• 30 Oct, 2026

নারায়ণগঞ্জের হাজীগঞ্জ দুর্গ — ত্রিভুজ জলদুর্গের একটি, মীর জুমলা না ইসলাম খাঁ বিতর্ক, ঈশা খাঁর খিজিরপুর নগরীর যোগ, প্রাচীর-বুরুজ-ওয়াচ টাওয়ার ও শীতলক্ষ্যা নৌভ্রমণসহ পূর্ণ গাইড।

নারায়ণগঞ্জ শহরের কোলাহলের ভেতরে, শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীরে উঁচু প্রাচীরে ঘেরা সবুজ মাঠটি দেখে প্রথমে বোঝাই যায় না — এটিই চারশ বছরের পুরনো হাজীগঞ্জ দুর্গ, একদা ঢাকার জলপথ-প্রতিরক্ষার অন্যতম প্রহরী। লোকমুখে এটি আবার "ঈশা খাঁর কেল্লা" নামেও পরিচিত — যদিও ইতিহাসের হিসাবটা তার চেয়ে জটিল। একই জেলা ভ্রমণে পানাম নগরের সঙ্গে এটি মিলিয়ে দেখলে নারায়ণগঞ্জের দুই যুগের ইতিহাস একদিনেই পড়া যায়।

ত্রিভুজ জলদুর্গের একটি বাহু

মোঘল আমলে ঢাকায় রাজধানী স্থাপনের পর রাজধানীকে নদীপথে আসা মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে গড়ে তোলা হয় তিনটি জলদুর্গের ত্রিভুজ প্রতিরক্ষা — শীতলক্ষ্যার পশ্চিম তীরে হাজীগঞ্জ, পূর্ব তীরে বন্দরের কাছে সোনাকান্দা, আর মুন্সীগঞ্জে ইদ্রাকপুর (বাংলা উইকিপিডিয়া/আদার ব্যাপারী)। প্রাচীনকালে এই জায়গাতেই বুড়িগঙ্গা এসে শীতলক্ষ্যার সঙ্গে মিলিত হতো — অর্থাৎ দুর্গটি বসানো হয়েছিল কৌশলগত মোহনায় (বাংলা উইকিপিডিয়া)। আজকের ঢাকার লালবাগ কেল্লা স্থল-রাজধানীর প্রতীক হলে, হাজীগঞ্জ তার জল-প্রহরী সংস্করণ।

কে বানালেন — ঈশা খাঁ, ইসলাম খাঁ, নাকি মীর জুমলা?

দুর্গটির নির্মাতা নিয়ে লিখিত প্রমাণ নেই, মতও একাধিক (বাংলা উইকিপিডিয়া)। একদিকে বাংলাপিডিয়ার "খিজিরপুর" নিবন্ধ অনুযায়ী, ঈসা খাঁ মাসনাদ-ই-আলা ১৫৮৪ সালের পরে এই অঞ্চলে খিজিরপুর নগর ও একটি দুর্গ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন — কোনো কোনো ঐতিহাসিক হাজীগঞ্জ দুর্গকেই সেই খিজিরপুর কিল্লা বলে মনে করেন, সেখান থেকেই "ঈশা খাঁর কেল্লা" নামের চল। ১৬১০ সালে মুসা খান খিজিরপুর ছেড়ে পূর্ব তীরে প্রতিরোধ গড়লে সুবাহদার ইসলাম খান এলাকাটি দখল করে এখানে নৌবহরের ঘাঁটি বসান (বাংলাপিডিয়া)। অন্যদিকে মুন্সি রহমান আলীর বর্ণনায় দুর্গটির বর্তমান রূপের নির্মাণ মীর জুমলার আমলে (১৬৬০–১৬৬৩), যিনি ঢাকা থেকে খিজিরপুর পর্যন্ত সড়কও নির্মাণ করেছিলেন (বাংলা উইকিপিডিয়া/বাংলাপিডিয়া)। সাধারণভাবে দুর্গটির নির্মাণকাল ধরা হয় ১৬১০ থেকে ১৬৫০-এর দশকের মধ্যে — বিতর্কটাই এখানে ইতিহাসের অংশ।

