• 30 Oct, 2026

শিক্ষাবিদ খান বাহাদুর আহসানউল্লাহর সমাধি-কমপ্লেক্স নলতা শরীফ — ৪০ বিঘার বাগানঘেরা ৯ গম্বুজের সৌধ, ৮–১০ ফেব্রুয়ারির ওরস আর রমজানের বিশাল ইফতার; সঙ্গে ১৬৯৩ সালের মুঘল প্রবাজপুর শাহী মসজিদ। সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ ভ্রমণের পূর্ণ গাইড।

সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলায় একই দিনে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন যুগের দুটি বিস্ময় দেখা যায়। একটি বিংশ শতাব্দীর — একজন শিক্ষাবিদের সমাধিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ফুলের বাগানঘেরা বিশাল তীর্থ-কমপ্লেক্স, নলতা শরীফ। অন্যটি সতেরো শতকের — মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলের লাল ইটের শাহী মসজিদ, প্রবাজপুর। সুন্দরবনের পথে শ্যামনগরের কলাগাছিয়া রুট বা ঈশ্বরীপুরের যশোরেশ্বরী মন্দির ঘুরতে এলে কালীগঞ্জের এই দুটি জায়গা সহজেই যুক্ত করে নেওয়া যায়।

যাঁর সমাধি ঘিরে তীর্থ: খান বাহাদুর আহসানউল্লাহ

নলতা গ্রামে ১৮৭৩ সালের ডিসেম্বরে জন্ম খান বাহাদুর আহসানউল্লাহর — অবিভক্ত বাংলা ও আসামের শিক্ষা বিভাগের সহকারী পরিচালক, বহু গ্রন্থের প্রণেতা, শিক্ষা সংস্কারক ও সমাজহিতৈষী। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় তাঁর অবদানের কথা ইতিহাসে উল্লেখিত। শিক্ষকতার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক সাধক হিসেবেও তিনি সমাদৃত ছিলেন — এই দ্বিতীয় পরিচয়টাই পরে তাঁর নামের সঙ্গে "পীরে কামেল" ধরনের উপাধি যুক্ত করেছে। ১৯৬৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তাঁর মৃত্যুর পর জন্মভূমি নলতাতেই তাঁকে দাফন করা হয়; সেই সমাধিকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে আজকের খান বাহাদুর আহসানউল্লাহ সমাধি কমপ্লেক্স — নলতা শরীফ। একটি সৎ পর্যবেক্ষণ স্থানীয় লেখকদের রচনায় পাওয়া যায়: জীবদ্দশায় তিনি নিজে কোনো মাজার-কেন্দ্রিক ধারা প্রতিষ্ঠা করেননি — শিক্ষা আর সমাজসেবাই ছিল তাঁর প্রকাশ্য কাজ; তীর্থের রূপটি তাঁর মৃত্যুর পর ভক্ত-অনুরাগীদের আবেগে গড়ে উঠেছে। এই ইতিহাস মাথায় রেখে গেলে নলতা ভ্রমণটা আরও অর্থবহ হয়।

কমপ্লেক্স: ঢিবির উপর নয় গম্বুজের সৌধ

প্রায় ৪০ বিঘা জমির ওপর বিস্তৃত কমপ্লেক্সে আছে মসজিদ, লাইব্রেরি, জাদুঘর, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, অতিথিশালা, অফিস, পুকুর — আর চারদিকে ফুলের বাগানঢাকা ঢাল। বাগানের শীর্ষে উঁচু ঢিবির মতো মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে মূল সমাধিসৌধ — কেন্দ্রীয় বড় গম্বুজসহ মোট নয়টি গম্বুজ; ওঠার জন্য তিন দিকে তিনটি সিঁড়িপথ, যার দক্ষিণেরটি সবচেয়ে প্রশস্ত ও আকর্ষণীয়। চারদিকের ঢালজুড়ে সাজানো ফুলের বাগান সৌধটিকে দূর থেকে ছবির মতো করে তোলে। কমপ্লেক্সটি সারা বছর দর্শনার্থীদের জন্য খোলা; জাদুঘরটি সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছাড়া সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকে বলে ভ্রমণ-গাইডগুলো জানায়। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও নিয়মিত এখানে জিয়ারতে আসেন — ২০২৬ সালের অক্টোবরেও জেলা প্রশাসকের জিয়ারতের খবর পত্রিকায় এসেছে।

ওরস ও রমজানের ইফতার: কবে গেলে জমজমাট

নলতা শরীফ সবচেয়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে দুটি সময়ে। প্রথমত, ৮, ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি — আহসানউল্লাহর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বার্ষিক ওরস মাহফিল; ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সারা দেশ থেকে হাজার হাজার ভক্ত-অনুরাগী আসেন, মাঠজুড়ে বসে বিশাল মেলা, তৃতীয় দিনে আগতদের খাবার পরিবেশনের মধ্য দিয়ে ওরস শেষ হয়। দ্বিতীয়ত, রমজান মাসে — ১৯৫০ সাল থেকে এখানে আয়োজিত হয়ে আসছে বিশাল ইফতার মাহফিল, যেখানে প্রায় দশ হাজার মানুষ একসঙ্গে বসে ইফতার করেন বলে জানা যায় — দেশের বৃহত্তম ইফতার আয়োজনগুলোর একটি হিসেবে এটি পরিচিত। ওরসের সময় গেলে কমপ্লেক্সের আলোকসজ্জা আর মানুষের সমাগম দেখতে পাবেন; শান্ত পরিবেশ চাইলে বেছে নিন বছরের অন্য সময়।

