সুন্দরবনের গভীরে জাহাজে করে দুই-তিন দিন কাটানো সবার পক্ষে সবসময় সম্ভব হয় না — সময়, বাজেট কিংবা সাহস, কোনো না কোনো বাধা থাকেই। তাদের জন্য সুন্দরবনের সবচেয়ে সহজ দুটি দরজা হলো করমজল আর হাড়বাড়িয়া। দুটোই মংলা থেকে নৌপথে কাছে, দুটোতেই একদিনে ঘুরে সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসা যায়, আর দুটোতেই পাওয়া যায় আসল ম্যানগ্রোভ বনের স্বাদ — কাঠের ট্রেইলে হাঁটা, খালের পাড়ে হরিণ, রোদ পোহানো কুমির। বড় চিত্রটা জানতে চাইলে আগে পড়ুন আমাদের সুন্দরবন ভ্রমণ গাইড — এই পোস্টে রইল শুধু এই দুই স্পটের বিস্তারিত।
করমজল: বনের প্রজননকেন্দ্র
পশুর নদীর পূর্ব পাড়ে, মংলার সবচেয়ে কাছে অবস্থিত করমজল আসলে বন বিভাগের একটি বন্যপ্রাণী প্রজনন ও সংরক্ষণ কেন্দ্র। এখানকার মূল আকর্ষণ লোনাজলের কুমিরের প্রজনন প্রকল্প — ঘের দেওয়া পুকুরে বড় কুমিরদের রোদ পোহাতে দেখা যায় খুব কাছ থেকে। কেন্দ্রের সবচেয়ে বিখ্যাত বাসিন্দা স্ত্রী কুমির 'জুলিয়েট' — সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী সে এ পর্যন্ত চার শতাধিক ডিম দিয়েছে, যার অনেকগুলো থেকে বাচ্চাও ফুটেছে; আরেক বাসিন্দা 'পিলপিল'-এর ডিম থেকেও বাচ্চা ফোটে নিয়মিত। প্রজননকেন্দ্রে আরও আছে খাঁচাঘেরা খোলা জায়গায় চিত্রা হরিণের দল আর রেসাস বানর। কেন্দ্রের ভেতর দিয়ে চলে গেছে উঁচু কাঠের ট্রেইল — শ্বাসমূল আর গরান-গেওয়ার জঙ্গলের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পাখির ডাক আর বনের গন্ধে এক ঘণ্টা কেটে যায় অনায়াসে। ট্রেইলের পাশে আছে ওয়াচ টাওয়ার আর বনের মানচিত্রসহ পরিচিতিমূলক প্রদর্শনী। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে যাওয়ার জন্য সুন্দরবনের সবচেয়ে নিরাপদ ও স্বস্তির স্পট এটাই। কেন্দ্র সাধারণত সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত খোলা থাকে।
হাড়বাড়িয়া: আসল বনের ভেতর এক ঘণ্টা
মংলা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার ভেতরে হাড়বাড়িয়া ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্র — করমজলের চেয়ে এখানে বনের অনুভূতি অনেক বেশি 'আসল'। মূল আকর্ষণ বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া কাঠের ট্রেইল; পুরোটা ঘুরে আসতে সময় লাগে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট। ট্রেইলের ধারে বন্যপ্রাণীদের মিঠা পানির জন্য খনন করা পদ্মপুকুর — পুকুরের মাঝখানে বসার ব্যবস্থাও আছে। পাশেই কাঠের ওয়াচ টাওয়ার, যেখান থেকে প্রায় পুরো এলাকাটা এক নজরে দেখা যায়; তবে টাওয়ারে একসঙ্গে ছয়জনের বেশি ওঠা যায় না। হাড়বাড়িয়ার খালের চরে প্রায়ই লোনাজলের কুমির রোদ পোহায় — দেখার সেরা সময় ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। এখানকার