• 30 Oct, 2026

তালার তেঁতুলিয়া জামে মসজিদ (১৮৫৮–৫৯, ছয় গম্বুজ, কলকাতার নকশার অনুকরণ) ও ধ্বংসপ্রায় সালাম মঞ্জিল; সাতক্ষীরা সদরের কাছে ১৮১৩ সালের ছয়ঘরিয়া জোড়া শিবমন্দিরের অপরূপ টেরাকোটা — দুই ঐতিহ্য-গন্তব্যের পূর্ণ গাইড।

সাতক্ষীরা জেলার পরিচিতি সুন্দরবন আর চিংড়িতে আটকে থাকলেও, জেলার ভেতরের দিকে ছড়িয়ে আছে ঊনবিংশ শতাব্দীর জমিদারি যুগের অসাধারণ দুটি স্থাপত্য — একটি মসজিদ, একটি মন্দিরযুগল — দুটোরই গায়ে ইটের ওপর হাতে গড়া শিল্পের ছাপ। এই পোস্টে সেই দুটি গন্তব্য: তালার তেঁতুলিয়া জামে মসজিদ ও সাতক্ষীরা সদরের উপকণ্ঠে ছয়ঘরিয়া জোড়া শিবমন্দির। দুটোই সাতক্ষীরা শহর থেকে দিন-ভ্রমণে ঘোরা যায়।

তেঁতুলিয়া জামে মসজিদ: কলকাতার নকশা গ্রামে

তালা উপজেলা সদর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে তেঁতুলিয়া গ্রামে এই ছয় গম্বুজের মসজিদ — স্থানীয়ভাবে "মিয়ার মসজিদ" নামেও পরিচিত। প্রতিষ্ঠাতা তেঁতুলিয়ার জমিদার কাজী পরিবারের খান বাহাদুর মৌলভী কাজী সালামতউল্লাহ খান; মসজিদের গায়ের শিলালিপি অনুযায়ী নির্মাণ ১৮৫৮–৫৯ খ্রিস্টাব্দে (১২৭০ বঙ্গাব্দ), কলকাতার "সিন্দুরে পট্টি" মসজিদের নকশার অনুকরণে। মুঘল শৈলীর এই স্থাপনা দেখতে টিপু সুলতানের বংশধরদের আমলের স্থাপত্যধারার সঙ্গে মেলে বলে গবেষকদের পর্যবেক্ষণে এসেছে। গড়নের বিবরণ: ১২টি স্তম্ভের ওপর চুন-সুরকি ও চিটাগুড়ের গাঁথুনি; সাতটি দরজা (প্রায় ৯ ফুট উঁচু); ছাদে ছয়টি গম্বুজ ও একাধিক সুউচ্চ মিনার; ভেতর-বাইরে মিলিয়ে পাঁচ শতাধিক মুসল্লির ধারণক্ষমতা। ১৯৮৭ সাল থেকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটির রক্ষণাবেক্ষণ করছে — এটি জমিদারের ক্ষমতা-প্রদর্শন নয় শুধু, গ্রামীণ বাংলায় ঊনবিংশ শতাব্দীর কারিগরি মানের জীবন্ত দলিল। কাজী পরিবারের পরিচয়ও গুরুত্বপূর্ণ: সালামতউল্লাহর পূর্বপুরুষদের মধ্যে ছিলেন মুঘল সনদপ্রাপ্ত কাজী-উল-কুজ্জাত (প্রধান বিচারপতি) বাকাউল্লাহ খান, আর তাঁর পুত্রবধূ ছিলেন বাঙালি কবি আজিজুন্নেছা খাতুন — অর্থাৎ এই পরিবার ছিল এই অঞ্চলের বিচার, জমিদারি ও সাহিত্যের এক যুগের কেন্দ্র।

