সুনামগঞ্জের বেশিরভাগ গল্প হাওরের, কিন্তু একটা শহরের গল্প কারখানার — ছাতক। সুরমা নদীর তীরে, মেঘালয় সীমান্তের কাছে এই উপজেলা শহরেই দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের প্রথম ও প্রাচীনতম সিমেন্ট কারখানা, আর তার পাশেই দেশের সবচেয়ে বড় সিমেন্ট প্ল্যান্টে পাথর আসে সীমান্ত পেরিয়ে ১৭ কিলোমিটার লম্বা কনভেয়র বেল্টে। শিল্প-ঐতিহ্যে আগ্রহ থাকলে ছাতক হবে আপনার জন্য অস্বাভাবিক কিন্তু স্মরণীয় এক স্টপ।
ছাতক সিমেন্ট: ১৯৩৭ সালের ঐতিহ্য
- প্রতিষ্ঠা:১৯৩৭ সালে ‘আসাম বেঙ্গল সিমেন্ট কোম্পানি’ নামে বেসরকারি উদ্যোগে, সুরমার তীরে (প্রথম আলো/উইকিপিডিয়া)। তখন থেকে এটি দেশের প্রথম সিমেন্ট কারখানা — বার্ষিক সক্ষমতা ছিল ২.৩৩ লক্ষ মেট্রিক টন। কাঁচামাল চুনাপাথর আসত মেঘালয় থেকে আমদানি করে, পাশাপাশি টেকেরঘাটের নিজস্ব খনি থেকেও — যে খনির পরিত্যক্ত গর্তই আজকের নীলাদ্রি লেক।
- মালিকানা-বদল: ১৯৬৫-এর যুদ্ধের সময় মালিক কারখানা ছেড়ে গেলে ১৯৬৬ সালে এটি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আসে; স্বাধীনতার পর নানা করপোরেশন ঘুরে ১৯৮২ সালের ১ জুলাই থেকে বিসিআইসির অধীনে (উইকিপিডিয়া)।
- আধুনিকায়ন ও স্থবিরতা: ২০১৬ সালে ওয়েট প্রসেস থেকে ড্রাই প্রসেসে রূপান্তরের প্রকল্প নেওয়া হয় — ব্যয় দফায় দফায় বেড়ে ~৬৬৭ কোটি থেকে প্রায় ১,৪০০ কোটি টাকা ছুঁয়েছে (গ্রিনওয়াচ/প্রথম আলো)। কিন্তু ২০২০ সালে ভারত সরকার সরবরাহকারী কমোরাহ লাইমস্টোন (কেএলএমসি)-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলে চুনাপাথর বন্ধ হয়ে যায়; ২০২১ সালের মে মাস থেকে উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ — সর্বশেষ যাচাই করা খবর পর্যন্ত (সুনামগঞ্জের খবর, ~২০২৬-এর শুরু) পুরনো ও নতুন দুই কারখানাই নিষ্ক্রিয়, নতুন রোপওয়ের বাংলাদেশ-অংশ (১১ কিমি) প্রকল্পকালে ভেঙে বিক্রি হয়ে গেছে, ভারত-অংশ (৪.৬ কিমি) অনুমোদনের অভাবে হয়নি (গ্রিনওয়াচ)। যন্ত্রপাতি যাতে নষ্ট না হয়, প্রতি ১৫ দিনে পরীক্ষামূলক চালু করা হয় — কারখানা ‘ঘুমিয়ে’ আছে, মরে যায়নি।
লাফার্জ: সীমান্ত পেরিয়ে আসা পাথর
ছাতকের অন্য প্রান্তে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র — লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট (বর্তমান লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ):
- এটি দেশের সর্ববৃহৎ ও একমাত্র স্বয়ংসম্পূর্ণ (ক্লিংকার-উৎপাদনকারী) সিমেন্ট প্ল্যান্ট (ডেইলি স্টার/পরীক্ষা-সহায়ক গ্রন্থ); চুনাপাথর আসে ভারতের মেঘালয়ের শেল্লা বাজারের খনি থেকে।
- বাহনটি অবিশ্বাস্য: ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তঃসীমান্ত কনভেয়র বেল্ট — ৭ কিমি ভারতের ভেতরে, ১০ কিমি বাংলাদেশে; ২০০৪ সালে চালু, বিশ্বের দীর্ঘতম আন্তঃসীমান্ত কনভেয়রগুলোর একটি (ডেইলি স্টার)। ২০১৮ সালে পুরো বেল্ট বদলানো হয় শব্দদূষণ কমাতে। পাহাড়ি ভূখণ্ড থেকে হাওর-সমতল পর্যন্ত মাটির আকৃতি অনুসরণ করে এগিয়ে যাওয়া এই গ্যালারি-বেষ্টিত বেল্টটি দূর থেকে দেখাই এক দৃশ্য।
