সিআরবি শিরিষতলা ভ্রমণ গাইড: ১৮৭২ সালের রেল ভবন আর বন্দরনগরীর ‘ফুসফুস’
চট্টগ্রামের সিআরবি এলাকার সম্পূর্ণ গাইড — ১৮৭২ সালে নির্মিত সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং, শতবর্ষী শিরিষ-গর্জনের ছায়ায় শিরিষতলা, পয়লা বৈশাখের বলী খেলা আর শহরের প্রিয় আড্ডার চত্বর।

ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের গেটওয়ে শহর ফেনীর ভেতরের গল্প — ফনী থেকে ফেনী নামের ইতিহাস, কবি-প্রশাসক নবীনচন্দ্র সেনের শহর-গঠন, ১৯৭১-এর বিলোনিয়া যুদ্ধ, ভাষা শহীদ আবদুস সালামের সালাম নগর, আর জহির রায়হান থেকে সেলিম আল দীন — ফেনীর সন্তানদের তালিকা।
ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে যাতায়াত করা সবার কাছে ফেনী মানে একটানা গাড়ি থামার শহর। কিন্তু দুই ঘণ্টা হাতে নিয়ে শহরটায় নামলেই বুঝবেন — এই ছোট জেলা শহর (আয়তন মাত্র ~৯২৮ বর্গকিলোমিটার পুরো জেলা) বাংলাদেশের ইতিহাসের কতগুলো বড় অধ্যায় নিজের বুকে জমিয়ে রেখেছে। দীঘি আর ছাগলনাইয়ার পর্ব পড়া থাকলে (বিজয়সিংহ দীঘি ও ছাগলনাইয়া গাইড) এবার শহরটার নিজের গল্প।
Table of contents [Show]
জেলার নাম এসেছে ফেনী নদী থেকে। মধ্যযুগের লেখায় নদীর স্রোত ও ফেরি-পারাপারের ঘাট অর্থে ‘ফনী’ শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায়; সপ্তদশ শতকে মির্জা নাথানের ফারসি গ্রন্থ বাহরিস্তান-ই-গায়েবী-তেও এই ফনী-র উল্লেখ মেলে — কালক্রমে সেই ফনী-ই হয়েছে ফেনী। এই জনপদের পুরনো নাম ছিল শমসের নগর বলেও স্থানীয় ইতিহাসে পাওয়া যায়। প্রাচীনকালে অঞ্চলটি বৃহত্তর ভুলুয়া রাজ্যের প্রান্তভাগ; ছাগলনাইয়ার শিলুয়া গ্রামে পাওয়া প্রাচীন শিলামূর্তি থেকে এখানে বৌদ্ধ সংস্কৃতির ছোঁয়ারও অনুমান করা হয়।
১৮৭৫ সালে নোয়াখালী জেলার মহকুমা হিসেবে ফেনীর আত্মপ্রকাশ — প্রথমে সদর ছিল আমীরগাঁওয়ে, ১৮৮১ সালের দিকে সদর আসে আজকের ফেনী শহরে। আর আধুনিক শহরটার ভিত গড়েন মহকুমা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কবি নবীনচন্দ্র সেন — ‘পলাশীর যুদ্ধ’ মহাকাব্যের এই রচয়িতা প্রশাসক হিসেবেও ছিলেন স্বপ্নদর্শী। তাঁর হাতে ফেনীতে গড়ে ওঠে প্রথম হাইস্কুল (আজকের ফেনী সরকারি পাইলট হাই স্কুল), প্রথম হাসপাতাল, ফেনী বাজার, রেলস্টেশন, জেলখানা ও ট্রেজারি। সবচেয়ে কাব্যিক সিদ্ধান্তটা ছিল রাজাঝির দীঘিকে কেন্দ্র করে শহর সাজানো — দীঘির পাড় উঁচু করে তিনি বসিয়েছিলেন সপ্তাহে দুদিনের হাটবাজার; সেই দীঘি আজও শহরের জিরো পয়েন্ট। ১৯৮৪ সালের প্রশাসনিক পুনর্গঠনে ফেনী পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা পায় — সেটি ছিল ওই পুনর্গঠনের শেষ দিকের জেলাগুলোর একটি।