পাশেই সালাম মঞ্জিল: ধ্বংসস্তূপে জমিদার বাড়ি

মসজিদের কাছেই সালামতউল্লাহর গড়া জমিদার প্রাসাদ "সালাম মঞ্জিল" — আজ প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত। ১৯৮২ সালের একটি বর্ণনা থেকে এর গৌরবের আভাস মেলে: সম্মুখে নকশাদার "সিংহ দরজা" (প্রধান তোরণ), ভেতরে বিশাল সবুজ প্রাঙ্গণ, দ্বি-স্তম্ভের ওপর দাঁড়ানো দীর্ঘ বারান্দা (প্রত্যন্ত গ্রামে মধ্য-ঊনবিংশ শতাব্দীতে এই দ্বি-স্তম্ভ কাঠামো ছিল বিরল), বারান্দার কোনার কক্ষে রাখা পালকি — যার একটি টানতে লাগত বারো জন বেয়ারা। সিংহ দরজাটি পরবর্তীতে নতুন ধাঁচে পুনর্নির্মিত হয়েছে, কিন্তু মঞ্জিলের বাকি অংশ ধ্বংসাবশেষই। ভ্রমণকারী হিসেবে প্রত্যাশা সেভাবেই রাখুন: এখানে দেখবেন একটি যুগের "ছায়া" — প্রাসাদ নয়। তবে মসজিদ-প্রাসাদ জুটি মিলিয়ে জায়গাটি সাতক্ষীরার জমিদারি ইতিহাস বোঝার সেরা ঠিকানা। (কাছাকাছি "তেঁতুলিয়া শাহী মসজিদ" নামে আরও একটি পুরনো মসজিদের উল্লেখ স্থানীয় গাইডে পাওয়া যায় — সময় থাকলে খোঁজ করে দেখতে পারেন।)

ছয়ঘরিয়া জোড়া শিবমন্দির: জেলার শ্রেষ্ঠ টেরাকোটা

সাতক্ষীরা শহর থেকে মাত্র প্রায় পাঁচ কিলোমিটার উত্তরে ছয়ঘরিয়া গ্রামে (ঝাউডাঙ্গা এলাকা) পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দুটি বর্গাকার মন্দির — প্রতিটি মাপে প্রায় ১৫ ফুট ৯ ইঞ্চি বর্গ। স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী ১২২০ বঙ্গাব্দের পহেলা বৈশাখে (১৮১৩ খ্রিস্টাব্দ) ফকিরচাঁদ ঘোষ মন্দিরযুগলটি প্রতিষ্ঠা করেন। যুগল বলেই নাম "জোড়া শিবমন্দির"। এই মন্দিরের আসল সম্পদ এর গায়ের টেরাকোটা: ফুল, লতাপাতা, পরী, বাদক, অশ্বারোহী, হস্তীরোহী, দেব-দেবীর অজস্র নকশা — জেলা প্রশাসনের সংকলন অনুযায়ী সাতক্ষীরা অঞ্চলের টেরাকোটা কাজের মধ্যে ছয়ঘরিয়ার কাজই শ্রেষ্ঠ বলে গণ্য। মন্দিরটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা হিসেবে তালিকাভুক্ত; সৎ বিবরণ হলো — বর্তমানে মন্দির দুটি মূলত পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে, নিয়মিত পুজো-অর্চনার জমজমাট নেই বললেই চলে। কিন্তু টেরাকোটা-প্রেমী ও স্থাপত্য-অনুরাগীদের জন্য পরিত্যক্ত এই যুগল আজও দেশি-বিদেশি পর্যটক টানে — শহর থেকে এত কাছে এমন নিদর্শন পাওয়া দুষ্কর। (খেয়াল রাখুন: খুলনা শহরেও একটি "জোড়া শিবমন্দির" আছে — সেটি আলাদা স্থাপনা, এটির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না।)

টেরাকোটা শুধু নকশা নয়, যুগের দলিল

ছয়ঘরিয়ার টেরাকোটা ভালো করে দেখলে বোঝা যায়, গ্রামের কারিগরেরা শুধু ধর্মীয় মূর্তি গড়েননি — গেয়েছেন নিজের যুগের ছবিও: বাদকের বাদ্য, ঘোড়সওয়ার ও হাতিসওয়ারের শোভাযাত্রা, পরীর রূপকথা, ফুল-লতার প্রকৃতি। অর্থাৎ এই দুটি মন্দিরের দেয়াল ঊনবিংশ শতাব্দীর গ্রামবাংলার সামাজিক জীবনের এক টুকরো চিত্র-ইতিহাস। পরিত্যক্ত বলে সংরক্ষণের চাপ কম — কিন্তু আবহাওয়ার ক্ষয় প্রতিদিন চলছে; যাঁরা দেখতে যাবেন, তাঁদের ছবি আর আগ্রহই এমন নিদর্শনের ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখার সামাজিক চাপ তৈরি করে।

