• 30 Oct, 2026

সুগন্ধা নদীর তীরে ঝালকাঠি শহর — লঞ্চঘাটের নদীবন্দর-জীবন, শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে দুইশো বছরের কীর্তিপাশা জমিদার বাড়ি ও তার করুণ কাহিনি, মিয়া বাড়ি মসজিদ আর শীতলপাটির ঐতিহ্যের গাইড।

দক্ষিণের নদীবিধৌত মানচিত্রে ঝালকাঠি ছোট একটি জেলা — মহকুমা হয় ১৯৭২ সালে, জেলা হিসেবে স্বীকৃতি পায় ১৯৮৪ সালে (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। জেলার নিজস্ব নীতিবাক্যই তার পরিচয় বলে দেয়: "পেয়ারা আর শীতলপাটি, এই নিয়ে ঝালকাঠি"। সুগন্ধা নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই জেলা সদর পর্যটকদের কাছে এখনো অনেকটাই অনাবিষ্কৃত — অথচ শহর থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরেই দাঁড়িয়ে আছে দুইশো বছরের পুরনো এক জমিদার বাড়ি, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজকীয় গাম্ভীর্য আর এক করুণ ট্র্যাজেডি।

সুগন্ধা নদী ও লঞ্চঘাটের শহর

ঝালকাঠি শহরের জীবন আবর্তিত হয় সুগন্ধা নদীকে কেন্দ্র করে — জেলার প্রধান নদীগুলোর মধ্যে সুগন্ধা, বিষখালী, ধানসিঁড়ি ও গাবখান উল্লেখযোগ্য (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। শহরের লঞ্চঘাট এই অঞ্চলের মানুষের ঢাকামুখী যাত্রার প্রধান দরজা; সন্ধ্যায় ঘাটে গেলে লঞ্চের আলো আর নদীর হাওয়ায় শহরের সবচেয়ে প্রাণবন্ত চেহারা দেখা যায়। তবে সুগন্ধার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক বেদনাদায়ক স্মৃতিও — ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ঝালকাঠির কাছেই সুগন্ধা নদীতে লঞ্চে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বহু মানুষ প্রাণ হারান (ইংরেজি উইকিপিডিয়া); ঘটনাটি দেশের নৌ-নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় মাইলফলক হয়ে আছে। শহরের ভেতরে স্থানীয়দের অবসরের জায়গা সিটি পার্ক, আর গাবখান সেতু থেকে বিষখালীর দুই পাড়ের সবুজ দৃশ্য দেখা যায় (ট্যুরবিডি/বেঙ্গলনেস্ট)। আর হাতে একটু সময় থাকলে শীতলপাটির কারিগরদের কাজ দেখা এই জেলার নিজস্ব অভিজ্ঞতা — পাটি বোনার ঐতিহ্য ঝালকাঠির ঘরে ঘরে।

কীর্তিপাশা জমিদার বাড়ি: দুই হিস্যার প্রাসাদ

শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে, কীর্তিপাশা বাজার ও ডাকঘর পেরিয়ে এই প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ (দ্য ডেইলি স্টার, জুন ২০২৫)। ইতিহাসের সারাংশটা এমন: অষ্টাদশ শতকে বিক্রমপুর থেকে আগত সেনগুপ্ত পরিবার এখানে জমিদারি পত্তন করে — ডেইলি স্টারের বর্ণনায় কৃষ্ণকুমার সেন রায়েরকাঠির রাজার কাছ থেকে এই উর্বর এলাকায় ভূমি লাভ করেন। জমিদারি ভাগ হয় দুই ছেলের মধ্যে — দশ আনা "বড় হিস্যা" আর ছয় আনা "ছোট হিস্যা"; ছোট হিস্যার বাড়ি বহু আগেই নিশ্চিহ্ন, বড় হিস্যার প্রাসাদই আজকের ধ্বংসাবশেষ (ডেইলি স্টার/বাংলা উইকিপিডিয়া)। প্রাঙ্গণে আছে প্রাচীন দুর্গা মন্দির, নাটমন্দির, হলঘর ও ছোট-বড় মন্দির (বাংলা উইকিপিডিয়া)। বাড়িটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক করুণ কাহিনি — জমিদারপুত্রকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয় এবং তাঁর স্ত্রীও তাঁর সঙ্গে মৃত্যুবরণ করেন; তাঁদের একসঙ্গে সমাধিস্থ করা হয়, স্মৃতিতে নির্মিত হয় সতীদাহ মন্দির (বাংলা উইকিপিডিয়া/ডেইলি স্টার)। বর্তমানে বাড়ির একাংশে প্রসন্ন কুমার মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও নাটমঞ্চ-হলরুমে কমলিকন্দ নবীন চন্দ্র বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় চালু আছে; মূল প্রাসাদ অংশ জরাজীর্ণ ও অবহেলায় বিলীনের পথে (বাংলা উইকিপিডিয়া/ডেইলি স্টার)।

