• 30 Oct, 2026

ষাট গম্বুজের ছায়ায় ঢেকে থাকা বাগেরহাটের বাকি প্রাচীন মসজিদগুলোর পূর্ণ গাইড — ঠাকুর দীঘির পাড়ের নয় গম্বুজ, দেশের বৃহত্তম একগম্বুজ রণবিজয়পুর, সিঙ্গাইর, চুনাখোলা, ছয় গম্বুজ রেজা খোদা ও দশ গম্বুজ; কোনটি কোথায়, কী দেখবেন, আর এক দিনে হেঁটে-ঘোরা রুট।

খলিফাতাবাদ নামের এই নগরীতে একসময় ছিল প্রায় তিন শ ষাটটি মসজিদ। আজ পর্যটকদের প্রায় সবাই আসেন ষাট গম্বুজ দেখতে, তারপর ফিরে যান — অথচ কয়েক কিলোমিটারের ব্যাসার্ধের মধ্যেই ছড়িয়ে আছে আরও এক ডজন প্রাচীন মসজিদ, যেগুলোর প্রতিটির নিজস্ব গড়ন আর গল্প আছে। ষাট গম্বুজ মসজিদের গাইডে মূল আকর্ষণটি নিয়ে বিস্তারিত আছে; এই পোস্ট 'বাকিদের' জন্য — নয় গম্বুজ থেকে শুরু করে রণবিজয়পুর, সিঙ্গাইর, চুনাখোলা, রেজা খোদা আর দশ গম্বুজ। ঐতিহাসিক নগরীটি গড়ে উঠেছিল দুটি অঞ্চলে — পশ্চিমে ষাট গম্বুজ মসজিদ-কেন্দ্রিক এলাকা, আর পূর্বে খান জাহান আলীর মাজার-কেন্দ্রিক এলাকা; মাঝখানে প্রায় ছয় কিলোমিটার। এই পোস্টের মসজিদগুলোকে সেই দুই অঞ্চল ধরেই সাজানো হলো, যাতে ঘোরার রুটটা সহজ হয়।

মাজার অঞ্চল: নয় গম্বুজ ও রেজা খোদা

নয় গম্বুজ মসজিদ ঠাকুর দীঘির পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত — অর্থাৎ মাজার দেখে দীঘির পাড় ধরে হাঁটলেই পৌঁছে যাবেন। বর্গাকার এই মসজিদের ভেতরটা দুই সারি পাথরের স্তম্ভে নয়টি চারকোনা খণ্ডে ভাগ করা, প্রতিটি খণ্ডের উপর একটি করে গম্বুজ — মিলিয়ে নয় গম্বুজ। মসজিদকুঁড় মসজিদের মতোই (যার গাইড এই সিরিজের খুলনা অংশে আছে) এটি একই খান জাহানী নকশা-পরিবারের সদস্য, তবে আকারে অনেক বড় ও রাজকীয়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে থাকা এই মসজিদটি এখনো অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থায় আছে, আর দীঘির পাড়ের অবস্থান এটিকে ছবির জন্য অসাধারণ করে তুলেছে।

ছয় গম্বুজ বা রেজা খোদা মসজিদ মাজারের উত্তর-পশ্চিমে, ঠাকুর দীঘির কাছেই — তবে এটি দেখতে যাওয়া মানে ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়ানো। মসজিদটির বেশিরভাগ অংশই এখন প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত; ছয়টি পাথরের স্তম্ভ আর পশ্চিম দেয়ালের তিনটি অলংকৃত মিহরাব এখনো টিকে আছে। বাইরের মাপে এটি ছিল প্রায় সাড়ে ষোলো বাই বারো মিটারের একটি ছয়-গম্বুজ মসজিদ, দেয়াল প্রায় পৌনে দুই মিটার পুরু। ধ্বংসের এই দৃশ্যটাই এখানকার শিক্ষা — সংরক্ষণ না পেলে পঞ্চদশ শতকের ইটভাটা এভাবেই মাটিতে মিশে যায়। একই অঞ্চলে দীঘির পশ্চিম পাড়ে জিন্দাপীর মসজিদটিও মাজার পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে — দুটো একসঙ্গে দেখে নিন।

