দ্বীপ জেলা ভোলার দক্ষিণ প্রান্তের উপজেলা শহর চরফ্যাশনের আকাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত স্থাপনা — প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের আদলে তৈরি ইস্পাতের এক ওয়াচ টাওয়ার, যার চূড়া থেকে এক নজরে দেখা যায় মেঘনা, বঙ্গোপসাগর আর আশেপাশের দ্বীপমালা। নাম তার জ্যাকব টাওয়ার — দক্ষিণের এই ছোট্ট শহরকে পর্যটনের মানচিত্রে তুলে ধরার সবচেয়ে বড় কারণ।
জ্যাকব টাওয়ার: ২২৫ ফুট, ১৬ তলা, একশ বর্গকিলোমিটারের দৃশ্য
ভোলা জেলা শহর থেকে প্রায় ৬০–৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে চরফ্যাশনের কলেজ রোডে, খাসমহল মসজিদের সামনে টাওয়ারটির অবস্থান (বাংলা উইকিপিডিয়া)। উচ্চতা ২২৫ ফুট, মোট ১৬ তলা — এটি বাংলাদেশ ও উপমহাদেশের সবচেয়ে উঁচু ওয়াচ টাওয়ারগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত (বাংলা/ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। প্রতিটি তলায় একসঙ্গে প্রায় ৫০ জন, পুরো টাওয়ারে প্রায় ৫০০ দর্শক অবস্থান করতে পারেন; চূড়ায় ওঠার জন্য রয়েছে ক্যাপসুল লিফট ও সিঁড়ি, আর স্থাপন করা হয়েছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বাইনোকুলার — চারপাশের প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা পর্যবেক্ষণ করা যায় (আরটিভি/উইকিপিডিয়া)। আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে টাওয়ার থেকে দেখা যায় চর কুকরি-মুকরির সংরক্ষিত বন, তারুয়া সৈকত, মনপুরা দ্বীপ, দূরে হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপের দিক আর বঙ্গোপসাগরের বিস্তার (ইংরেজি উইকিপিডিয়া/ঢাকা ট্রিবিউন)।
নির্মাণের গল্প: তোফায়েল আহমেদের দেওয়া নাম
চরফ্যাশন পৌরসভার বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে টাওয়ারটির নির্মাণ শুরু হয় ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে; ব্যয় প্রায় ২০ কোটি টাকা, জমি এক একর (বাংলা উইকিপিডিয়া/আরটিভি)। নকশা করেছেন স্থপতি কামরুজ্জামান লিটন। মাটির প্রায় ৭৫ ফুট নিচ থেকে ঢালাই-পাইলিং ভিত্তির ওপর সম্পূর্ণ ইস্পাত দিয়ে নির্মিত টাওয়ারটি ৮ মাত্রার ভূমিকম্প সহনীয় বলে জানানো হয় (আরটিভি)। শুরুতে টাওয়ারটির এই নাম ছিল না — ২০১৭ সালের মে মাসে নির্মাণাধীন টাওয়ার পরিদর্শনে এসে তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এর নির্মাণশৈলীতে মুগ্ধ হয়ে ভোলা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবের নামে নাম দেন "জ্যাকব টাওয়ার" (বাংলা উইকিপিডিয়া)। উদ্বোধন করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে (দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট/অবজারভার)। উদ্বোধনের সময় পৌরসভার নির্ধারিত প্রবেশমূল্য ছিল ১০০ টাকা (ঢাকা ট্রিবিউন, ২০১৮) — বর্তমান ফি ও খোলার সময় যাওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে জেনে নিন।