১৯৭১-এর নভেম্বরে পরশুরামের বিলোনিয়া হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বিখ্যাত যুদ্ধক্ষেত্র। কে ফোর্সের নেতৃত্বে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গলসহ মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে ৬–৭ নভেম্বরের ভয়াবহ যুদ্ধের পর, স্যাবর জেটের বোমাবর্ষণ সত্ত্বেও টিকতে না পেরে ১০ নভেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে — বিলোনিয়া বালুচ্ছেদ মুক্ত হওয়ার পর পথ খুলে যায় ফেনী শহরের দিকে। এই যুদ্ধে বীরত্বের জন্য বীর বিক্রম খেতাব পাওয়া শহীদ আবদুর রব চৌধুরীসহ অনেকের আত্মত্যাগের সাক্ষী এই মাটি; বিলোনিয়ায় আজ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিস্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে। ফেনী অঞ্চল যুদ্ধজুড়ে ছিল ২ নম্বর সেক্টরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা — সীমান্তবর্তী এই জেলার গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি আর যুদ্ধের স্মৃতি।
দাগনভূঞার মাতুভূঞা ইউনিয়নের লক্ষণপুর গ্রাম — আজ তার নাম সালাম নগর, ভাষা শহীদ আবদুস সালামের (১৯২৫–১৯৫২) জন্মভূমি। ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় মিছিলে গুলিবিদ্ধ হয়ে টানা দেড় মাস চিকিৎসাধীন থেকে ৭ এপ্রিল শহীদ হন তিনি; ২০০০ সালে মরণোত্তর একুশে পদক পান। ২০০৮ সালে তাঁর গ্রামের নাম বদলে হয় সালাম নগর; এডিপি অর্থায়নে সেখানে গড়ে উঠেছে ভাষা শহীদ আবদুস সালাম গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর (উদ্বোধন করেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ২০০৮)। ফেনী শহর থেকে প্রায় ৬–৮ কিলোমিটার দূরে ফেনী–নোয়াখালী সড়কের ধারে মাতুভূঞা ব্রিজের কাছেই জাদুঘরটি; ফেব্রুয়ারিতে এখানে বইমেলা ও অনুষ্ঠানের ভিড় জমে, বছরের বাকি সময়টা অবশ্য এলে শান্ত, অনাড়ম্বর পরিবেশেই সালামের একমাত্র সংরক্ষিত ছবি আর স্মৃতিচিহ্নগুলো দেখা যায়।
চলচ্চিত্রকার শহীদ জহির রায়হান ও তাঁর ভাই সাহিত্যিক শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার (তাঁদের পৈতৃক বাড়ি ফেনী সদরের দিকে — দর্শনার্থীদের গন্তব্য), নাট্যাচার্য ড. সেলিম আল দীন, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন — সাংস্কৃতিক বাংলাদেশের এই জ্যোতিষ্কদের জন্মভূমি ফেনী। আর লোকবিশ্বাসের জগতে অজেয় নাম পীর পাগলা মিয়া, যাঁর স্মৃতি ঘিরে আজও এ অঞ্চলে ওরস-মাহফিলে মানুষের ঢল নামে। ছোট জেলার পক্ষে সন্তানদের এই তালিকা সত্যিই অসাধারণ।