হরিণ মানুষের সঙ্গে অভ্যস্ত, তাই বনের ধারে বেশ কাছ থেকেই তাদের দেখা মেলে; আর ভাগ্য ভালো থাকলে কাদায় বাঘের টাটকা পায়ের ছাপও চোখে পড়ে। একটি জরুরি তথ্য: হাড়বাড়িয়ায় ঢুকতে বন বিভাগের অনুমতি ও সঙ্গে গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক — নিজে নৌকা ভাড়া করে গেলে এই অনুমতির কাজটা ঘাট থেকেই সেরে নিতে হয়, প্যাকেজ বা জাহাজ ট্যুরে থাকলে অপারেটরই তা করে দেয়।
একদিনে দুটো স্পট: নমুনা সূচি
খুব ভোরে মংলা পৌঁছে ফেরিঘাট থেকে সারা দিনের জন্য নৌকা ভাড়া করুন। সকালের দিকে প্রথমে করমজল — প্রজননকেন্দ্র আর ট্রেইল মিলিয়ে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা রাখুন। তারপর নৌকায় পশুর নদী ধরে হাড়বাড়িয়া; দুপুরের পর ট্রেইল, পদ্মপুকুর আর ওয়াচ টাওয়ার ঘুরে বিকেলের আলো থাকতেই মংলার পথে রওনা দিন। মনে রাখবেন, ভেতরে খাবারের কোনো ব্যবস্থা নেই — দুপুরের খাবার আর পানি মংলা থেকে সঙ্গে নিয়ে যেতে হয়। জাহাজ ট্যুরে গেলে সূচি উল্টোটাও হতে পারে: খুলনা থেকে ছাড়া অনেক জাহাজের প্রথম দিনের গন্তব্যই থাকে হাড়বাড়িয়া, আর করমজল পড়ে শেষ দিনে ফেরার পথে।
কীভাবে যাবেন
গন্তব্য মংলা। ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে মংলাগামী সরাসরি বাস চলে; এছাড়া খুলনা গিয়ে সেখান থেকে সড়কপথে ঘণ্টা দেড়েকে মংলা পৌঁছানো যায়। মংলা ফেরিঘাট থেকে করমজলের জন্য ইঞ্জিন নৌকা ভাড়া মেলে — দশজন ধারণক্ষমতার নৌকার যাওয়া-আসার ভাড়া মোটামুটি এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা, পশুর নদী পেরিয়ে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় এক থেকে দেড় ঘণ্টা। শুধু করমজল না গিয়ে দুটো স্পটই একদিনে ঘুরতে চাইলে সারা দিনের নৌকা ভাড়া পড়ে প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। ভাড়া মৌসুম আর দর কষাকষিতে বদলায় — ওঠার আগেই যাওয়া-আসা ও অপেক্ষার শর্তসহ ভাড়া পাকা করে নিন, আর লাইফ জ্যাকেট আছে কিনা দেখে নিন।
প্রবেশ ফি ও খরচ
করমজলে প্রবেশের সাম্প্রতিক নির্ধারিত ফি বাংলাদেশি পর্যটকের জন্য ৪৬ টাকা, বিদেশি পর্যটকের জন্য ৫৭৫ টাকা এবং বারো বছরের কম বয়সী শিশুর জন্য ২৩ টাকা; ভিডিও ক্যামেরা নিলে আলাদা ফি লাগে, আর সব ফির উপর ভ্যাট প্রযোজ্য। ফি মাঝে মাঝে হালনাগাদ হয়, তাই টিকিট কাউন্টারের তালিকাটাই চূড়ান্ত ধরে নিন। হাড়বাড়িয়ার ক্ষেত্রে অনুমতি ও গাইডের খরচ নৌকার প্যাকেজের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়াই সুবিধাজনক। একদিনের পুরো সফরের হিসাব দাঁড়ায় মোটামুটি এভাবে — মংলা পর্যন্ত যাতায়াত, নৌকা ভাড়া, প্রবেশ ফি আর এক বেলার খাবার মিলিয়ে দল বড় হলে জনপ্রতি খরচ অনেকটাই নেমে আসে; ছোট দলে নৌকার ভাড়াই খরচের বড় অংশ।