শহর ঘিরে আর যা আছে

শহরের কাছাকাছি আরেক নিদর্শন ভারুকাঠি গ্রামের মিয়া বাড়ি মসজিদ — অষ্টাদশ শতকে নির্মিত বলে জানা যায়, মুঘল-আদলের ইসলামি স্থাপত্যের জন্য পরিচিত (ট্যুরবিডি/বেঙ্গলনেস্ট)। জেলা পর্যায়ে আরও আছে রাজাপুরের সাতুরিয়া জমিদার বাড়ি এবং শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হকের নানাবাড়ি (সাতুরিয়া) (বেঙ্গলনেস্ট)। আর ঝালকাঠি সদরের কীর্তিপাশা ইউনিয়নের বিল-খাল অঞ্চলেই কিন্তু পেয়ারা চাষের প্রাচীন কেন্দ্র — ভিমরুলির ভাসমান হাটের পেয়ারার এক বড় অংশ আসে এই জেলার বাগান থেকেই, তাই বর্ষায় ঝালকাঠি সফর মানেই পেয়ারা-অভিযানের স্বাদও পাওয়া।

কীভাবে যাবেন ও টিপস

ঢাকা সদরঘাট থেকে লঞ্চে সরাসরি ঝালকাঠি — সুগন্ধা নদীপথে রাতযাত্রা এই পথের চিরাচরিত মাধ্যম; পদ্মা সেতু হয়ে সড়কপথে বরিশাল, সেখান থেকে বাস/অটোতে ঝালকাঠি শহর (বরিশাল থেকে দূরত্ব আনুমানিক ২০ কিলোমিটার)। কীর্তিপাশা যেতে শহর থেকে অটোরিকশাই যথেষ্ট (প্রায় ৫ কিলোমিটার)। টিপস: কীর্তিপাশা প্রাঙ্গণের অংশবিশেষ স্কুল হিসেবে ব্যবহৃত — স্কুল চলাকালে ভেতরে ঘোরাঘুরি সীমিত রাখুন, ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন; জরাজীর্ণ ভবনের ভেতরে ঢোকা ঝুঁকিপূর্ণ। সুগন্ধার ঘাটে সন্ধ্যাটা কাটানোর পরিকল্পনা রাখুন — ছোট শহরের নির্ঝঞ্ঝাট ছন্দটাই ঝালকাঠির আসল আকর্ষণ।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

ঝালকাঠি কিসের জন্য বিখ্যাত?
জেলার নীতিবাক্যেই বলা আছে — পেয়ারা আর শীতলপাটি; সঙ্গে সুগন্ধা নদী ও কীর্তিপাশা জমিদার বাড়ি (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)।

কীর্তিপাশা জমিদার বাড়ি শহর থেকে কত দূরে?
প্রায় ৫ কিলোমিটার — কীর্তিপাশা বাজার-ডাকঘর পেরিয়ে (দ্য ডেইলি স্টার, ২০২৫)।

কীর্তিপাশার "বড় হিস্যা-ছোট হিস্যা" কী?
অষ্টাদশ শতকে সেনগুপ্ত জমিদারি দুই ছেলের মধ্যে ভাগ হয় — দশ আনা বড় হিস্যার প্রাসাদই আজ টিকে আছে; ছয় আনা ছোট হিস্যা বহু আগেই বিলীন (ডেইলি স্টার/বাংলা উইকিপিডিয়া)।

ঢাকা থেকে ঝালকাঠি কীভাবে যাব?
সদরঘাট থেকে সরাসরি লঞ্চে, অথবা পদ্মা সেতু হয়ে বাসে বরিশাল নেমে সড়কপথে প্রায় ২০ কিলোমিটার।

শহরে আর কী দেখব?
সুগন্ধার লঞ্চঘাট, সিটি পার্ক, গাবখান সেতু; কাছেই ভারুকাঠির মিয়া বাড়ি মসজিদ; জেলায় সাতুরিয়া জমিদার বাড়ি ও ফজলুল হকের নানাবাড়ি (বেঙ্গলনেস্ট)।

শেষকথা

ঝালকাঠি পর্যটনের মানচিত্রে এখনো ছোট বিন্দু — কিন্তু সুগন্ধার সন্ধ্যা, কীর্তিপাশার ভাঙা প্রাসাদের নীরব গল্প আর পেয়ারা-শীতলপাটির গ্রামীণ ঐতিহ্য মিলিয়ে এই ছোট শহরটি শান্ত, ধীর ভ্রমণের জন্য আদর্শ। দক্ষিণের বড় গন্তব্যগুলোর ফাঁকে একদিনের জন্য হলেও ঝালকাঠিতে থামা সার্থক।