পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি (নেছারাবাদ) উপজেলার আটঘর-কুড়িয়ানা — এই নামটি দেশের ফলপ্রেমীদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। দেশের সবচেয়ে বিখ্যাত পেয়ারার জাত "স্বরূপকাঠি"-র জন্ম এই মাটিতেই, আর ভিমরুলির ভাসমান হাটের পেয়ারার বেশিরভাগই আসে এই অঞ্চলের বাগান থেকে। তবে হাট ছাড়াও এখানে আছে আরেক অভিজ্ঞতা — খাল আর পরিখা বেয়ে নৌকায় ভেসে চলা, দুই পাশে যতদূর চোখ যায় শুধু পেয়ারা আর আমড়ার বাগান।
গয়া থেকে গইয়া: স্বরূপকাঠি জাতের জন্মকথা
কুড়িয়ানা এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠ কৃষকদের বর্ণনা অনুযায়ী, আনুমানিক ১২৫০ বঙ্গাব্দে আটঘর-কুড়িয়ানা গ্রামের পূর্ণচন্দ্র মণ্ডল তীর্থভ্রমণে গিয়ে ভারতের গয়াধাম থেকে কিছু পরিপক্ব পেয়ারা সঙ্গে করে এনেছিলেন; সেই পেয়ারার বীজ থেকে জন্মানো গাছের ফলের স্বাদ, গন্ধ, আকার ও ফলন স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠলে কালক্রমে চারদিকে বাগান আকারে চাষ ছড়িয়ে পড়ে (সানবিডি২৪)। গয়া থেকে এসেছে বলে ফলটি প্রথমে "গয়া" বা "গইয়া" নামে পরিচিত ছিল, পরে জাতটি "স্বরূপকাঠি" নামে বিখ্যাত হয় — একসময় পূর্ণচন্দ্র মণ্ডলের নামে "পূর্ণমণ্ডলীয়" নামেও ডাকা হতো (একই সূত্র)। স্বাদের জন্য এই পেয়ারাকে অনেকে বলেন "বাংলার আপেল"। যুগান্তরের প্রতিবেদনে জানা যায়, আটঘর-কুড়িয়ানাসহ বানারীপাড়া, স্বরূপকাঠি ও ঝালকাঠি সদরের প্রায় ৩৪টি গ্রামে এখন পেয়ারা চাষ হয়, বিশ সহস্রাধিক (২০ হাজারের বেশি) মানুষ এই চাষে জড়িত, আর এলাকায় এমন বাগানও আছে যার বয়স দুইশো বছর পেরিয়ে গেছে (যুগান্তর)। দুঃখের বিষয় — এলাকায় সংরক্ষণাগার (কোল্ড স্টোরেজ) না থাকায় প্রতি মৌসুমে পেয়ারার বড় অংশ পচে নষ্ট হয় বলেও জানান চাষিরা (যুগান্তর)।
নৌভ্রমণ: কুড়িয়ানা বাজার থেকে পেয়ারা পার্ক
এই অঞ্চল ঘোরার সেরা মাধ্যম নৌকা বা ট্রলার। প্রথম আলোর ভ্রমণ-প্রতিবেদন অনুযায়ী রুটটি এমন: পিরোজপুর থেকে নেছারাবাদ উপজেলা সদর হয়ে সড়কপথে কুড়িয়ানা বাজার — সেখানে ভ্রমণের জন্য ট্রলার ও নৌকা ভাড়া পাওয়া যায়। ট্রলার ছাড়ে আটঘর-কুড়িয়ানা খাল ধরে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ডিগ্রি কলেজের পাশ দিয়ে ঢোকে কুড়িয়ানা-আদমকাঠি ভাড়ানি খালে; মিনিট দশেক চলার পর আদমকাঠি বাজার খালে পৌঁছলেই চোখে পড়ে ভাসমান পেয়ারা পার্ক — ঘাটে ভিড়ে ৩০ টাকার টিকিট কেটে পার্কে ঢুকে বাগানে ঘোরা, গাছ থেকে পেয়ারা পেড়ে খাওয়া যায়; ভেতরে খাবারের দোকান ও রেস্তোরাঁও আছে (প্রথম আলো)। আধা কিলোমিটার এগোলেই রিয়ান পেয়ারা পার্ক, পাশে কটুরাকাঠি ন্যাচারাল ট্যুরিজম অ্যান্ড পিকনিক স্পট — পার্কগুলোতে ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে, যেখান থেকে বাগান-খালের সবুজ প্যানোরামা দেখা যায় (একই সূত্র)। একই ট্রলারে একটানা গেলে ভাড়ানি খাল ধরে পৌঁছে যাওয়া যায় ভিমরুলি বাজার পর্যন্ত — তাই পার্ক আর হাট মিলিয়ে অর্ধেক দিনের একটি পূর্ণাঙ্গ নৌ-সফর সাজানো যায়। টিকিটের দাম ও পার্কের নিয়ম বদলাতে পারে — ঘাটে ওঠার আগে নিশ্চিত হয়ে নিন।