ষাট গম্বুজের প্রতিবেশী: সিঙ্গাইর, রণবিজয়পুর, চুনাখোলা

সিঙ্গাইর মসজিদ ষাট গম্বুজের একদম কাছেই, সুন্দরঘোনা গ্রামে খুলনা-বরিশাল মহাসড়কের পাশে — ষাট গম্বুজ দেখে বেরিয়েই হাঁটাপথে চলে আসা যায়। বর্গাকার একগম্বুজ এই মসজিদটির মাপ প্রায় বারো বাই বারো মিটার, দেয়াল দুই মিটারেরও বেশি পুরু, চার কোণে চারটি গোলাকার বুরুজ। পূর্ব দিকে তিনটি খিলান-দরজা (মাঝেরটি অপেক্ষাকৃত বড়), উত্তর-দক্ষিণে একটি করে; পশ্চিম দেয়ালে অলংকৃত মিহরাব। ষাট গম্বুজের সঙ্গে সাদৃশ্য সুস্পষ্ট — একই কারিগরি ঐতিহ্যের ছোট ভাই বলা যায়। রণবিজয়পুর মসজিদ ষাট গম্বুজ থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার পূর্বে — এর খ্যাতি আকারে: এগারো মিটার ব্যাসের একক গম্বুজটি দিয়ে এটি বাংলাদেশের একগম্বুজবিশিষ্ট মসজিদগুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ বলে পরিচিত। একটিমাত্র বিশাল গম্বুজের নিচে দাঁড়ালে খান জাহানী স্থাপত্যের সাহস টের পাওয়া যায়। চুনাখোলা মসজিদও সুন্দরঘোনা-চুনাখোলা এলাকার খান জাহান-রীতিরই আরেকটি প্রাচীন মসজিদ — ষাট গম্বুজ চত্বরের ঘোরাফেরায় এটিকেও তালিকায় রাখা যায়। এই অঞ্চলেই রয়েছে বিবি বেগনী মসজিদও, যা নিয়ে এই সাইটে আলাদা লেখা রয়েছে।

পরের যুগের সংযোজন: দশ গম্বুজ ও রেজাই খান

বাগেরহাটের সব মসজিদ খান জাহানের আমলের নয়। ইতিহাসবিদদের মতে দশ গম্বুজ মসজিদ এবং রেজাই খান মসজিদ পরবর্তীকালে নির্মিত — নামের মধ্যেই আকারের ইঙ্গিত: সারিবদ্ধ গম্বুজের এই মসজিদগুলো দেখলে বোঝা যায়, খান জাহানের পরে্ও এই নগরীতে ইবাদত-স্থাপত্যের ধারা থামেনি। এগুলো তুলনামূলক কম সংরক্ষিত, তবে মসজিদ-নগরীর পূর্ণ ধারাবাহিকতা বোঝার জন্য এদের মূল্য কম নয়। সময় হাতে থাকলে স্থানীয় গাইড বা অটোচালককে জিজ্ঞেস করে এই দুটিও রুটে জুড়ে নিন।

এক দিনে বাকি মসজিদ দেখার রুট

সকালটা শুরু করুন মাজার অঞ্চল দিয়ে — খান জাহান আলীর মাজার, ঠাকুর দীঘি, নয় গম্বুজ আর রেজা খোদার ধ্বংসাবশেষ। তারপর পশ্চিমে সরে আসুন ষাট গম্বুজ এলাকায়: প্রধান মসজিদ দেখে সিঙ্গাইর, তারপর রণবিজয়পুর ও চুনাখোলা। অটোরিকশা বা ইজিবাইক দিনের জন্য ঠিক করে নিলে এই রুটে কোনো জায়গাই দূরের নয়। দ্রষ্টব্য: ষাট গম্বুজ কমপ্লেক্স ছাড়া বাকি মসজিদগুলো গ্রামের মধ্যে ছড়িয়ে — পোশাকে শালীনতা ও স্থানীয়দের প্রতি সম্মান বজায় রাখুন, নামাজের সময় ভেতরে ভিড় করবেন না, আর ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থানে দেয়ালে হেলান বা ওঠানামা থেকে বিরত থাকুন। পত্রিকায় ষাট গম্বুজসহ এসব স্থাপনার উপর মহাসড়কের ভারী যানের কম্পনের ঝুঁকি নিয়েও আলোচনা এসেছে — সংরক্ষণের দায়িত্ব দর্শনার্থীর আচরণেও।

