পিরোজপুর জেলা শহর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার উত্তরে, পৌর এলাকার রায়েরকাঠি গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন জমিদার বাড়ির ধ্বংসাবশেষ। একসময় প্রায় ২০০ একর জমিতে ছোট-বড় দুইশো ভবনের এই রাজবাড়ি ছিল সেলিমাবাদ পরগণার ক্ষমতার কেন্দ্র; আজ টিকে আছে গুটিকয়েক ভবন আর আকাশছোঁয়া কয়েকটি মঠ — তবে ইতিহাস আর কিংবদন্তি মিলিয়ে জায়গাটা এখনো অনন্য। পিরোজপুরে আটঘর-কুড়িয়ানার বাগান ঘোরার সফরে অর্ধেক বেলার জন্য এখানে ঢুঁ দেওয়া যায়।
সেলিমাবাদ পরগণা থেকে রায়েরকাঠি
ইতিহাসের সূত্র ধরে গেলে গল্প শুরু সপ্তদশ শতকের গোড়ায়। জনশ্রুতি ও জেলা-ইতিহাস অনুযায়ী, যুবরাজ সেলিম (পরবর্তীকালে সম্রাট জাহাঙ্গীর) বিদ্রোহ করে বাংলায় এলে বর্তমান পিরোজপুর, ঝালকাঠি ও বাগেরহাটের অংশ নিয়ে তাঁর নামে গঠিত হয় সেলিমাবাদ পরগণা (ভ্রমণগাইড/বাংলা উইকিপিডিয়া)। ১৬১৮ সালে পরগণার রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পান মদন মোহন রায়; ১৬২৮ সালে তিনি ছেলে শ্রীনাথ রায়ের নামে জমির পাট্টা নেন। শ্রীনাথ দক্ষতার সঙ্গে রাজস্ব আদায় করে মোগল সম্রাটের কাছ থেকে "রাজা" উপাধি পান (বরিশালপিডিয়া)। বংশলতিকা অনুযায়ী শ্রীনাথের বংশধর রুদ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীই রায়েরকাঠি জমিদারির মূল প্রতিষ্ঠাতা — তিনি সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি (জমিদার বাড়ির প্রতিষ্ঠা ১৬৫০-এর দশকে বলা হয়) ঘন বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে এখানে রাজবাড়ি ও মন্দির গড়েন (বরিশালপিডিয়া/বাংলা উইকিপিডিয়া)। জঙ্গল কেটে বসতি গড়া হয়েছিল বলেই অঞ্চলটির নাম হয় "রায়েরকাঠি" — এমনটাই প্রচলিত ব্যাখ্যা (ভ্রমণগাইড)।
রাজবাড়ি, কালী মন্দির আর ২৫ মণের শিবলিঙ্গ
প্রতিষ্ঠার পর রাজবাড়ি প্রাঙ্গণে গড়ে ওঠে রাজভবন, অতিথিশালা, নহবৎখানা, নাট্যশালা ও অসংখ্য মন্দির — ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২০০টি ভবন, যার ৪০–৫০টি ছিল বিশালাকার (ভ্রমণগাইড/এশিয়ান এজ)। ১৬৫৮ সালে নির্মিত হয় কালী মন্দির (ভ্রমণগাইড/এশিয়ান এজ)। কমপ্লেক্সের সবচেয়ে আলোচিত বস্তুটি একটি মঠে স্থাপিত প্রমাণ সাইজের শিবলিঙ্গ — কষ্টিপাথরের তৈরি, ওজন প্রায় ২৫ মণ (প্রায় এক টন); এটিকে উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ শিবলিঙ্গ বলে জনশ্রুতি আছে (ভ্রমণগুরু/দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট)। ইট-সুরকির নিখুঁত গাঁথুনিতে তৈরি সুউচ্চ ১১টি মঠ কালের সাক্ষী হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে (ভ্রমণগুরু)। লক্ষ্মীপুরের দালাল বাজার জমিদার বাড়ির মতোই এখানকার গল্পও গৌরব আর ক্ষয়ের — অবহেলা ও সংরক্ষণের উদ্যোগের অভাবে মূল রাজবাড়ির অধিকাংশ ভবন আজ ধ্বংসের পথে; বর্তমানে ভালো-ধ্বংসপ্রাপ্ত মিলিয়ে মাত্র গুটিকয়েক (সাতটির মতো) প্রাচীন ভবন টিকে আছে (ভ্রমণগাইড/ভ্রমণগুরু)। পাশে তৈরি হয়েছে নতুন মন্দির, যেখানে এখনো পূজা-অর্চনা হয় (এশিয়ান এজ)।
বাঘের খাঁচার কিংবদন্তি
