কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড়ের আনোয়ারা দুটি ভিন্ন কারণে বিশেষ: এখানকার বটতলীতে চট্টগ্রামের শ্রেষ্ঠ সাধকদের একজনের দরগাহ, আর কাছেই দেয়াঙ পাহাড়ে (স্থানীয় উচ্চারণে দেওয়াং) চাপা পড়ে আছে পাঁচশো বছরের পুরনো জনপদের ইতিহাস। জেলার দরবার-ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় পড়ুন সীতাকুণ্ড: একেক মৌসুমে একেক সাজ।
শাহ মোহছেন আউলিয়া ও বটতলীর দরগাহ
- ভক্তদের কাছে ‘কুতুবুল আউলিয়া’ — হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া (রহ.)-এর মাজার আনোয়ারার বটতলীতে: সবুজ গম্বুজ আর সোনালি জালির কারুকাজের ফটক পেরিয়ে প্রশস্ত প্রাঙ্গণ।
- প্রচলিত বিবরণে তিনি ইয়েমেন থেকে গৌড় হয়ে এই উপকূলে আসেন; কালো পাথরে ভর করে সাগর পাড়ি দেওয়ার কিংবদন্তিটি সবচেয়ে বিখ্যাত — সেই পাথরটি আজও মাজারের বারান্দায় সংরক্ষিত আছে বলে ভক্তরা জানান।
- প্রথমে তাঁকে ঝিউরী গ্রামে দাফন করা হয়েছিল; কথিত আছে, স্বপ্নাদেশে নির্দেশ পেয়ে ভক্তরা পরে বটতলীতে সমাধি স্থানান্তর করেন।
- বার্ষিক ওরশ প্রতি বছর ৬ আষাঢ় — আলোকসজ্জা ও লাখো ভক্তের সমাগম; ২০২০ সালে করোনার কারণে শত শত বছরের ইতিহাসে প্রথমবার ওরশ স্থগিত হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
দেয়াঙ পাহাড়: পাহাড়ের নিচে চাপা ইতিহাস
- কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরে আনোয়ারা-কর্ণফুলীজুড়ে বিস্তৃত পাহাড়ি এলাকা — একসময় এখানে ছিল আরাকানিদের চাটিগাঁ দুর্গ ও দেয়াঙ কারাগার; ইতিহাসে মহাকবি আলাওলের বন্দিদশার সঙ্গেও এই কারাগারের নাম জড়িত।
- ১৫১৮ সালে পর্তুগিজ বণিকদের আগমনের পর দেয়াঙে গড়ে ওঠে কুঠি ও গির্জা; অঞ্চলটি পরিচিত হয় ‘ফিরিঙ্গি বন্দর’ নামে। গবেষকদের একাংশের মতে প্রাচীন পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাব্য অবস্থানও এই পাহাড়ি অঞ্চল — তবে এ নিয়ে বিতর্ক আছে।
- ১৯২৭ সালে ঝিউরি ও হাজীগাঁও এলাকা থেকে উদ্ধার হয় ৬৬টি পিতলের বুদ্ধমূর্তি — প্রাচীন বৌদ্ধসভ্যতার উপস্থিতির ইঙ্গিত।
- ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বড়উঠানের বিশ্বমুড়া টিলায় খনন চালিয়ে ইটের দেয়াল ও মেঝের অস্তিত্ব শনাক্ত করে; পরে প্রশাসনিক জটিলতায় খনন স্থগিত হয়।
আজ যা দেখতে পাবেন (সৎ প্রত্যাশা)
দেয়াঙ আজ জঙ্গল-ঢাকা সাধারণ পাহাড়ি এলাকা — সংগঠিত পর্যটন সুবিধা বা প্রদর্শনী নেই; ইতিহাস জানা থাকলে হাঁটাটা অর্থবহ হয়। খনন এলাকা সংরক্ষিত — অনুমতি ছাড়া ঢুকবেন না। মূল আকর্ষণ তাই দরগাহকেন্দ্রিক: সকালে জিয়ারত, দুপুরে পাহাড়ি এলাকায় হালকা হাঁটা, বিকেলে পারকি সৈকত বা শঙ্খের ধারে — পূর্ণ একদিনের আনোয়ারা-ভ্রমণ সাজে এভাবেই।
জিয়ারতের আদব
শালীন পোশাক ও সংযত আচরণ; মাজার প্রাঙ্গণে ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন; ওরশের দিন (৬ আষাঢ়) প্রচণ্ড ভিড় থাকে — সঙ্গী ও জিনিসপত্রের বাড়তি খেয়াল রাখুন।
কীভাবে যাবেন
বহদ্দারহাট থেকে আনোয়ারাগামী বাসে বটতলী (মাজার বাজারসংলগ্ন এলাকায়); কর্ণফুলী টানেল দিয়েও আনোয়ারা পৌঁছানো যায়। দেয়াঙ পাহাড়ের বিভিন্ন অংশ আনোয়ারা ও কর্ণফুলী দুই উপজেলাজুড়ে — স্থানীয়দের সাহায্য নিলে যাওয়া সহজ হয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
মোহছেন আউলিয়ার ওরশ কবে?
প্রতি বছর ৬ আষাঢ়।
পাথরটি কি সত্যিই দেখা যায়?
মাজার প্রাঙ্গণে সংরক্ষিত পাথরটি ভক্তদের কাছে সেই কিংবদন্তির পাথর — জিয়ারতের সময় দেখা যায়।
দেয়াঙ পাহাড়ে কী দেখব?
দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন স্থাপনা তেমন নেই — সবুজ পাহাড়, খনন-স্থল (বাইরে থেকে) আর ইতিহাসের প্রেক্ষাপটই মূল আকর্ষণ।
শেষকথা
বিশ্বাস আর ইতিহাস — আনোয়ারার এই দুই মুখ একদিনে দেখা যায়। শহরের দরবার-ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলিয়ে পড়ুন লালদীঘি: চট্টগ্রামের ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি।