• 30 Oct, 2026

সাতক্ষীরার কলারোয়ার সীমান্তঘেঁষা গ্রামে ১৭৬৭ সালের ত্রিতল নবরত্ন শ্যামসুন্দর মন্দির — সোনাবাড়িয়া মঠবাড়ি গুচ্ছের ইতিহাস, রামকৃষ্ণ-জনশ্রুতি, ধ্বংসমুখী বর্তমান অবস্থা এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নতুন সংস্কার-উদ্যোগসহ পূর্ণ গাইড।

সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলার সীমান্তঘেঁষা সোনাবাড়িয়া গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে খুলনা বিভাগের অন্যতম সুন্দর ও আজ সবচেয়ে বিপন্ন মন্দিরস্থাপত্য — শ্যামসুন্দর নবরত্ন মন্দির, যা সবার মুখে "সোনাবাড়িয়া মঠ" বা "মঠবাড়ি"। প্রায় ৬০ ফুট উঁচু এই ত্রিতল মন্দিরকে ঘিরে দুর্গা ও শিবের আরও দুটি মন্দির আর একটি প্রাচীন দীঘি — সব মিলে একটি মন্দির-নগরীর অবশেষ। সাতক্ষীরা শহর থেকে দিনের সফরেই এখানে আসা যায়, আর এটি এই জেলার টেরাকোটা-যাত্রার শেষ অধ্যায়।

ইতিহাস: ১৭৬৭, দুই নামের নির্মাতা

মন্দিরের দেয়ালের শিলালিপিতে এর নাম লেখা "শ্যামসুন্দর নবরত্ন মন্দির"। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বৃহত্তর খুলনা জরিপ প্রতিবেদন (সাবেক উপ-পরিচালক মো. মোশারফ হোসেনের গ্রন্থ) এবং সতীশ চন্দ্র মিত্রের ইতিহাস-গ্রন্থ অনুযায়ী মন্দিরটি নির্মিত হয় ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে — নির্মাতা হরিরাম দাস, মতান্তরে দুর্গাপ্রিয় দাস। একটি সতর্কতা: কোনো কোনো ভ্রমণ-লেখায় মন্দিরটিকে "প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো" বলা হয় — নথিভুক্ত নির্মাণ সাল ১৭৬৭ ধরলে বয়স আড়াই শতকের কিছু বেশি; প্রথম আলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও বয়স বলা হয়েছে আড়াই শ বছর। জনশ্রুতি অনুযায়ী এককালে এই প্রাঙ্গণে আরও প্রায় নয়টি মন্দির ছিল; মঠবাড়ি-বিষয়ক সংকলনে এমন উল্লেখও আছে যে স্থানটি এক সময় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয় হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। প্রাঙ্গণের দক্ষিণে বিষমবাহু আকৃতির চৌকো দীঘিটি এখনো সেই যুগের জল-ব্যবস্থার সাক্ষী।

গড়ন: তিন তলা, নয় রত্ন

পিরামিড-আকৃতির ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া কাঠামোটিই নবরত্ন শৈলীর প্রাণ। নিচতলার ভেতরের অংশ চার ভাগে বিভক্ত, চারপাশে ঘূর্ণায়মান টানা অলিন্দ; দ্বিতীয় তলায় মূল মণ্ডপ; তৃতীয় তলায় কোঠা ও প্রকোষ্ঠ। পূর্ব পাশের অলিন্দ থেকে ওঠা ইটের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে যাওয়া যায়। ছাদে ক্রমান্বয়ে ঊর্ধ্বমুখী ছোট-বড় গম্বুজের মাঝখানে প্রধান বড় "রত্ন" — এই নয়টি চূড়ার (রত্নের) জন্যই "নবরত্ন" নাম। গায়ে টেরাকোটার ফলক ও অলংকরণ — যার অনেকটাই এখন ক্ষয়ে মলিন। সঙ্গের দুর্গা মন্দির ও শিব মন্দির মিলিয়ে গুচ্ছটি এ অঞ্চলের মধ্যযুগ-উত্তর ধর্মীয় স্থাপত্যের বিরল পূর্ণাঙ্গ উদাহরণ — ছয়ঘরিয়ার জোড়া শিবমন্দিরের টেরাকোটার সঙ্গে একই ভ্রমণে তুলনা করে দেখা যায় সাতক্ষীরার দুই যুগের দুই ধারা।

কিংবদন্তির স্তর: এক রাতের মন্দির ও রামকৃষ্ণ

লোকমুখে গল্প আছে, মন্দিরটি নাকি তৈরি হয়েছিল এক রাতেই — প্রথম আলোর প্রতিবেদনের শিরোনামেও এসেছে এই প্রচলন। আরেক জনশ্রুতি বলে, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এক সময় এই শ্যামসুন্দর মন্দিরে প্রায় দুই মাস অবস্থান করেছিলেন। দুটোই জনশ্রুতি — প্রমাণিত ইতিহাস নয়; কিন্তু একটি গ্রামীণ মন্দিরকে ঘিরে এমন কিংবদন্তির ঘনত্বই বলে দেয়, বহু প্রজন্ম ধরে জায়গাটি মানুষের কল্পনায় কতটা বড় হয়ে ছিল।

বর্তমান অবস্থা: সৎ ছবিটা

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সরেজমিনে গিয়ে প্রথম আলোর প্রতিবেদক যা দেখেছেন, তা মর্মান্তিক: পুরনো ইটের গায়ে টেরাকোটা কোথাও ক্ষয়ে গেছে, কোথাও শেওলা; দেয়ালের আস্তরণ খসে পড়ছে; ইটের সিঁড়ি ক্ষয়ে যাওয়ায় ওপরে উঠতে প্রতিটি ধাপে সাবধানতা লাগে; দেয়াল বেয়ে নেমে এসেছে গাছের শিকড়; কোনো সীমানাপ্রাচীর নেই; ভেতরে ঢুকতে হয় মুঠোফোনের আলো জ্বালিয়ে, মেঝেয় ছড়ানো খসে পড়া ইট-বালু। অর্থাৎ মন্দিরটি এখন একটি সক্রিয় উপাসনালয়ের চেয়ে অবহেলিত পুরাকীর্তি — দর্শনে গেলে এই বাস্তবতা মেনেই যান, এবং ভঙ্গুর সিঁড়ি-কাঠামোর ওপর ওঠার ক্ষেত্রে নিজের নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিন।

সুখবর: সংস্কারের উদ্যোগ শুরু হয়েছে

তবে ২০২৬ সালেই আসে আশার খবরও। ধারাবাহিক গণমাধ্যম-প্রতিবেদনের পর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মন্দিরটির পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে — ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী অধিদপ্তরের খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের দল স্থানটি পরিদর্শন করে কাঠামো, কার্নিশ ও টেরাকোটার ক্ষয় পরীক্ষা করেছে; প্রাথমিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ শেষ হয়েছে; আঞ্চলিক পরিচালক জানিয়েছেন, মূল সংস্কারের আগে বৈজ্ঞানিক ডকুমেন্টেশন (স্থাপত্য নকশা, পরিমাপ, তথ্য সংগ্রহ) করা হবে যাতে মূল রূপের ক্ষতি না হয়, এবং স্থায়ী সংরক্ষণের জন্য পরের অর্থবছরে বরাদ্দ চাওয়া হবে। গেজেটভুক্ত এই নিদর্শনটির ভাগ্য বদলাতে শুরু করেছে কিনা, তা আগামী বছরগুলোতে গেলেই বোঝা যাবে — ভ্রমণকারীরা পর্যবেক্ষক হিসেবে ফিরে গিয়ে প্রতিবেদন করলেও তা সংরক্ষণের পক্ষে চাপ তৈরি করে।

কীভাবে যাবেন

সোনাবাড়িয়া সাতক্ষীরা শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার; কলারোয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৭–১০ কিলোমিটার। সাতক্ষীরা থেকে কলারোয়াগামী বাসে এসে সেখান থেকে ভ্যান/ইজিবাইকে গ্রামে ঢুকতে হয় — গ্রামটি ভারত সীমান্তের কাছাকাছি, পথে সীমান্ত-এলাকার স্বাভাবিক সতর্কতা (পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখা) মেনে চলুন। কলারোয়া নিজে ছোট উপজেলা শহর — থাকা-খাওয়ার নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা সাতক্ষীরা শহরেই। গাইড ছাড়াই ঘোরা যায়, তবে স্থানীয় কাউকে সঙ্গে নিলে মন্দিরগুচ্ছের বিভিন্ন অংশ চেনা সহজ হয়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

সোনাবাড়িয়া মঠ আসলে কী?

কলারোয়ার সোনাবাড়িয়া গ্রামের মন্দিরগুচ্ছ — কেন্দ্রে ১৭৬৭ সালের ত্রিতল শ্যামসুন্দর নবরত্ন মন্দির (~৬০ ফুট), পাশে দুর্গা ও শিব মন্দির এবং প্রাচীন দীঘি।

মন্দিরটি কত বছরের পুরনো?

নথিভুক্ত নির্মাণ সাল ১৭৬৭ — অর্থাৎ আড়াই শতকের বেশি। কোনো কোনো লেখায় ৪০০ বছরের দাবি থাকলেও জরিপ প্রতিবেদন ও ইতিহাস-গ্রন্থে ১৭৬৭-ই নথিবদ্ধ।

ভেতরে ও ওপরে ওঠা যায় কি?

যায়, তবে সিঁড়ি ও কাঠামো ক্ষয়প্রাপ্ত — সর্বোচ্চ সতর্কতা জরুরি; ভেতর অন্ধকার, আলো সঙ্গে রাখুন। সংস্কারকাজ শুরু হলে প্রবেশ সাময়িকভাবে সীমিত হতে পারে।

মন্দিরটি কি এখন সংস্কার হচ্ছে?

প্রস্তুতি পর্যায়ে: প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর পরিদর্শন ও প্রাথমিক পরিষ্কার করেছে, বৈজ্ঞানিক ডকুমেন্টেশনের পর মূল সংস্কার শুরু হবে বলে আঞ্চলিক কার্যালয় জানিয়েছে (২০২৬ সালের প্রতিবেদন)।

এটি দেখতে কত সময় লাগবে?

মন্দিরগুচ্ছ ও দীঘি ঘুরতে ১–২ ঘণ্টা; সাতক্ষীরা শহর থেকে যাতায়াতসহ আধা দিনের সফর।

শেষকথা

সোনাবাড়িয়া বাংলাদেশি ঐতিহ্যের একটি পরিচিত প্যারাডক্স: গেজেটে তালিকাভুক্ত, গবেষকে প্রশংসিত — অথচ দশকের পর দশক অরক্ষিত। এখন যখন সংস্কারের চাকা ঘুরতে শুরু করেছে, তখন ভ্রমণকারীর ভূমিকা দ্বিগুণ: সাক্ষী হওয়া এবং যত্ন করে দেখা। কলারোয়ার এই নবরত্ন মন্দির টিকে গেলে তা হবে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার স্থাপত্য-ইতিহাসের অন্যতম বড় জয়।