• 30 Oct, 2026

পুরান ঢাকার লালবাগে মোগল আমলের অসমাপ্ত দুর্গ — ১৬৭৮ সালে আজম শাহের শুরু করা ফোর্ট আওরঙ্গবাদ, শায়েস্তা খাঁর কন্যা পরীবিবির মার্বেল সমাধি, তিন গম্বুজ মসজিদ ও কেল্লা জাদুঘরের ইতিহাস, টিকিট ও সময়সূচিসহ পূর্ণ গাইড।

পুরান ঢাকার লালবাগ এলাকায়, এক সময়ের বুড়িগঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে আছে বাংলার সবচেয়ে রহস্যময় স্থাপনাগুলোর একটি — লালবাগ কেল্লা। এটি দেশের একমাত্র বড় মোগল দুর্গ, যার নির্মাণকাজ কখনোই শেষ হয়নি: সাড়ে তিনশ বছর পেরিয়ে গেলেও দেয়াল-ফটকের এই কমপ্লেক্স আজও অর্ধসমাপ্ত দাঁড়িয়ে আছে, আর তার মাঝখানে শ্বেত মার্বেলের পরীবিবির সমাধি ঢাকার সবচেয়ে চেনা স্থাপত্য-ছবিগুলোর একটি। কাছের ইসলামপুরের আহসান মঞ্জিলের নবাবি জৌলুসের আগের যুগের ঢাকাকে বুঝতে হলে লালবাগই শুরুর জায়গা।

ফোর্ট আওরঙ্গবাদ: দুই সুবেদার, এক অসমাপ্ত দুর্গ

সম্রাট আওরঙ্গজেবের পরিকল্পনায়, তাঁর পুত্র যুবরাজ মুহাম্মদ আজম ১৬৭৮ সালে বুড়িগঙ্গার তীরে দুর্গের নির্মাণ শুরু করেন — নাম দেওয়া হয় দুর্গ আওরঙ্গবাদ বা ফোর্ট আওরঙ্গবাদ (ভ্রমণগাইড/গরলি)। আজম একটি মসজিদ ও দরবার হল গড়ে দিল্লি চলে গেলে ১৬৮০ সালে সুবেদার শায়েস্তা খাঁ কাজ আবার শুরু করেন। কিন্তু ১৬৮৪ সালে তাঁর কন্যা পরীবিবির (ইরান দুখত) মৃত্যুর পর শায়েস্তা খাঁ দুর্গটিকে অশুভ মনে করে নির্মাণ বন্ধ করে দেন — এটাই সবচেয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যা (ভ্রমণগাইড)। তবে ইতিহাসবিদদের সবার মত এক নয়: কেউ কেউ মনে করেন, দ্বিতীয় দফায় সুবেদার হয়ে এসে শায়েস্তা খাঁ বাস্তবে নির্মাণকাজ তেমন এগিয়ে নেননি, ফলে দুর্গটি অসমাপ্ত থেকে যায় অন্য কারণে (দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস)। ১৮৪৪ সালে এলাকাটির নাম আওরঙ্গবাদ থেকে বদলে লালবাগ হলে দুর্গের নামও হয়ে যায় লালবাগ কেল্লা (গরলি)।

ভেতরে যা দেখবেন

কেল্লায় প্রবেশ করলেই সাজানো বাগান আর ফোয়ারা। তিনটি প্রধান স্থাপনা এখানে কালের সাক্ষী: (১) পরীবিবির সমাধি — কমপ্লেক্সের কেন্দ্রে বর্গাকার এই সৌধের প্রতিটি বাহু ২০.২ মিটার; সাদা মার্বেলের কারুকাজ আর তামার পাতে মোড়া কৃত্রিম গম্বুজ এটিকে করে তুলেছে অসাধারণ (ভ্রমণগাইড)। মজার বিষয় — "লালবাগ কেল্লা" বলতে যে ছবিটি সবার চোখে ভাসে, তা আসলে এই সমাধিটিরই (গরলি)। (২) তিন গম্বুজ শাহী মসজিদ — ১৬৭৮–৭৯ সালে যুবরাজ আজমের নির্মিত (১৯.১৯ × ৯.৮৪ মিটার), মোগল মসজিদ স্থাপত্যের ধ্রুপদি উদাহরণ; এখানে এখনো নিয়মিত নামাজ হয় (গরলি)। (৩) দরবার হল ও হাম্মামখানা — শায়েস্তা খাঁর বাসভবন ও দরবার হল ভবনটি এখন লালবাগ কেল্লা জাদুঘর, যেখানে মোগল আমলের অস্ত্র, মুদ্রা, পাণ্ডুলিপি ও চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়। কেল্লার তিনটি ফটকের মধ্যে দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে একটি; বাগানে পুরনো কামানও চোখে পড়ে (ভ্রমণগাইড)। ঢাকার ঐতিহ্য দেখার বড় পরিসর চাইলে শাহবাগের জাতীয় জাদুঘর এই সফরের স্বাভাবিক জোড়া।