আজ যা দেখবেন

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে থাকা দুর্গটি ১৯৫০ সালে তালিকাভুক্ত হয়ে ধাপে ধাপে সংস্কার পেয়েছে (ভ্রমণগাইড)। উঁচু সীমানা প্রাচীরের গায়ে বন্দুক-কামানের ছিদ্র, প্রাচীরের ওপর হাঁটার পথ (ওয়াকওয়ে), কোণে কোণে বুরুজ ও একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার টিকে আছে; প্রবেশপথে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয় (আদার ব্যাপারী/ভ্রমণগাইড)। তবে ভেতরে প্রাসাদ বা ভবনের কিছুই অবশিষ্ট নেই — বিশাল সবুজ মাঠে স্থানীয়দের ক্রিকেট খেলা চলে, যা দেখে মনে হয় দুর্গটি এখন শহরের ফুসফুস হয়ে বেঁচে আছে। পাশেই নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের অফিস; নিচে গুদারাঘাট থেকে নৌকা ভাড়া করে শীতলক্ষ্যায় ছোট ভ্রমণ করা যায়, নদীর ওপারে রয়েছে কদম রসূল মাজার (আদার ব্যাপারী)। টিপস: দুর্গে প্রবেশে আলাদা বড় টিকিটের ঝামেলা নেই; সন্ধ্যার পর জায়গাটি নির্জন হয়ে পড়ে বলে দিনের আলোতেই ঘোরা শেষ করুন।

যাতায়াত

ঢাকার গুলিস্তান থেকে নারায়ণগঞ্জগামী বাসে চাষাড়া নেমে অটো/রিকশায় হাজীগঞ্জ কেল্লা বা ৫ নম্বর ঘাট বললেই পৌঁছে যাবেন (আদার ব্যাপারী); ঢাকা থেকে দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার ( বাংলা উইকিপিডিয়া)। নারায়ণগঞ্জ শহর ঘোরা থাকলে বিবি মরিয়ম মসজিদসহ শহরের অন্য ঐতিহ্যও একই বেড়ায় যোগ করা যায়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

হাজীগঞ্জ দুর্গ কোথায় অবস্থিত?

নারায়ণগঞ্জ শহরের হাজীগঞ্জ (কিল্লাপুর) এলাকায়, শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীরে (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

ত্রিভুজ জলদুর্গ কোন তিনটি?

হাজীগঞ্জ, সোনাকান্দা (শীতলক্ষ্যার পূর্ব তীর) ও ইদ্রাকপুর (মুন্সীগঞ্জ) (আদার ব্যাপারী)।

দুর্গটি কে নির্মাণ করেন?

নিশ্চিত প্রমাণ নেই — মীর জুমলা (১৬৬০–৬৩) বা ইসলাম খাঁর আমলের (১৬১০-এর দশক) বলে মত আছে; ঈশা খাঁর খিজিরপুর দুর্গের সঙ্গেও একে যুক্ত করা হয় (বাংলা উইকিপিডিয়া/বাংলাপিডিয়া)।

এর আরেক নাম কী?

খিজিরপুর দুর্গ (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

ভেতরে কী দেখার আছে?

প্রাচীর, বুরুজ, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ও সবুজ মাঠ; কোনো প্রাসাদভবন টিকে নেই — পাশে শীতলক্ষ্যায় নৌভ্রমণ করা যায় (আদার ব্যাপারী)।

শেষকথা

হাজীগঞ্জ দুর্গ জাঁকজমকের দিক থেকে লালবাগের ধারে কাছেও নয় — কিন্তু ঢাকার অস্তিত্ব রক্ষায় নদীর পাহারাদার হিসেবে এর ভূমিকাই এর মহিমা। বিতর্কিত ইতিহাস, নদীর হাওয়া আর প্রাচীরের ওপর দিয়ে হাঁটা — ইতিহাসপ্রেমীর জন্য এটি ছোট্ট কিন্তু গভীর এক থামা।