- ২০০৬ সালে উৎপাদন শুরু; ব্র্যান্ড ‘সুপারক্রিট’ (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)। দুই সরকারের চুক্তির ভিত্তিতে গড়া এই উদ্যোগকে বলা হয় ভারত-বাংলাদেশের একমাত্র আন্তঃসীমান্ত শিল্প উদ্যোগ; ছাতকের প্রায় ৫,০০০ মানুষ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে এর ওপর নির্ভরশীল (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)।
পর্যটক হিসেবে কী দেখবেন — সৎ প্রত্যাশা
সোজা কথাটা আগে: দুটি কারখানাই শিল্পপ্রতিষ্ঠান — সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য ভেতরে ভ্রমণের ব্যবস্থা নেই, অনুমতি ছাড়া প্রাঙ্গণে ঢোকা যায় না। ছাতকের ‘দর্শন’ তাই বাইরে থেকে:
- সুরমা নদীর পাড় থেকে কারখানা-দুটোর স্কাইলাইন — ভোরে ও সন্ধ্যায় নদীর সঙ্গে শিল্পের এই যুগলবন্দীই ছাতকের সিগনেচার ফ্রেম।
- কনভেয়র বেল্টের লাইন — মেঘালয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়া দীর্ঘ গ্যালারি-কাঠামোটি ছাতকের আশপাশে বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে চোখে পড়ে; প্রকৌতূহলীদের জন্য এটাই প্রধান আকর্ষণ।
- শহরের বাজার ও নদীঘাটের জীবন — নদীবন্দর-ঘেঁষা বাণিজ্যিক শহরের ছন্দ; প্রথম আলো তাদের জেলা-পর্যটন তালিকায় দুই কারখানাকেই ‘শিল্পবিষয়ক পর্যটন’ স্থান হিসেবে রেখেছে।
- যাত্রাপথে: ছাতক পড়ে সিলেট (৩২ কিমি) ও সুনামগঞ্জ শহরের মাঝপথে — হাওর-যাত্রা বা ফেরার পথে আধা দিনের বিরতি হিসেবে সবচেয়ে যুক্তিসংগত।
যাওয়া ও থাকা
সিলেট থেকে বাস/গাড়িতে ~১ ঘণ্টা (৩২ কিমি); সুনামগঞ্জ শহর থেকেও সড়কপথে সরাসরি যাওয়া যায়। ছাতকে সাধারণ মানের হোটেল-খাবারের ব্যবস্থা আছে, তবে রাত কাটানোর জন্য বেশিরভাগ ভ্রমণকারী সিলেট বা সুনামগঞ্জকেই বেছে নেন। ছবি তোলার ক্ষেত্রে কারখানা-এলাকার নিরাপত্তা-নির্দেশনা মেনে চলুন — গেটের সামনে ছবি তুলতে গেলে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়াই ভদ্রতা।
নমুনা সূচি (যাত্রাবিরতি হিসেবে)
- সকাল: সিলেট থেকে ছাতক; সুরমা ঘাটে হাঁটা ও কারখানা-স্কাইলাইন।
- দুপুর: শহরের হোটেলে খাওয়া; কনভেয়র লাইনের দৃশ্য খুঁজে বিকেলের আলোতে ছবি।
- বিকেল: সুনামগঞ্জের পথে রওনা — সন্ধ্যায় হাওর-শহরে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ছাতক সিমেন্ট কারখানার ভেতরে ঢোকা যায়?
সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য নয়; অফিসিয়াল অনুমতি ছাড়া প্রাঙ্গণে প্রবেশ নিষেধ। দেখা বাইরে থেকে — নদীর পাড় থেকেই সেরা দৃশ্য।
পুরনো কারখানা কি আবার চালু হবে?
অনিশ্চিত — চুনাপাথর-সরবরাহ (কেএলএমসি-র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার) ও রোপওয়ের ওপর নির্ভর করছে; সর্বশেষ খবরে কর্মকর্তারা প্রক্রিয়াধীন বলেছিলেন, তারিখ কেউ দিতে পারেননি।
কনভেয়র বেল্ট কত লম্বা?
১৭ কিলোমিটার (৭ কিমি ভারত + ১০ কিমি বাংলাদেশ) — মেঘালয়ের খনি থেকে ছাতকের প্ল্যান্ট পর্যন্ত, ২০০৪ সাল থেকে চালু।
শেষকথা
ছাতক শেখায় একটি জেলার অর্থনীতি কীভাবে একটি নদী, একটি খনি আর একটি সীমান্তের গণিতে বাঁধা পড়ে। সুনামগঞ্জ সিরিজের বাকি গল্প হাসন রাজার শহরে; পরের পোস্টে ধামাইল আর রাধারমণ দত্তের লোকঐতিহ্য।