বেতুয়া ঘাট ও শহরের বাকি দিন
চরফ্যাশনের আরেক প্রাণকেন্দ্র বেতুয়া লঞ্চঘাট — বেতুয়া নদীর এই ঘাট থেকে মনপুরার জনতা বাজারের উদ্দেশ্যে লঞ্চ চলাচল করে (ভ্রমণট্রিপস); তবে মনে রাখুন, এই রুটটি এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বিপজ্জনক মৌসুম হিসেবে বন্ধ থাকে — মনপুরা গাইডে সে সতর্কতা বিস্তারিত আছে। টাওয়ারের পাশেই খাসমহল জামে মসজিদ ও ফ্যাশন স্কয়ার এলাকা (ইভেন্ডো) — বিকেলে শহরের মানুষের আড্ডার জায়গা। চরফ্যাশন মূলত কৃষি ও মৎস্যজীবী মানুষের শহর; বাজারে মেঘনা-সাগরের তাজা মাছ আর স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়াও এই সফরের অংশ। হাতে সময় থাকলে এখান থেকেই পরের গন্তব্য চর কুকরি-মুকরি — কচ্ছপিয়া ঘাট হয়ে ট্রলারে মেঘনা পেরোনোর সেই পথের বিস্তারিত আমাদের পরের গাইডে।
কীভাবে যাবেন
ঢাকা সদরঘাট থেকে চরফ্যাশনগামী সরাসরি লঞ্চ চলে (উইকিভ্রমণে টিপু/ফারহান লঞ্চের উল্লেখ আছে) — রাতের লঞ্চে সকালে পৌঁছানো যায়। সড়কপথে গেলে ভোলা শহর থেকে বাসে চরফ্যাশন প্রায় ৭৩ কিলোমিটার (উইকিভ্রমণ)। বরিশাল হয়েও ভোলা আসা যায় — সেক্ষেত্রে পায়রা সেতু পেরিয়ে ভোলা শহর, তারপর দক্ষিণের বাস। টাওয়ার দেখতে সকালের পরিষ্কার আলো বা বিকেলের শেষভাগ সবচেয়ে ভালো — কুয়াশা বা মেঘ থাকলে দূরের দ্বীপগুলো ঝাপসা দেখায়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
জ্যাকব টাওয়ার কত উঁচু, কয় তলা?
২২৫ ফুট উঁচু, ১৬ তলা (উইকিপিডিয়া); আইফেল টাওয়ারের আদলে ইস্পাতে নির্মিত, স্থপতি কামরুজ্জামান লিটন।
টাওয়ার থেকে কী কী দেখা যায়?
প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার জুড়ে চর কুকরি-মুকরি, তারুয়া সৈকত, মনপুরা, নিঝুম দ্বীপের দিক ও বঙ্গোপসাগর (ইংরেজি উইকিপিডিয়া) — দিন পরিষ্কার থাকা সাপেক্ষে।
টাওয়ারটির নাম জ্যাকব কেন?
২০১৭ সালে পরিদর্শনে এসে তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ স্থানীয় সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবের নামে নামকরণ করেন (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
চরফ্যাশন কীভাবে যাব?
ঢাকা থেকে সরাসরি লঞ্চে, অথবা ভোলা শহর থেকে বাসে প্রায় ৭৩ কিলোমিটার সড়কপথে (উইকিভ্রমণ)।
প্রবেশমূল্য কত?
উদ্বোধনের সময় (২০১৮) ফি ছিল ১০০ টাকা (ঢাকা ট্রিবিউন); বর্তমান ফি ও সময় যাওয়ার আগে পৌরসভা/স্থানীয়ভাবে জেনে নিন।
শেষকথা
দ্বীপের সমতল সবুজের মাঝে ২২৫ ফুট উঁচু একটা টাওয়ার — ব্যাপারটা প্রথমে খানিকটা অবাক লাগলেও চূড়ায় উঠলেই যুক্তি মিলে যায়: চারদিকে শুধু নদী, চর আর সাগরের অসীম বিস্তার। চরফ্যাশন সফর মানে শুধু টাওয়ার নয়, দ্বীপ-বাংলার দক্ষিণতম জনপদের জীবনটাকে এক নজরে দেখে নেওয়াও।