ঢাকা থেকে প্রায় ১৬১ কিলোমিটার, চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ৯৭ — মহাসড়ক আর রেল দুটোতেই ফেনী দেশের দক্ষিণ-পূর্বের প্রবেশদ্বার। প্রবাসী অধ্যুষিত এই জেলার অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের ভূমিকা বড়; ট্রাংক রোড ধরে শহরের বাণিজ্যিক ছুটোছুটি, জেলা পরিষদ পুকুরপাড়ের আড্ডা আর মহিপালের যানবাহনের চক্র — এসব মিলিয়েই আজকের ফেনীর ছন্দ। ভাষায় এখানে বৃহত্তর নোয়াখালীর উপভাষারই টান — ‘ফেনী’ উচ্চারণটা স্থানীয় মুখে শুনলেই টের পাবেন।
ঢাকা থেকে বাস (এনা, শ্যামলী, সৌদিয়া, স্টার লাইনসহ বহু পরিবহন; ভাড়া ৪৫০–৬০০ টাকা, সময় সাড়ে ৩–৫ ঘণ্টা) আর ট্রেন (মহানগর গোধূলি, তূর্ণা এক্সপ্রেস প্রভৃতি) — দুই পথেই সহজ। চট্টগ্রাম থেকে বাসে প্রায় ২ ঘণ্টা। শহরে থাকার জন্য ট্রাংক রোড ও মিজান রোড এলাকায় বিভিন্ন মানের হোটেল আছে (মিড নাইট, গাজী ইন্টারন্যাশনাল, বিলাস প্রভৃতি)। শহরের ভেতরে চলাচল রিকশা-সিএনজিতেই সেরা।
ফেনীতে কতদিন থাকা উচিত?
শহর ও আশপাশের ঐতিহ্যের জন্য ১ দিনই যথেষ্ট; মুহুরী প্রজেক্ট ও ছাগলনাইয়া যোগ করলে ২ দিনের পরিকল্পনা করুন।
সালাম নগর জাদুঘর কখন খোলা থাকে?
সরকারি গ্রন্থাগার-জাদুঘরের সাধারণ কর্মদিবসের সূচি মেনে চলে — ফেব্রুয়ারি মাসে সবচেয়ে প্রাণবন্ত; যাওয়ার আগে স্থানীয় প্রশাসনের সময় জেনে নেওয়া ভালো।
ফেনীর খাবারে কী বিশেষ?
বড় করে ব্র্যান্ড হওয়া কোনো একক খাবার নেই, তবে মহাসড়ক-শহরের হোটেল সংস্কৃতি, স্থানীয় মিষ্টি-দই আর পাগলা মিয়ার ওরসের মেলা-খাবার মিলিয়ে খাদ্য-অভিজ্ঞতাটা খাঁটি আঞ্চলিক।
ফেনীকে ‘পথের শহর’ ভাবা ভুল হবে — এ শহর নিজেই একটি গন্তব্য, শুধু সময় করে থামতে হয়। বিভাগের রাজধানীর ঐতিহ্য দেখতে চাইলে এরপর পড়ুন চট্টগ্রাম শহরের ঐতিহ্য ভ্রমণ।
চট্টগ্রামের সিআরবি এলাকার সম্পূর্ণ গাইড — ১৮৭২ সালে নির্মিত সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং, শতবর্ষী শিরিষ-গর্জনের ছায়ায় শিরিষতলা, পয়লা বৈশাখের বলী খেলা আর শহরের প্রিয় আড্ডার চত্বর।
কালুরঘাটের পূর্ণ গাইড — ১৯৩০ সালের রেল সেতুর ইতিহাস, গঠন ও বর্তমান অবস্থা, আর ১৯৭১-এর ২৬–৩০ মার্চের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ঐতিহাসিক ভূমিকা; যাতায়াত ও দর্শনের বাস্তব টিপসসহ।
কর্ণফুলীতে নৌকা ভ্রমণের ব্যবহারিক গাইড — কোন ঘাট থেকে সাম্পান ভাড়া করবেন, কোন দিকে যাবেন (মোহনা বা কালুরঘাট), ভাড়া ঠিক করার কৌশল, সেরা সময় ও নিরাপত্তা টিপস।


