• 29 Oct, 2026

বাঁশখালী ভ্রমণ গাইড: দেশের দ্বিতীয় দীর্ঘতম সৈকত, ইকো পার্ক ও বেলগাঁও চা বাগান

বাঁশখালী ভ্রমণ গাইড: দেশের দ্বিতীয় দীর্ঘতম সৈকত, ইকো পার্ক ও বেলগাঁও চা বাগান

একই উপজেলায় পাহাড়, চা বাগান আর ৩৭ কিলোমিটার সৈকত — কদমরসুল-খানখানাবাদের নির্জন উপকূল, বাঁশখালী ইকো পার্কের পাহাড়ি লেক ও ঝুলন্ত সেতু এবং বেলগাঁও চা বাগান নিয়ে সম্পূর্ণ ভ্রমণ গাইড।

পাহাড়, সমুদ্র আর চা বাগান — তিনটে একসঙ্গে পেতে সাধারণত তিন জেলায় যেতে হয়। চট্টগ্রামের দক্ষিণের উপজেলা বাঁশখালী সেই বিরল ঠিকানা, যেখানে একদিনেই মেলে তিনটের স্বাদ: পূর্বে পাহাড় আর চা বাগান, মাঝখানে ইকো পার্কের লেক, পশ্চিমে ৩৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকত। শহর থেকে প্রায় ৪০–৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এই উপজেলাটাই আমাদের জেলা-সিরিজের শেষ পর্বের বিষয় — আগের পর্বগুলোর ধারাবাহিকতায় দেখুন সীতাকুণ্ড: একেক মৌসুমে একেক সাজ।

৩৭ কিলোমিটারের সৈকত: কদমরসুল ও খানখানাবাদ

ছনুয়া থেকে গণ্ডামারা, সরল, বাহারছড়া হয়ে খানখানাবাদ — উপকূলজুড়ে প্রায় ৩৭ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁশখালী সৈকত কক্সবাজারের পর দেশের দ্বিতীয় দীর্ঘতম হিসেবে পরিচিত। বেড়িবাঁধ, বালিয়াড়ি আর ঝাউবনে সাজানো এই সৈকতের দুটি প্রধান পয়েন্ট:

  • কদমরসুল: গুনাগরী খাসমহল থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার পশ্চিমে — স্থানীয়ভাবে উপজেলার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন অংশ; ঝাউবনের ছায়া, ভাটায় লাল কাঁকড়া আর নির্জন সূর্যাস্তের জন্য সেরা।
  • খানখানাবাদ: সৈকতের দক্ষিণ প্রান্তের জনপ্রিয় পয়েন্ট; বিকেলে স্থানীয়দের ভিড় জমে।

পাশ দিয়ে কুতুবদিয়া চ্যানেল, ওপারে কুতুবদিয়া দ্বীপের আবছা রেখা। সৈকতে দোকানপাট প্রায় নেই বললেই চলে — খাবার-পানি সঙ্গে নিন, সাঁতারে সতর্ক থাকুন (লাইফগার্ড নেই), আর ফেরার গাড়ি আগেই রিজার্ভ রাখুন। সৈকত থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরেই প্রায় সাড়ে চারশো বছরের পুরনো বখশী হামিদ মসজিদ — সময় থাকলে ঐতিহ্যের এই নিদর্শনটাও দেখে আসুন।

বাঁশখালী ইকো পার্ক: পাহাড়ি লেক আর ঝুলন্ত সেতু

বাঁশখালী সদর থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার পূর্বে, চুনতি অভয়ারণ্যের ধার ঘেঁষে প্রায় ১,২০০ হেক্টর এলাকাজুড়ে এই ইকো পার্ক গড়ে ওঠে ২০০৩ সালের সরকারি প্রকল্পে। পার্কের প্রাণ দীর্ঘ পাহাড়ি লেক — নৌকাভ্রমণ, ভাসমান প্ল্যাটফর্ম আর লেক পেরোনো লম্বা ঝুলন্ত সেতু এখানকার প্রধান আকর্ষণ। সুউচ্চ পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে উঠলে একদিকে সবুজ পাহাড়-সেগুন বাগান, অন্যদিকে দূরে বঙ্গোপসাগরের ঝিলিক — দুটোই এক ফ্রেমে। সঙ্গে মিনি চিড়িয়াখানা, পিকনিক স্পট আর দ্বিতল রেস্ট হাউস। দলবল নিয়ে দিনের আউটিংয়ের জন্য এটি উপজেলার সবচেয়ে সাজানো ঠিকানা।

