• 30 Oct, 2026

বরিশাল শহর থেকে ১২ কিলোমিটার উত্তরে বাবুগঞ্জের মাধবপাশায় ১৭৮০ সালে চন্দ্রদ্বীপের রাজা শিব নারায়ণের খনন করা দুর্গাসাগর দীঘি — ২৭ একর জলাভূমি, মাঝখানে দ্বীপ, শীতে অতিথি পাখির অভয়ারণ্য আর রানী দুর্গাবতীর হাঁটার কিংবদন্তি।

বরিশালের মানুষ যাকে ভালোবেসে "সাগর" বলে — অথচ এটি একটি দীঘি: দুর্গাসাগর। আড়াইশ বছর আগে চন্দ্রদ্বীপ পরগনার রাজা খনন করিয়েছিলেন প্রজাদের পানির কষ্ট দূর করতে, ভালোবাসার মানুষের নামে রেখেছিলেন নাম। আজ ২৭ একর টলটলে জল, মাঝখানে সবুজ দ্বীপ আর শীতকালে হাজার হাজার অতিথি পাখি মিলে জায়গাটি বরিশালের সবচেয়ে প্রিয় এক বেড়ানোর ঠিকানা।

অবস্থান ও প্রথম দর্শন

দুর্গাসাগর দীঘি বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশায়, জেলা শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার উত্তরে স্বরূপকাঠি–বরিশাল সড়কের পাশে (বাংলা উইকিপিডিয়া)। স্থানীয়দের কাছে এটি মাধবপাশা দীঘি নামেও পরিচিত। সরকারি হিসাবে শুধু জলাভূমির আয়তন ২৭ একর; পাড় ও জমিসহ মোট আয়তন ৪৫.৪২ একর (বাংলা উইকিপিডিয়া)। পাড়টি উত্তর-দক্ষিণে ১,৪৯০ ফুট লম্বা ও পূর্ব-পশ্চিমে ১,৩৬০ ফুট প্রশস্ত; চারদিকে প্রায় ১.৬ কিলোমিটার হাঁটার পথ (বাংলাদেশ পোস্ট)। সম্পূর্ণ দীঘিটি উঁচু সীমানা প্রাচীরে ঘেরা, প্রবেশের জন্য দুটি গেট। ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়বে বিস্তীর্ণ জলরাশি — বাতাস একটু জোরে বইলেই ছোট ছোট ঢেউ ওঠে, যেন সত্যিই সাগর (আদার ব্যাপারী)।

ইতিহাস: রানীর হাঁটার পরিমাণ জুড়ে খনন

জনশ্রুতি ও ইতিহাস মিলে দুর্গাসাগরের গল্পটি রোমান্টিক: ১৭৮০ সালে (বাংলা ১১৮৭) চন্দ্রদ্বীপের পঞ্চদশ রাজা শিব নারায়ণ এলাকাবাসীর পানির সংকট নিরসনে এই বিশাল দীঘি খনন করেন এবং প্রিয়তমা স্ত্রী দুর্গামতির (রানী দুর্গাবতী) নামানুসারে এর নাম রাখেন দুর্গাসাগর (বাংলা উইকিপিডিয়া/বাংলাদেশ পোস্ট)। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, রানী এক রাতে প্রায় ৬১ কানি জমি হেঁটেছিলেন — যতদূর তিনি হাঁটতে পেরেছেন, ততটুকু জায়গা জুড়েই খনন করা হয় দীঘিটি (বাংলাদেশ টাইমস/বাংলাদেশ পোস্ট); খননে ব্যয় হয়েছিল তৎকালীন তিন লাখ টাকা বলে বাংলাদেশ পোস্টের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। সময়ের ভরাটে দীঘিটি ক্ষয়ে গেলে ব্রিটিশ আমলে জেলা বোর্ড সংস্কার করে; স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে সরকারি উদ্যোগে এটি পুনঃখনন করা হয় এবং শেষ বড় সংস্কার হয় ১৯৯৭–৯৯ সালে (বাংলাদেশ পোস্ট)। বর্তমানে "দুর্গাসাগর দিঘীর উন্নয়ন ও পাখির অভয়ারণ্য" প্রকল্পের অধীনে বরিশাল জেলা প্রশাসন দীঘিটির তত্ত্বাবধান করছে (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