প্রবাজপুর শাহী মসজিদ: ১৬৯৩ সালের মুঘল নিদর্শন

কালীগঞ্জ সদর থেকে মাত্র প্রায় চার কিলোমিটার দূরে, মথুরেশপুর ইউনিয়নের প্রবাজপুরে দাঁড়িয়ে আছে ৩৩০ বছরের বেশি পুরনো এই লাল ইটের মসজিদ। নির্মাণ সাল ১৬৯৩ (১১০৪ হিজরি) নিয়ে সূত্রগুলো একমত। নির্মাতা নিয়ে দুটি বয়ান প্রচলিত: প্রত্নতত্ত্ববিদদের বরাতে বাসস জানায়, সম্রাট আওরঙ্গজেব এই এলাকায় মোতায়েন মুসলিম সৈন্যদের নামাজের জন্য সুবেদার পরবাজ খাঁকে মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দেন — সৈন্যদের গ্রামটি তাঁর নামেই "প্রবাজপুর" হয়; অন্য বয়ানে ফৌজদার নবাব নুরুল্লাহ খাঁ মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখিত, যিনি মসজিদের নামে ৫০ বিঘা জমি লাখেরাজ দান করেছিলেন। মসজিদটি ছোট কিন্তু মজবুত — বাইরের মাপ প্রায় ৫২ ফুট বাই ৪০ ফুট, দেয়াল পাঁচ থেকে সাত ফুট পর্যন্ত পুরু; পশ্চিম দেয়ালে তিনটি অলংকৃত মেহরাব, পাশে ঈদগাহ। স্থানীয় কিংবদন্তি বলে, জিনেরা জঙ্গল পরিষ্কার করে রাতারাতি মসজিদটি বানিয়েছিল, আর এখানে মানত করলে তা বিফলে যায় না বলে বিশ্বাস প্রচলিত। মসজিদটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত স্থাপনা হলেও আজও পুরোপুরি সক্রিয় — প্রতিদিন শত শত মুসল্লি এখানে নামাজ পড়েন (বাসস, ২০২৫)। অর্থাৎ এটি জাদুঘরের নিদর্শন নয়, জীবন্ত একটি ঐতিহ্য।

কীভাবে যাবেন

নলতা শরীফ সাতক্ষীরা–কালীগঞ্জ সড়কের ধারেই — সাতক্ষীরা শহর থেকে কালীগঞ্জগামী যেকোনো বাসে উঠলেই পৌঁছে যাওয়া যায়; কালীগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে দূরত্ব প্রায় আট কিলোমিটার। প্রবাজপুর মসজিদ কালীগঞ্জ সদর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার — ভ্যান/ইজিবাইকে সহজে যাওয়া যায়। দুটি স্থান মিলিয়ে আধা দিনের সফরই যথেষ্ট; পুরো দিন হাতে থাকলে সঙ্গে ঈশ্বরীপুরের যশোরেশ্বরী মন্দির যুক্ত করে কালীগঞ্জ-শ্যামনগর ঐতিহ্য-বলয় সম্পূর্ণ করা যায়। ধর্মীয় স্থান দুটিতেই শিষ্টাচার মেনে চলুন — নলতায় অতিথিশালা থাকলেও পর্যটকের থাকার জন্য কালীগঞ্জ বা সাতক্ষীরা শহরই নির্ভরযোগ্য।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

নলতা শরীফ কার সমাধি?

শিক্ষাবিদ ও সমাজ সংস্কারক খান বাহাদুর আহসানউল্লাহর (১৮৭৩–১৯৬৫)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকার কথা ইতিহাসে উল্লেখিত; জন্ম ও সমাধি দুটোই নলতায়।

ওরস কবে হয়?

প্রতি বছর ৮, ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি — মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে। সঙ্গে বড় মেলা বসে।

প্রবাজপুর মসজিদ কত সালের?

১৬৯৩ খ্রিস্টাব্দের (১১০৪ হিজরি) — মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলের; নির্মাতা হিসেবে সুবেদার পরবাজ খাঁর নাম প্রচলিত, ফৌজদার নবাব নুরুল্লাহ খাঁর জমিদানের কথাও জানা যায়।

মসজিদে কি এখনো নামাজ হয়?

হয় — প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত স্থাপনা হলেও এটি সক্রিয় মসজিদ; প্রতিদিন শত শত মুসল্লি নামাজ পড়েন।

দুটি স্থান এক দিনে দেখা যায়?

যায় — দুটোই কালীগঞ্জ উপজেলায়; আধা দিনেই ঘোরা সম্ভব, সঙ্গে চাইলে যশোরেশ্বরী মন্দিরও (শ্যামনগর) যুক্ত করা যায়।

শেষকথা

নলতা-প্রবাজপুর জুটি বোঝায়, ঐতিহ্য মানেই শুধু প্রাচীন রাজপ্রাসাদ নয় — একটি হতে পারে মানুষের ভালোবাসায় গড়ে ওঠা আধুনিক তীর্থ, অন্যটি সাড়ে তিন শ বছরের জীবন্ত মসজিদ। কালীগঞ্জ দিয়ে যাওয়া হলে এই দুই থামা আপনার দক্ষিণবঙ্গ-ভ্রমণকে ইতিহাসের দুই প্রান্ত ছুঁইয়ে দেবে।