বেলগাঁও চা বাগান (পুকুরিয়া)

উপজেলার পূর্ব-পাহাড়ি অংশে চাঁদপুর-বেলগাঁও চা বাগান — বাগান কর্তৃপক্ষের হিসাবে ১৯৮৫ সালে প্রায় ৬৪০ একরে শুরু হয়ে এখন আয়তন প্রায় ৮৩৩ একর, বার্ষিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় চার লাখ কেজি। টিলার পর টিলা সবুজ ‘টুপি’ পরে থাকার মতো দৃশ্য; অনুমতি সাপেক্ষে চা প্রক্রিয়াজাতকরণও দেখা যায়। প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থী আসেন — ফটিকছড়ি-রাঙ্গুনিয়ার বাগান দেখা যাঁদের, তাঁদের কাছেও বেলগাঁও আলাদা অভিজ্ঞতা, কারণ এখান থেকে সোজা চলে যাওয়া যায় সৈকতের সূর্যাস্তে। উপকূলের লবণ মাঠ, শুটকি পল্লী আর বাঁশখালীর বিখ্যাত লিচু বাগান (মৌসুমে) পথের বাড়তি পাওয়া।

কীভাবে যাবেন: একদিনের পরিকল্পনা

  • যাতায়াত: বহদ্দারহাট টার্মিনাল/নতুন ব্রিজ এলাকা থেকে বাস বা সিএনজিতে বাঁশখালী-গুনাগরী; স্পটগুলো ছড়ানো বলে সারাদিনের জন্য সিএনজি/গাড়ি রিজার্ভ করাই সবচেয়ে সুবিধাজনক।
  • একদিনের রুট: সকালে বেলগাঁও চা বাগান → দুপুরে ইকো পার্কের লেক-সেতু → বিকেলে কদমরসুল সৈকতে সূর্যাস্ত। এই ক্রমেই পাহাড় থেকে সাগরে নামার পূর্ণ স্বাদ মেলে।
  • থাকা-খাওয়া: বাঁশখালী পৌর এলাকায় সুলভ হোটেল-রেস্তোরাঁ আছে; বেশিরভাগ দর্শনার্থী শহর থেকে দিনে গিয়ে ফেরেন।
  • সেরা সময়: শীতকাল; বর্ষায় চা বাগান সবচেয়ে সবুজ হলেও উপকূলের পথের অবস্থা জেনে নিন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

বাঁশখালী সৈকত কি সত্যিই দেশের দ্বিতীয় দীর্ঘতম?
প্রায় ৩৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য নিয়ে এটি কক্সবাজারের পর দেশের দ্বিতীয় দীর্ঘতম সৈকত হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত — তবে চরিত্রে একদম উল্টো: জমজমাট নয়, নির্জন।

একদিনে তিনটি জায়গাই দেখা সম্ভব?
সম্ভব — চা বাগান, ইকো পার্ক ও সৈকত একই উপজেলায় এবং রিজার্ভ গাড়ি থাকলে সকাল-সন্ধ্যার পরিকল্পনায় তিনটেই হয়ে যায়।

সৈকতে খাবার পাওয়া যায়?
প্রায় না — শুকনো খাবার ও পানি সঙ্গে নেওয়াই নিরাপদ; মূল খাবার বাঁশখালী সদর বা গুনাগরী বাজারে সারুন।

শেষকথা

বাঁশখালী প্রমাণ করে, চট্টগ্রাম জেলার মানচিত্রের দক্ষিণ প্রান্তটা এখনো অনাবিষ্কৃত সম্পদে ভরা — যেখানে সকালটা চায়ের সবুজে আর বিকেলটা সাগরের সূর্যাস্তে কাটে। জেলা সিরিজ এখানেই শেষ হলো; পাহাড়ের টান আবার জাগলে পড়ুন বান্দরবান - মেঘ পাহাড়ের দেশ। আপনার বাঁশখালী ভ্রমণ হোক নিরাপদ ও চমকে ভরা!