পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি (নেছারাবাদ) উপজেলার ভিমরুলি গ্রামে তিন দিক থেকে আসা খালের মোহনায় প্রতি বর্ষায় বসে এক অভিনব হাট — শত শত ডিঙি নৌকা ভর্তি পেয়ারা, আমড়া আর লেবু নিয়ে চাষিরা হাজির হন, আর বড় ইঞ্জিন-বোটে আসেন পাইকার-আড়তদাররা। এটাই ভিমরুলি ভাসমান পেয়ারা বাজার — তিন জেলাজুড়ে বিস্তৃত পেয়ারা বাগান অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ভাসমান হাট, যাকে অনেকে থাইল্যান্ডের ফ্লোটিং মার্কেটের সঙ্গে তুলনা করেন (ট্রিপপেইন্টার)। বরিশাল বা ঢাকা থেকে একদিনের সফরেই এই জলজ হাটের অভিজ্ঞতা নেওয়া যায়।
দুইশ বছরের আবাদ, খালজুড়ে বাগান
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রায় ২০০ বছর আগে ভীমরুলি বিল ও আশপাশের এলাকায় পেয়ারা আবাদ শুরু হয়; স্বরূপকাঠির আটঘর-কুড়িয়ানা এলাকার কৃষকরাই প্রথম দিকে বাগান গড়েন (ট্রিপপেইন্টার)। আজ বরিশাল, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর — তিন জেলার সীমানাজুড়ে গড়ে উঠেছে বিস্তীর্ণ পেয়ারা বাগান অঞ্চল, যাকে এশিয়ার সবচেয়ে বড় পেয়ারা বাগান বলেও অভিহিত করা হয় (ভ্রমণট্রিপস)। এই বাগানের কৌশলটাই সবচেয়ে মজার: জমি জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায় বলে চাষিরা দুই পাশের মাটি তুলে মোটা আইল বানিয়ে সেখানে সারি করে গাছ লাগান — ফলে গাছের সারির দুই পাশে তৈরি হয় নালা বা পরিখা, যেখানে সহজেই ডিঙি নৌকা চলে (ট্রিপপেইন্টার)। চাষিরা সেই নৌকায় বাগানে ঢুকে পরিচর্যা করেন, পাকা পেয়ারা তোলেন। জানা যায়, এই অঞ্চলের প্রায় ৩১ হাজার একর জমিতে ২০ হাজারের বেশি পরিবার পেয়ারা চাষে যুক্ত (সুখবিলাশ)। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছবিটা বদলাচ্ছে — দ্রুত পেকে যাওয়া ও সংরক্ষণের অভাবে অনেক চাষি এখন আমড়া, লেবু, মাল্টা ও বরইয়ের দিকে ঝুঁকছেন; ঐতিহ্যবাহী একক পেয়ারা বাগান ধীরে ধীরে মিশ্র বাগানে রূপ নিচ্ছে (প্রথম আলো, ২০২৫)।
হাটের দিন: নৌকার ওপর বেচাকেনা
পেয়ারার মৌসুম শুরু হয় জুলাই মাসে, চলে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত — জুলাইয়ের শেষ থেকে আগস্টে হাট সবচেয়ে জমজমাট। সকাল নয়টা নাগাদ কাঁচা-পাকা পেয়ারাভর্তি ছোট ছোট ডিঙি নিয়ে চাষিরা হাজির হন খালের দুই পাশে; নৌকার ওপরেই চলে কেনাবেচা (প্রথম আলো, ২০২২)। পেয়ারা বিক্রি হয় মণ হিসাবে; আড়তদারদের বড় বোটে করে সেসব চলে যায় ঢাকাসহ দেশের নানা প্রান্তে, এমনকি বিদেশেও রপ্তানি হয় (ট্রিপপেইন্টার)। পেয়ারার পাশাপাশি হাটে মেলে আমড়া, কাগজি লেবু, আখ, জাম্বুরা ও কাঁচা কলা (প্রথম আলো)। ২০২২ সালের হিসাবে এক মৌসুমে এই ভাসমান হাটে ব্যবসা হয়েছিল প্রায় ৪৬ কোটি টাকার (প্রথম আলো)। বাজারের জন্য সেরা সময় দুপুর ১২টা থেকে বেলা ৩টা — এই সময়ে নৌকার সংখ্যা কয়েকশো ছাড়িয়ে যায় (ভ্রমণট্রিপস/সুখবিলাশ)। বাজারের উত্তর পাশের সেতুর ওপর থেকে পুরো ভাসমান হাটের দৃশ্য সবচেয়ে ভালো দেখা যায় (ভ্রমণট্রিপস)।
