• 01 Nov, 2026

দেওয়ানগঞ্জ ও বাহাদুরাবাদ ঘাট ভ্রমণ গাইড — ১৯১২ সালের রেলস্টেশন, ১৯৩৮ সালে শুরু হওয়া তিস্তামুখ–বাহাদুরাবাদ রেল ফেরির স্বর্ণযুগ, ১৯৭১-এর তিন দিনের যুদ্ধ, যমুনা সেতুর পর ঘাটের পতন এবং জিলবাংলা চিনিকল ও ভাঙনকবলিত চরের বর্তমান চিত্র।

জামালপুর শহর থেকে রেলপথ ধরে উত্তরে গেলেই দেওয়ানগঞ্জ — আর তার গায়েই যমুনার তীরে বাহাদুরাবাদ ঘাট, একদা উত্তরবঙ্গের সঙ্গে সারা দেশের রেল-যোগাযোগের প্রাণকেন্দ্র। আজ ঘাটটি নীরব, স্টেশনটি পরিত্যক্ত; কিন্তু এর গল্প বাংলাদেশের পরিবহন-ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়গুলোর একটি। দেওয়ানগঞ্জের আদি নাম ছিল 'পদ্দাত নগর'; মুঘল আমলের দুই সাধক দেওয়ান শাহ কামাল ও দেওয়ান শাহ জামালের নামেই বর্তমান নাম (বাংলাপিডিয়া-ভিত্তিক বিবরণ)।

রেল ফেরির স্বর্ণযুগ: ট্রেনই উঠত জাহাজে

পাট রপ্তানির তাগিদে ১৮৮৫ সালে ময়মনসিংহ–নারায়ণগঞ্জ রেলপথ চালু হয়; পথ ধাপে ধাপে বাড়তে বাড়তে ১৯১২ সালের ১ জুলাই পৌঁছায় বাহাদুরাবাদ ঘাটে (উইকিপিডিয়া)। ঘাটের আসল জৌলুস শুরু ১৯৩৮ সালে, যখন ব্রিটিশ সরকার চালু করে তিস্তামুখ–বাহাদুরাবাদ রেল ফেরি: যমুনার ওপারে গাইবান্ধার তিস্তামুখ ঘাট থেকে বিশাল ফেরিতে আস্ত ট্রেনের ওয়াগন উঠিয়ে আনা হতো এপারে — একেকটি ফেরিতে তিনটি ট্রেন-ওয়াগন স্বচ্ছন্দে ঢুকে যেত (দ্য ডেইলি স্টার; টিবিএস)। এই রুটেই প্রথম সরাসরি রেল-সংযোগ পায় ঢাকা–দিনাজপুর পথ; উত্তরবঙ্গের আটটির বেশি জেলার মানুষ এই ফেরি পার হয়েই রাজধানীতে আসত। নাব্যতা-সংকটে ১৯৯০ সালে ওপারের প্রান্ত সরে যায় তিস্তামুখ থেকে বালাসী ঘাটে।

সেতু, নাব্যতা আর বন্ধ ঘাট

১৯৯৮ সালে যমুনার ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু চালু হতেই ফেরির প্রয়োজন ফুরোতে থাকে। ধাপে ধাপে সব থেমে যায়: যাত্রীবাহী ফেরি চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয় ২০০৫ সালে, বাহাদুরাবাদ ঘাট স্টেশনটি বন্ধ হয় ২৭ ডিসেম্বর ২০০৭, আর শেষ পণ্যবাহী ওয়াগন ফেরিও থামে ২০১৫ সালে (দ্য ডেইলি স্টার; উইকিপিডিয়া)। ব্রিটিশ আমলের ফেরিগুলো বালাসী ঘাটে বছরের পর বছর জং ধরে পড়ে থাকার পর ২০১৫ সালে ১৯টি নিলামে বিক্রি হয়ে যায় (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)। রুটটি পুনরুজ্জীবিত করতে প্রায় ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ঘাট ও আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণ করা হলেও নাব্যতা-সংকটে তার সুফল মেলেনি — এই হতাশা থেকেই ২০২৬ সালের ৩ অক্টোবর গাইবান্ধায় মানববন্ধন হয় বালাসী–বাহাদুরাবাদ রুটে দ্বিতীয় যমুনা সেতুর দাবিতে; দাবিকারীদের মতে সেতু হলে উত্তরবঙ্গের অন্তত আট জেলার ঢাকা-যাত্রার দূরত্ব কমবে প্রায় ১৪০–১৫০ কিলোমিটার (সংবাদ প্রতিবেদন)। ওপারের বালাসী ঘাটের গল্প এই সাইটেই আলাদা করে আছে।

মুক্তিযুদ্ধে বাহাদুরাবাদ

১৯৭১ সালে বাহাদুরাবাদ ঘাট ছিল উত্তরাঞ্চলীয় সেক্টরের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান; পাকিস্তানি বাহিনী এখানে ব্যালুচ রেজিমেন্টের এক প্লাটুন সৈন্য, রেঞ্জার্সের এক কোম্পানি ও রাজাকার মোতায়েন রেখেছিল। ১৯৭১ সালের ৩ জুলাই মেজর শাফায়েত জামিলের নেতৃত্বে প্রায় ৪০০ মুক্তিযোদ্ধা ঘাটে আক্রমণ করেন; তিন দিনের যুদ্ধে পাক বাহিনী পরাজিত হয় এবং জামালপুর–বাহাদুরাবাদ রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে (বাংলাপিডিয়া-ভিত্তিক বিবরণ)।