যা দেখবেন: দ্বীপ, ঘাট, অতিথি পাখি ও পুণ্যস্নান

দীঘির ঠিক মাঝখানে গাছপালায় ছাওয়া ছোট্ট একটি দ্বীপ (টিলা) — আয়তন প্রায় ৬০ শতাংশ (বাংলাদেশ টাইমস/আদার ব্যাপারী); দূর থেকে এই সবুজ দ্বীপটাই দুর্গাসাগরের সবচেয়ে চেনা ছবি। তিন দিকে রয়েছে বাঁধানো ঘাটলা, উত্তর পাশে বড় একটি বাঁধানো ঘাট (ভ্রমণগাইড); চারদিকের পাড়ে নারিকেল, সুপারি, শিশু ও মেহগনি গাছের সবুজ বেষ্টনী আর বসার বেঞ্চ। শীতকালে দীঘিতে নেমে আসে অতিথি পাখির ঝাঁক — বালিহাঁস, সরাইলসহ প্রায় ছয় প্রজাতির হাজার হাজার পাখির কলরবে মুখর থাকে চারপাশ (ভ্রমণগাইড); পাখিপ্রেমীদের জন্য এ সময়টাই সেরা — জলাভূমি-পাখি দেখার আরও বড় ঠিকানা হিসেবে উত্তরে রয়েছে টাঙ্গুয়ার হাওর। নির্দিষ্ট টিকিট কেটে বড়শি দিয়ে মাছ ধরার সুযোগও আছে এখানে (বাংলাদেশ টাইমস)। প্রতি বছর চৈত্র মাসের অষ্টমী তিথিতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এখানে পুণ্যস্নানের উদ্দেশ্যে সমবেত হন (বাংলা উইকিপিডিয়া) — সেই দিনে দীঘিপাড়ে উৎসবের আমেজ থাকে।

কীভাবে যাবেন ও সফর-ছক

বরিশাল শহর থেকে স্বরূপকাঠি সড়কে বাস, অটোরিকশা বা সিএনজিতে মাধবপাশা — মাত্র ১২ কিলোমিটারের পথ। সকালের নরম আলোয় কিংবা শীতের সকালে পাখি দেখতে গেলেই ভ্রমণ সার্থক; দীঘির চারদিকের পথ হেঁটে এক চক্কর দিতে সময় লাগবে আধা ঘণ্টার মতো। একদিনের ছক: সকালে দুর্গাসাগর, দুপুরে ফিরে শহরের বেলস পার্ক-বিবির পুকুর, বিকেলে কীর্তনখোলায় নৌবিহার। খেয়াল রাখুন — দীঘিটি প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষিত এলাকা, পানিতে নামা বা পাড়ের গাছপালার ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকুন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

দুর্গাসাগর দীঘি কোথায়?

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশায়, শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার উত্তরে স্বরূপকাঠি–বরিশাল সড়কের পাশে।

দীঘিটি কে, কবে খনন করেন?

১৭৮০ সালে চন্দ্রদ্বীপের পঞ্চদশ রাজা শিব নারায়ণ, প্রজাদের পানির সংকট দূর করতে; নাম রাখেন স্ত্রী দুর্গামতির নামে (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

দীঘির আয়তন কত?

জলাভূমি ২৭ একর, পাড়সহ মোট ৪৫.৪২ একর; মাঝখানে প্রায় ৬০ শতাংশের একটি দ্বীপ রয়েছে।

কখন গেলে অতিথি পাখি দেখা যাবে?

শীতকালে — বালিহাঁস, সরাইলসহ প্রায় ছয় প্রজাতির হাজার হাজার পাখি আসে (ভ্রমণগাইড)।

দীঘিতে মাছ ধরা বা স্নান করা যায় কি?

টিকিট কেটে বড়শিতে মাছ ধরার সুযোগ আছে (বাংলাদেশ টাইমস); চৈত্রের অষ্টমী তিথিতে এখানে ধর্মীয় পুণ্যস্নান অনুষ্ঠিত হয়।

শেষকথা

একজন রাজার প্রজাহিতৈষণা আর ভালোবাসা মিলে যেখানে ২৭ একর জল হয়ে আছে, সেখানে দাঁড়ালে বোঝা যায় কেন বরিশালের মানুষ একে দীঘি না বলে সাগরই বলে। শহর থেকে মাত্র আধা ঘণ্টার পথ — বরিশাল এলে দুর্গাসাগর বাদ দেওয়ার কোনো কারণ নেই।