নৌকায় বাগান ভ্রমণ ও কীভাবে যাবেন
শুধু হাট নয়, চারপাশের খাল-পরিখায় ডিঙি নৌকায় ঘোরাটাই এই সফরের আসল আনন্দ — দুই পাশে সারিবদ্ধ পেয়ারা-আমড়ার বাগান, হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায় গাছের ফল, মাঝে মাঝে খালপাড়ের ঘরবাড়ি, স্কুল আর ছোট সেতু (ভ্রমণট্রিপস)। পথে আটঘর-কুড়িয়ানার পেয়ারা পার্কগুলোও ঘুরে দেখতে পারেন — ভ্রমণট্রিপসের তথ্যে পার্কে প্রবেশ ফি জনপ্রতি ৩০ টাকা, ভেতরে ওয়াচ টাওয়ার থেকে বাগান অঞ্চলের প্যানোরামা দেখা যায় (ফি বদলাতে পারে, যাওয়ার আগে যাচাই করুন)। রাঙামাটির কাপ্তাই লেকে নৌভ্রমণের মতো প্রশস্ত জলরাশি এখানে নেই — এখানকার মজা সরু খালের গলিপথে নৌকা ভেড়ানোর। যাতায়াত: রাতের লঞ্চে ঢাকা থেকে বরিশাল, সেখান থেকে সিএনজি/অটোতে বানারীপাড়া ঘাট, তারপর ট্রলার বা ভাড়া নৌকায় ভিমরুলি (আজটুজেডচাকরি); পদ্মা সেতু হয়ে সড়কপথে পিরোজপুর পর্যন্ত বাসে ৬–৮ ঘণ্টায় পৌঁছানো যায়, সেখান থেকে স্থানীয় যানে স্বরূপকাঠি-ভিমরুলি (একই সূত্র)। টিপস: মৌসুমের (জুলাই–সেপ্টেম্বর) বাইরে গেলে হাট প্রায় ফাঁকা থাকে — তারিখ দেখে যান; দুপুরের আগেই পৌঁছানোর ছক করুন; নৌকা ভাড়া আগেই দরদাম করে ঠিক করুন; বর্ষার সফর বলে রেইনকোট ও ফোনের জন্য পানিরোধী পাউচ সঙ্গে রাখুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ভিমরুলি ভাসমান বাজার কোথায়?
পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি (নেছারাবাদ) উপজেলার ভিমরুলি গ্রামে, তিন খালের মোহনায় — বরিশাল, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরের পেয়ারা বাগান অঞ্চলের কেন্দ্রে (ভ্রমণট্রিপস)।
বাজার কখন বসে, কখন যাব?
পেয়ারা মৌসুমে — জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর, শিখর জুলাইয়ের শেষ-আগস্ট। দিনের মধ্যে সবচেয়ে জমজমাট দুপুর ১২টা থেকে বেলা ৩টা (ভ্রমণট্রিপস)।
হাটে কী কী বিক্রি হয়?
মূলত পেয়ারা (মণ হিসাবে), সঙ্গে আমড়া, কাগজি লেবু, আখ, জাম্বুরা ও কাঁচা কলা (প্রথম আলো)। খুচরা দামে পেয়ারা কিনতেও পারেন।
ঢাকা থেকে কীভাবে যাব?
রাতের লঞ্চে বরিশাল, তারপর বানারীপাড়া ঘাট থেকে ট্রলার/নৌকায়; অথবা পদ্মা সেতু হয়ে বাসে পিরোজপুর (৬–৮ ঘণ্টা), সেখান থেকে স্বরূপকাঠি (আজটুজেডচাকরি)।
শুধু বাজার, নাকি বাগানও ঘোরা যায়?
দুটোই — হাট দেখার পাশাপাশি ডিঙি নৌকা ভাড়া করে খাল-পরিখা বেয়ে পেয়ারা বাগানের ভেতর ঘোরা যায়; পথে পেয়ারা পার্কেও ঢোকা যায় (ভ্রমণট্রিপস)।
শেষকথা
ভিমরুলির হাট শুধু বেচাকেনার জায়গা নয় — এটা একটা জলজ জীবনযাত্রার জীবন্ত প্রদর্শনী, যেখানে বাগান, খাল আর নৌকা মিলেমিশে গেছে দুইশ বছর ধরে। বর্ষার দুপুরে নৌকার ভিড়, সদ্য পাড়া পেয়ারার গন্ধ আর খালপাড়ের সবুজ মিলিয়ে দক্ষিণের এই ভাসমান হাট দেশের অন্যতম অনন্য ভ্রমণ অভিজ্ঞতা।