দ্বিতীয় মৌসুম: পেয়ারা শেষে আমড়া
আটঘর-কুড়িয়ানার গল্প শুধু পেয়ারাতেই শেষ নয়। বাংলা ট্রিবিউনের সাম্প্রতিক (অক্টোবর ২০২৬) প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেয়ারার মৌসুম পেরোলেই বর্ষা ও শরতের সন্ধিক্ষণে জনপদটি বদলে যায় আমড়ার মৌসুমে — সারি সারি আমড়া গাছ, খালের স্বচ্ছ পানি, আর নৌকায় ভেসে চলা ফলের বেচাকেনা তখনো চলতে থাকে; ভাসমান হাটেও বাড়ে আমড়ার উপস্থিতি। অর্থাৎ পেয়ারার ভিড় এড়িয়ে শরতের শান্ত নৌভ্রমণ চাইলে এই দ্বিতীয় মৌসুমটাই হতে পারে আদর্শ সময় (বাংলা ট্রিবিউন)। যশোরের গদখালীতে ফুলচাষ যেমন কৃষিকে পর্যটনে বদলে দিয়েছে, আটঘর-কুড়িয়ানার পেয়ারা-আমড়া বাগানও দক্ষিণে সেই ধারার অন্যতম সফল উদাহরণ।
কীভাবে যাবেন ও টিপস
পিরোজপুর জেলা শহর থেকে নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) উপজেলা সদর হয়ে সড়কপথে কুড়িয়ানা বাজার (প্রথম আলো); ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে বাসে পিরোজপুর, অথবা রাতের লঞ্চে বরিশাল এসে সড়ক/নৌপথে। কুড়িয়ানা বাজার ঘাট (বা ভিমরুলি) থেকে ট্রলার/নৌকা রিজার্ভ করে বাগান-পার্ক ভ্রমণ — ভাড়া সময় ও দূরত্ব অনুযায়ী দরদাম করে ঠিক করুন। টিপস: পেয়ারার জন্য যান জুলাই–আগস্টে, আমড়া ও শান্ত পরিবেশের জন্য সেপ্টেম্বর–অক্টোবরে; বাগানে ঢুকলে অনুমতি ছাড়া গাছের ফল পাড়বেন না (পার্কের ভেতরে খাওয়ার নিয়ম সেখানকার নিয়মেই চলবে); জলপথের সফর বলে আবহাওয়া দেখে রওনা হোন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
স্বরূপকাঠি জাতের পেয়ারার উৎপত্তি কোথায়?
কিংবদন্তি ও বয়োজ্যেষ্ঠ কৃষকদের বর্ণনা অনুযায়ী কুড়িয়ানার পূর্ণচন্দ্র মণ্ডল আনুমানিক ১২৫০ বঙ্গাব্দে গয়া থেকে আনা পেয়ারার বীজ থেকে এই জাতের চাষ শুরু করেন (সানবিডি২৪)।
বাগান এলাকাটা কত বড়?
প্রায় ৩৪টি গ্রামজুড়ে পেয়ারা চাষ হয়, ২০ হাজারের বেশি মানুষ জড়িত; কিছু বাগানের বয়স ২০০ বছরের বেশি (যুগান্তর)।
পেয়ারা পার্কে কী পাওয়া যায়?
খালের ধারে ভাসমান পার্কে বাগানে ঘোরা, গাছ থেকে পেয়ারা পেড়ে খাওয়া, খাবারের ব্যবস্থা ও ওয়াচ টাওয়ার; প্রবেশ টিকিট ৩০ টাকা ছিল (প্রথম আলো) — বর্তমান দাম ঘাটে যাচাই করুন।
পেয়ারা মৌসুম ছাড়া গেলে কী দেখব?
শরতে আমড়ার মৌসুম — ভাসমান হাটে আমড়ার বেচাকেনা আর শান্ত খালে নৌভ্রমণ উপভোগ করা যায় (বাংলা ট্রিবিউন)।
কীভাবে যাব?
পিরোজপুর থেকে সড়কে কুড়িয়ানা বাজার; সেখানকার ঘাট থেকে ট্রলার/নৌকা ভাড়া করে খাল বেয়ে পার্ক ও বাগান ঘোরা যায় (প্রথম আলো)।
শেষকথা
একটি তীর্থযাত্রীর হাতে আসা কয়েকটি পেয়ারার বীজ থেকে গড়ে ওঠা দুইশ বছরের বাগান-সভ্যতা — আটঘর-কুড়িয়ানা সেই বিরল গল্পের জীবন্ত ঠিকানা। খালের বুকে ভেসে চলা নৌকা থেকে সারিবদ্ধ বাগানের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, কেন এই পেয়ারাকে মানুষ ভালোবেসে ডাকে "বাংলার আপেল"।