জিলবাংলা চিনিকল আর ভাঙনের চর

দেওয়ানগঞ্জ স্টেশনের কাছেই মিল বাজারে জিলবাংলা চিনিকল — অঞ্চলের আরেক শিল্প-পরিচয়। এর হালনাগাদ চিত্রটাও টানাপোড়েনের: ২০২৫–২৬ মাড়াই মৌসুমে প্রায় ৮৫ হাজার টন আখ মাড়াই করে ৫,৩৬৮ টন চিনি উৎপাদন হলেও সরকারি নির্ধারিত দাম (কেজি ১২৫ টাকা) বাজারের পরিশোধিত চিনির (১০৫–১১০ টাকা) চেয়ে বেশি হওয়ায় ৩,৬১৮ টন চিনি (মূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা) গুদামে অবিক্রিত পড়ে আছে; ২০২৬–২৭ মৌসুমের উদ্বোধন নির্ধারিত ২৭ নভেম্বর ২০২৬ (সংবাদ প্রতিবেদন, অক্টোবর ২০২৬)। আর উপজেলার চরাঞ্চলের চিত্র সবচেয়ে করুণ: সত্তরের দশক থেকে যমুনা-জিঞ্জিরাম-ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে ডাংধরা ও চর আমখাওয়ার বহু গ্রাম নদীগর্ভে বিলীন, শত শত পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব — স্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা এখনো অধরা (সাম্প্রতিক প্রতিবেদন)। ভ্রমণে গেলে এই বাস্তবতাটা মাথায় রাখা জরুরি।

ভ্রমণ তথ্য

যাওয়া: ঢাকা থেকে ট্রেনে (তিস্তা এক্সপ্রেসসহ একাধিক ট্রেন) দেওয়ানগঞ্জ বাজার স্টেশন পর্যন্ত চলাচল করে — বাহাদুরাবাদ ঘাট স্টেশনটি বন্ধ, তাই ট্রেন সেখানেই নামাবে; স্টেশন থেকে রিকশা/অটোতে ঘাট। জামালপুর শহর থেকেও সড়কপথে যাওয়া যায়। কী দেখবেন: পরিত্যক্ত ঘাট ও স্টেশন চত্বর, যমুনার বিশাল চর ও নদী, জিঞ্জিরামের মোহনা (বাছেতপুরে পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে মিলন), মিল বাজার। সতর্কতা: ঘাট এলাকার পুরোনো কাঠামো জরাজীর্ণ হতে পারে — ঝুঁকি নিয়ে উঠবেন না; ভাঙনকবলিত এলাকায় স্থানীয়দের পরামর্শ ছাড়া চরে নামবেন না। কখন: শীতকাল সেরা — চর তখন স্থিত, নদী শান্ত।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

বাহাদুরাবাদ ঘাট কোথায়?
জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায়, যমুনার পূর্ব তীরে (উইকিপিডিয়া)।

রেল ফেরি কবে থেকে কবে চলেছে?
১৯৩৮ সালে তিস্তামুখ–বাহাদুরাবাদ রুটে শুরু; ১৯৯০ সালে প্রান্ত বদলে বালাসী; যাত্রী ফেরি ২০০৫ ও ওয়াগন ফেরি ২০১৫ সালে সম্পূর্ণ বন্ধ (দ্য ডেইলি স্টার)।

বাহাদুরাবাদ স্টেশন কি এখন চালু?
না — স্টেশনটি বন্ধ হয়েছে ২৭ ডিসেম্বর ২০০৭ (উইকিপিডিয়া); ট্রেন চলে দেওয়ানগঞ্জ বাজার পর্যন্ত।

১৯৭১-এ এখানে কী ঘটেছিল?
৩ জুলাই ১৯৭১ মেজর শাফায়েত জামিলের নেতৃত্বে ~৪০০ মুক্তিযোদ্ধার তিন দিনের যুদ্ধে পাক বাহিনী পরাজিত হয়।

দ্বিতীয় যমুনা সেতুর দাবি কী নিয়ে?
বালাসী–বাহাদুরাবাদ রুটে সেতুর দাবিতে ৩ অক্টোবর ২০২৬ মানববন্ধন হয়েছে; সমর্থকদের দাবি, দূরত্ব কমবে ১৪০–১৫০ কিমি (প্রতিবেদন)।

জিলবাংলা চিনিকলের বর্তমান অবস্থা কী?
চালু আছে, তবে দাম-বৈষম্যে ৩,৬১৮ টন চিনি অবিক্রিত (অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদন)।

শেষকথা

বাহাদুরাবাদে আজ দেখার মতো 'দৃশ্য' কম, কিন্তু শোনার মতো গল্প পাহাড়সম — যেখানে একদিন ট্রেন উঠত জাহাজে, সেখানে এখন নদীর হাওয়া আর জং-ধরা স্মৃতি। বাংলাদেশের যোগাযোগ-বিপ্লব কীভাবে একেকটি জনপদকে তুলে আবার নামিয়ে দেয়, তার সবচেয়ে জীবন্ত পাঠশালা এই ঘাট।