সংরক্ষণের গল্পটা সবার জানা দরকার

এই মসজিদগুলো যে আজও দাঁড়িয়ে আছে, তার পেছনে দীর্ঘ লড়াই আছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী লবণাক্ত মাটি-আবহাওয়া পোড়ামাটির ইট ক্ষয় করেছে, জঙ্গল গিলে ফেলেছিল অসংখ্য স্থাপনা। ঊনবিংশ শতকের শেষে (১৮৯৫ সালে) এলাকাটিতে ব্যাপক জরিপ হয়, আর বিংশ শতকের শুরু থেকে ধাপে ধাপে পুনরুদ্ধার শুরু হয় — ষাট গম্বুজ দিয়ে যার সূচনা। ১৯৮২–৮৩ সালে ইউনেস্কো বাগেরহাটের জন্য বৃহৎ সংরক্ষণ-পরিকল্পনা নেয়, আর ১৯৮৫ সালে পুরো ঐতিহাসিক মসজিদ-নগরী বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় ওঠে। তারপরও লড়াই শেষ হয়নি: লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা আর সড়কের কম্পন এখনো এই ইট-স্থাপত্যের নীরব শত্রু। দর্শনার্থী হিসেবে আমাদের ভূমিকা ছোট্ট কিন্তু সত্যিকারের — দেয়ালে না ওঠা, ইটে খোদাই না করা, ভঙ্গুর অংশে ভর না দেওয়া। তাহলেই পরের প্রজন্মও এই 'বাকি' মসজিদগুলো দেখতে পাবে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

নয় গম্বুজ মসজিদ কোথায়?

বাগেরহাটে ঠাকুর দীঘির পশ্চিম পাড়ে, খান জাহান আলীর মাজারের কাছে। ভেতরে দুই সারি পাথরের স্তম্ভে নয়টি খণ্ড, প্রতিটির উপর একটি গম্বুজ।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একগম্বুজ মসজিদ কোনটি?

বাগেরহাটের রণবিজয়পুর মসজিদ — এর একক গম্বুজের ব্যাস প্রায় ১১ মিটার। এটি ষাট গম্বুজ থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার পূর্বে।

সিঙ্গাইর মসজিদ কি ষাট গম্বুজের কাছেই?

হ্যাঁ — সুন্দরঘোনা গ্রামে, ষাট গম্বুজ কমপ্লেক্সের একদম পাশেই। বর্গাকার, একগম্বুজ, বারো মিটার বর্গের মসজিদটি হেঁটেই দেখা যায়।

ছয় গম্বুজ (রেজা খোদা) মসজিদের অবস্থা কেমন?

প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত — ছয়টি পাথরের স্তম্ভ ও তিনটি মিহরাব টিকে আছে। ঠাকুর দীঘির উত্তর-পশ্চিম ধারে, মাজারের কাছে।

সবগুলো মসজিদ দেখতে কত সময় লাগবে?

ষাট গম্বুজসহ পুরো সার্কিটে এক দিনই যথেষ্ট — সকালে মাজার অঞ্চল, বিকেলে ষাট গম্বুজ অঞ্চল এই ক্রমে সাজালে সুবিধা হয়।

শেষকথা

মসজিদের শহর নামটা ষাট গম্বুজের একার নয় — এই ছড়িয়ে থাকা প্রাচীন মসজিদগুলো মিলিয়েই তার অর্থ পূর্ণ হয়। একটি অতিরিক্ত দিন বাগেরহাটে কাটিয়ে এই 'বাকি' মসজিদগুলো দেখুন; ভিড়হীন পরিবেশে সাড়ে পাঁচ শ বছর আগের ইটের গায়ে হাত রাখার অভিজ্ঞতা ষাট গম্বুজের চেয়ে কম মূল্যবান নয়।