টিকিট ও সময়সূচি

প্রবেশ টিকিট: বাংলাদেশি দর্শনার্থী ৩০ টাকা, মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থী ১০ টাকা, সার্কভুক্ত দেশ ২০০ টাকা, অন্যান্য বিদেশি ৪০০ টাকা; ৫ বছরের নিচে শিশুদের টিকিট লাগে না (ভ্রমণগাইড)। myGov থেকে কিউআর-কোডযুক্ত অনলাইন টিকিটও কেনা যায় (ভ্রমণগাইড)। সময়সূচি ঋতুভেদে বদলায়: গ্রীষ্মে (এপ্রিল–সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা, শীতে (অক্টোবর–মার্চ) সকাল ৯টা–বিকেল ৫টা; প্রতিদিন দুপুর ১টা–১:৩০ বিরতি, শুক্রবার ১২:৩০–২:০০ বিরতি; রবিবার সাপ্তাহিক বন্ধ, সোমবার শুধু বেলা ২:৩০ থেকে খোলা; সরকারি ছুটির দিন বন্ধ (গরলি)। টিপস: সোমবার গেলে সময় মিলিয়ে যান; মসজিদটি সক্রিয় উপাসনালয় — নামাজের সময়ে পর্যটক-ভ্রমণে সংযম রাখুন; গরমের দিনে সকালের দিকটাই আরামদায়ক।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

লালবাগ কেল্লা অসমাপ্ত কেন?

জনপ্রিয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী ১৬৮৪ সালে শায়েস্তা খাঁর কন্যা পরীবিবির মৃত্যুর পর তিনি দুর্গটিকে অশুভ মনে করে কাজ বন্ধ করে দেন; গবেষকদের ভিন্ন ব্যাখ্যাও আছে (ভ্রমণগাইড/ডেইলি ক্যাম্পাস)।

কেল্লার নির্মাণ কে শুরু করেন?

১৬৭৮ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র যুবরাজ মুহাম্মদ আজম — তখন নাম ছিল ফোর্ট আওরঙ্গবাদ (গরলি)।

পরীবিবির সমাধি কেমন?

বর্গাকার (প্রতি বাহু ২০.২ মিটার), সাদা মার্বেল নির্মিত, ওপরে তামার পাতে মোড়া কৃত্রিম গম্বুজ (ভ্রমণগাইড)।

কেল্লা কবে বন্ধ থাকে?

রবিবার সাপ্তাহিক বন্ধ; সোমবার অর্ধদিবস (২:৩০ থেকে খোলা); সরকারি ছুটির দিন বন্ধ (গরলি)।

টিকিটের দাম কত?

বাংলাদেশি ৩০ টাকা, শিক্ষার্থী ১০ টাকা, সার্ক ২০০, বিদেশি ৪০০ টাকা; অনলাইন টিকিটও পাওয়া যায় (ভ্রমণগাইড)।

শেষকথা

অসমাপ্ত বলেই হয়তো লালবাগ কেল্লা এত জীবন্ত — প্রতিটি দেয়াল যেন থেমে যাওয়া এক গল্পের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দেয়। পরীবিবির সমাধির সাদা মার্বেল, শাহী মসজিদের আজান আর বাগানের নীরবতা মিলিয়ে এই দুর্গ পুরান ঢাকার সবচেয়ে গভীর অভিজ্ঞতাগুলোর একটি।