দুটি মিলিয়ে একটি দিনের রুট

পরিকল্পনাটি সাজানো যায় এভাবে: সাতক্ষীরা শহরে সকালের নাস্তা সেরে প্রথমে ছয়ঘরিয়া (শহর থেকে মাত্র ~৫ কিমি — রিকশা/ভ্যানেই যাওয়া যায়); তারপর বাস বা ভাড়া গাড়িতে তালা হয়ে তেঁতুলিয়া (তালা সদর থেকে ~৩ কিমি)। সময় বাঁচলে ফেরার পথে কালীগঞ্জের নলতা শরীফ পর্যন্ত বৃত্তটি বাড়ানো যায় — তিনটি মিলে সাতক্ষীরার উত্তর-মধ্যাঞ্চলের একটি পূর্ণাঙ্গ ঐতিহ্য-দিন। দুটি স্থানেই খাওয়া-থাকার ব্যবস্থা সীমিত — শহরই ভরসা; তবে শহরে ফিরে এই জেলার নিজস্ব স্বাদ নিতে ভুলবেন না: কপোতাক্ষ-শিবসা-খোলপেটুয়ার বর্ষার ইলিশ, ঘেরের বাগদা চিংড়ি, আর গরমের দিনে স্থানীয় ঐতিহ্য দুধের ঘোল (টক দই-পানি-লবণের সরল পানীয়) — এই ত্রয়ী সাতক্ষীরার রান্নাঘরের পরিচয়। মসজিদে যাওয়ার ক্ষেত্রে নামাজের সময় ও শিষ্টাচার মাথায় রাখুন; টেরাকোটার গায়ে হাত দেওয়া বা ওঠা থেকে বিরত থাকুন — এই ভঙ্গুর শিল্পকর্মের স্থায়িত্ব আমাদের সবার যত্নে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

তেঁতুলিয়া জামে মসজিদ কে, কবে নির্মাণ করেন?

জমিদার খান বাহাদুর মৌলভী কাজী সালামতউল্লাহ খান, ১৮৫৮–৫৯ সালে — শিলালিপি অনুযায়ী কলকাতার সিন্দুরে পট্টি মসজিদের নকশার অনুকরণে।

সালাম মঞ্জিলে এখন কী দেখা যায়?

মূলত ধ্বংসাবশেষ — পুনর্নির্মিত সিংহ দরজা ও প্রাসাদের ভগ্ন কাঠামো; জমিদারি যুগের আকার কল্পনায় গড়ে নিতে হয়। বাস্তব প্রত্যাশা নিয়ে যান।

জোড়া শিবমন্দির কোথায়, কবের?

সাতক্ষীরা শহর থেকে ~৫ কিমি উত্তরে ছয়ঘরিয়ায়; ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে ফকিরচাঁদ ঘোষের প্রতিষ্ঠা বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ আছে।

মন্দিরে কি এখন পুজো হয়?

মন্দিরযুগল বর্তমানে মূলত পরিত্যক্ত; এখানে আসা হয় প্রধানত টেরাকোটা স্থাপত্য দেখতে।

দুটি স্থান এক দিনে দেখা সম্ভব?

সম্ভব — ছয়ঘরিয়া শহরের কাছে, তেঁতুলিয়া তালায়; সাতক্ষীরা শহরকে ঘাঁটি করে এক দিনেই দুটো ঘোরা যায়।

শেষকথা

তেঁতুলিয়ার মসজিদে মুসলিম জমিদারের কলকাতা-অনুসারী রুচি, ছয়ঘরিয়ার মন্দিরে হিন্দু ভক্তের টেরাকোটা-ভালোবাসা — ঊনবিংশ শতাব্দীর সাতক্ষীরা ছিল এই দুই ধারারই পৃষ্ঠপোষক। সুন্দরবনের ভিড় পেছনে ফেলে যাঁরা জেলার ভেতরের ইতিহাস খুঁজবেন, এই দুটি স্থান তাঁদের হতাশ করবে না।