রায়েরকাঠিকে ঘিরে একটি বিখ্যাত জনশ্রুতি আছে — ইতিহাস হিসেবে নয়, লোককাহিনি হিসেবেই এটি শুনতে হয়। বাংলা উইকিপিডিয়ায় সংরক্ষিত এই কাহিনি অনুযায়ী, কালী মন্দির নির্মাণ নিয়ে রুদ্র নারায়ণের নিষ্ঠুরতার খবর ঢাকার প্রাদেশিক সুবেদার শাহবাজ খানের কানে গেলে তিনি তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন — শাস্তি ছিল বাঘের খাঁচায় ঢুকিয়ে দেওয়া। কিন্তু রুদ্র নারায়ণ খাঁচার ভেতরে বাঘের সঙ্গে লড়ে বাঘটিকে মেরে ফেলেন; এই বীরত্বে সন্তুষ্ট হয়ে সুবেদার তাঁর মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করে দেন (বাংলা উইকিপিডিয়া)। কাহিনির সত্য-মিথ্যা যাচাই করা সম্ভব নয়, তবে সাড়ে তিনশো বছর ধরে মুখে মুখে ফেরা এই গল্পটাই বলে দেয়, রায়েরকাঠির রাজারা স্থানীয় স্মৃতিতে কতটা জায়গা করে নিয়েছিলেন।
কীভাবে যাবেন ও টিপস
পিরোজপুর জেলা শহর থেকে অটোরিকশা/রিকশায় রায়েরকাঠি — দূরত্ব প্রায় ৩ কিলোমিটার, পুলিশ লাইন পেরিয়ে কিছুটা এগোলেই প্রথমে কালী মন্দির ও মঠগুলো, আরও অল্প সামনে রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ (ভ্রমণগুরু)। এলাকাটি জনবসতির মধ্যে — ভবনগুলোর বেশিরভাগই জরাজীর্ণ, তাই ভেতরে ঢোকার বদলে বাইরে থেকে দেখাই নিরাপদ; দেয়ালে ওঠা বা ভঙ্গুর অংশে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন। মন্দির এলাকায় গেলে স্থানীয় পূজা-অনুষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা করুন। পিরোজপুর শহরে থাকা-খাওয়ার সাধারণ ব্যবস্থা আছে; রায়েরকাঠি ভ্রমণ পিরোজপুর-কেন্দ্রিক একদিনের সফরেই সাজানো যায়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
রায়েরকাঠি জমিদার বাড়ি কোথায়?
পিরোজপুর সদর উপজেলার রায়েরকাঠি গ্রামে, জেলা শহর থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার উত্তরে (ভ্রমণগাইড)।
বাড়িটি কে, কবে প্রতিষ্ঠা করেন?
সেলিমাবাদ পরগণার রায় পরিবারের রুদ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝিতে জঙ্গল পরিষ্কার করে রাজবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন; কালী মন্দির নির্মিত হয় ১৬৫৮ সালে (বরিশালপিডিয়া/ভ্রমণগাইড)।
শিবলিঙ্গটির বিশেষত্ব কী?
কষ্টিপাথরের লিঙ্গটির ওজন প্রায় ২৫ মণ (প্রায় এক টন) — এটিকে উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় শিবলিঙ্গ বলে জনশ্রুতি আছে (ভ্রমণগুরু/দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট)।
এখন কী কী টিকে আছে?
গুটিকয়েক জরাজীর্ণ ভবন, ১১টি মঠ ও মন্দিরসমূহ — অধিকাংশ ভবন সংরক্ষণের অভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত (ভ্রমণগাইড/ভ্রমণগুরু)।
নাম "রায়েরকাঠি" কেন?
প্রচলিত ব্যাখ্যা — রায় পরিবার জঙ্গল কেটে (কাঠি) বসতি ও রাজবাড়ি গড়েছিল বলেই এই নাম (ভ্রমণগাইড)।
শেষকথা
রায়েরকাঠি আজ ভ্রমণের চেয়ে ইতিহাস-অনুভূতির জায়গা বেশি — ভেঙে পড়া প্রাসাদের ফাঁকে দাঁড়ানো মঠগুলো বলে দেয়, সেলিমাবাদের রাজাদের প্রভাব একসময় কতদূর বিস্তৃত ছিল। সংরক্ষণের হাত পড়লে এই সাড়ে তিনশো বছরের সম্পদ দক্ষিণের অন্যতম বড় ঐতিহ্য-গন্তব্য হতে পারত; তার আগ পর্যন্ত এটা ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য এক নীরব, মূল্যবান গন্তব্য।