কোথায় থাকবেন, কী খাবেন
দিনের সফরে থাকার দরকার হয় না, তবে মংলায় রাত কাটাতে চাইলে পর্যটন কর্পোরেশনের হোটেল পশুরসহ শহরে কয়েকটি সাধারণ মানের হোটেল ও ইকো রিসোর্ট আছে। আগের দিন বিকেলে মংলা পৌঁছে রাত কাটিয়ে পরদিন ভোরে নৌকায় উঠলে সফরটা অনেক স্বস্তির হয়। খাবারের জন্য মংলার হোটেলগুলোতে নদীর তাজা মাছ আর চিংড়ির পদ মেলে সহজেই। বনের ভেতরে কিছুই পাওয়া যায় না বলে পানি ও হালকা খাবার সঙ্গে রাখুন — আর প্লাস্টিকের প্যাকেট বা বোতল অবশ্যই ফেরত নিয়ে আসুন, বনে ফেলে আসা সম্পূর্ণ নিষেধ।
টিপস ও সতর্কতা
বর্ষার পর কাঠের ট্রেইল ভেজা ও পিচ্ছিল থাকতে পারে — পা টিপে হাঁটুন, বাচ্চাদের হাত ধরে রাখুন। কুমিরের ঘের বা খালের পাড়ে কোনো অবস্থাতেই নামবেন না বা হাত বাড়াবেন না। হাড়বাড়িয়ায় গাইডের নির্দেশ মেনে দলেই থাকুন — এটি অভয়ারণ্য এলাকা, পায়ের ছাপই বলে দেয় বাঘ আশপাশে ঘোরে। প্রতি বছর প্রজনন মৌসুমে ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট সুন্দরবনজুড়ে প্রবেশ বন্ধ থাকে — এই দুই স্পটও তখন বন্ধ। সেরা সময় নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি; এই সময়ে কুমির রোদ পোহাতে চরে ওঠে, হরিণও বেশি দেখা যায়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
করমজল আর হাড়বাড়িয়া কি একদিনে ঘোরা যায়?
যায়। মংলা থেকে সারা দিনের নৌকা ভাড়া করে সকালে করমজল ও দুপুরে হাড়বাড়িয়া ঘুরে বিকেলে ফেরা সম্ভব — তবে আগেভাগে রওনা দেওয়া জরুরি।
শিশুদের নিয়ে যাওয়া নিরাপদ তো?
করমজল শিশুদের জন্য সুন্দরবনের সবচেয়ে নিরাপদ স্পট — ট্রেইল ও ঘের দেওয়া প্রজননকেন্দ্র। হাড়বাড়িয়াতেও শিশু নেওয়া যায়, তবে ট্রেইলে হাত ধরে রাখতে হবে।
হাড়বাড়িয়ায় কি আলাদা অনুমতি লাগে?
হ্যাঁ, বন বিভাগের অনুমতি ও গাইড বাধ্যতামূলক। নিজস্ব নৌকায় গেলে ঘাট/অফিস থেকে অনুমতি নিতে হয়; প্যাকেজ ট্যুরে অপারেটর ব্যবস্থা করে।
করমজলে কী কী প্রাণী দেখা যায়?
প্রজননকেন্দ্রে লোনাজলের কুমির, চিত্রা হরিণ ও রেসাস বানর কাছ থেকে দেখা যায়; ট্রেইলে নানা পাখি আর ভাগ্য ভালো থাকলে বুনো শুয়োরও চোখে পড়ে।
কখন গেলে কুমির দেখার সম্ভাবনা বেশি?
ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি — শীতের রোদে কুমির খালের চরে উঠে রোদ পোহায়, দুই স্পটেই তখন দেখা মেলার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
শেষকথা
করমজল সুন্দরবনের চেনা মুখ, হাড়বাড়িয়া তার একটু গভীরের রূপ — একদিনের সফরে এই দুটো মিলিয়ে গেলে বনের প্রতি টানটা তৈরি হয়ে যায়। এরপর গভীর বনের অভিজ্ঞতা নিতে চাইলে দুই রাত তিন দিনের জাহাজ ট্যুরের পরিকল্পনা করুন; রুট, পারমিট আর খরচের পুরো হিসাব পাবেন আমাদের সুন্দরবন ভ্রমণ গাইডে।