কুঠি থেকে সারদা
ক্যাম্পাসের প্রাচীনতম ভবন বড়কুঠি ও ছোটকুঠি — নির্মাণ ১৭৮১ সালে, ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নীল কারখানার জন্য (আলকেট্রন)। ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দায়িত্ব নিলে এটি হয় রাজশাহী অঞ্চলের ১৫২টি নীলকুঠির সদর দফতর। নামকরণ নিয়ে দুটি প্রচলিত ধারণা: এক — "সদর" (প্রধান দফতর) শব্দ থেকে "সারদা"; দুই — বাঘ-চিতার আবাস বলে এলাকার নাম ছিল "শের-দাহ", সেখান থেকে সারদা (আলকেট্রন)। পরে সম্পত্তি যায় মেদিনীপুর জমিদারির হাতে, কাছারি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
১৯১২: মেজর চ্যামনি ও পুলিশ কলেজ
কিংবদন্তি বলে, প্রথম অধ্যক্ষ মেজর এইচ. চ্যামনি স্টিমারে কলকাতা যাওয়ার পথে চারঘাট স্টিমার স্টেশনে নেমে সারদার নদীপাড়ের সৌন্দর্য ও বিশাল ভবন দেখে মুগ্ধ হন (আলকেট্রন)। তাঁর প্রস্তাবেই ব্রিটিশ সরকার ১৯১০ সালে মাত্র ২৫,০০০ টাকায় ১৪২.৬৬ একর জমি স্থাপনাসহ কিনে নেয় (চারঘাট উপজেলা প্রশাসন/আলকেট্রন)। ১৯১২ সালের জুলাইয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় পুলিশ প্রশিক্ষণ কলেজ (বাংলাপিডিয়া) — বাংলা-আসামের সব প্রদেশ থেকে অফিসাররা এখানে প্রশিক্ষণ নিতেন। ১৯৬২ সালে সুবর্ণজয়ন্তীতে এটি "পুলিশ একাডেমি" ঘোষণা পায়; স্বাধীনতার পর এটি বাংলাদেশ পুলিশের সব পদমর্যাদার একমাত্র কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান (বাংলাপিডিয়া), ২০০৭ সাল থেকে নাম "বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি"। বড়কুঠি আজ অফিসার্স মেস, ছোটকুঠি অধ্যক্ষের বাসভবন (আলকেট্রন)। ভ্রমণসঙ্গী হিসেবে কাছের পুঠিয়া একই দিনে রাখা যায়।
দর্শনার্থীর বাস্তবতা ও পদ্মার পাড়
স্পষ্ট করে বলা দরকার: এটি একটি সক্রিয় প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান — ক্যাম্পাসের ভেতরে সাধারণ দর্শনার্থীর প্রবেশ অনুমতি-সাপেক্ষ ও সীমিত; বিশেষ অনুষ্ঠান বা পূর্বানুমতি ছাড়া ভেতরে ঘোরার আশা করা ঠিক নয়। দর্শনার্থীর আসল পাওনা বাইরের পরিবেশ: চারঘাটে পদ্মার পাড় — ঘাট, চরের দিগন্ত, নদীকেন্দ্রিক জনজীবন আর আমের বাগানঘেরা জনপদ। সন্ধ্যায় নদীপাড়ে বসে থাকাটাই এখানকার ভ্রমণ। ছবি তোলার ক্ষেত্রে একাডেমির ফটক ও নিরাপত্তা এলাকায় নিয়ম মেনে চলুন।
যাতায়াত
রাজশাহী শহর থেকে সড়কপথে চারঘাট; বানেশ্বর বাজার হয়ে সারদার ফিডার রোড (আলকেট্রন)। পুঠিয়া-চারঘাট একই করিডরে — দুটো মিলিয়ে পূর্ণ দিনের পরিকল্পনা করা যায়। এই করিডরজুড়ে আম-লিচুর বাগানের সারি — মৌসুমে (মে–জুলাই) পথের দুই পাশেই বাগান আর বাগান, পথভ্রমণটাই তখন আলাদা আকর্ষণ। নদীর ধারে গেলে ভাটা-জোয়ার ও চরের ভেজা মাটির কথা মাথায় রাখুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সারদা পুলিশ একাডেমি কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৯১২ সালের জুলাইয়ে (বাংলাপিডিয়া)।
জমিটি কত টাকায় কেনা হয়েছিল?
১৯১০ সালে মাত্র ২৫,০০০ টাকায় — ১৪২.৬৬ একর (চারঘাট উপজেলা প্রশাসন)।
বড়কুঠি-ছোটকুঠি কারা তৈরি করে?
ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ১৭৮১ সালে, নীল কারখানার জন্য (আলকেট্রন)।
পর্যটকরা কি ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারে?
সাধারণত নয় — এটি সক্রিয় প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান; প্রবেশ অনুমতি-সাপেক্ষ।
চারঘাটে আর কী দেখার আছে?
পদ্মার পাড়, ঘাট ও চরের প্রাকৃতিক দৃশ্য।
শেষকথা
সারদা দেখা মানে ফটকের বাইরে দাঁড়িয়ে অনুমান করা — ভেতরে শতবর্ষী প্রতিষ্ঠান, বাইরে পদ্মার চিরন্তন প্রবাহ। ইতিহাস-পিপাসুর জন্য এই সংমিশ্রণই যথেষ্ট কারণ চারঘাটে এক বিকেল কাটানোর।