• 30 Oct, 2026

বাংলাদেশের একমাত্র জায়গা যেখানে বন নয়, গ্রাম-শহরই বন্যপ্রাণীর বাড়ি — যশোরের কেশবপুরের কালোমুখো হনুমান (গ্রে ল্যাঙ্গুর): ১৮৬৭ সালের তীর্থযাত্রীর কাহিনি, ৩৫০–৪০০ হনুমানের দলজীবন, খাদ্য সংকট ও থানা-ঘেরাওয়ের ঘটনা, সরকারি খাদ্য-কর্মসূচি আর দর্শনের নিয়মসহ পূর্ণ গাইড।

বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী দেখতে হলে সাধারণত যেতে হয় গভীর বনে — কিন্তু যশোরের কেশবপুরে উল্টো ছবি: এখানে প্রাণীগুলোই থাকে মানুষের বসতির ভেতরে, বাজারের ছাদে, উপজেলা চত্বরের গাছে, গ্রামের বাঁশঝাড়ে। এরা কালোমুখো হনুমান — ধূসর শরীর, কালো মুখ ও লম্বা লেজের গ্রে ল্যাঙ্গুর। দেশের তিন প্রজাতির ল্যাঙ্গুরের মধ্যে একমাত্র এরাই বন ছেড়ে গ্রাম-শহরে মানুষের পাশাপাশি বাস করে, আর বাংলাদেশে তাদের প্রধান আবাস এই কেশবপুর ও পাশের মণিরামপুরের কয়েকটি গ্রাম-এলাকা (প্রথম আলোর সাম্প্রতিক ফিচার)। প্রায় ৪০০ একর এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই জনপদ তাই পরিচিত "হনুমান গ্রাম" নামে। কেশবপুরের ঐতিহাসিক ঘাঁটির দিনে ভরত ভায়না-মির্জানগর দেখার সঙ্গে এই অভিজ্ঞতা জুড়ে দেওয়া যায় সহজেই।

প্রাণীটি কে: রামায়ণের নামে নাম

ইংরেজিতে Northern Plains Grey Langur, বৈজ্ঞানিক নাম Semnopithecus entellus — লোকবিশ্বাস অনুযায়ী রামায়ণের বীর হনুমানের নামেই এদের নাম; কালো মুখ-লেজ নিয়ে প্রচলিত পৌরাণিক ব্যাখ্যাও আছে (ডেইলি স্টার)। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ অধ্যাপক মোস্তফা ফিরোজের মতে, এটিই একমাত্র বানর-প্রজাতি যারা বন্য পরিবেশের বদলে মানুষের বসতির কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে। আইইউসিএনের বাংলাদেশ-মূল্যায়নে প্রজাতিটি বিপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত (প্রথম আলো)। এদের মূল বিস্তার গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের মধ্যবর্তী দক্ষিণ এশীয় অঞ্চল — ভারত ও নেপালেও পাওয়া যায়; তবে বসতির ভেতরে এমন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাস করার নমুনা কেশবপুরের মতো বিরল।

একটি জোড়া থেকে শত শত: ১৮৬৭-র কাহিনি

কেশবপুরে হনুমান এল কীভাবে — এর সবচেয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যাটি রোমাঞ্চকর: ১৮৬৭ সালের দিল্লি গেজেটের বর্ণনা অনুযায়ী এক হিন্দু তীর্থযাত্রী জালঙ্গি নদীর তীরে বসতি গড়েন এক জোড়া হনুমান নিয়ে; ধারণা করা হয়, আজকের কেশবপুর-মণিরামপুরের হনুমান ওই জোড়াটিরই বংশধর (প্রথম আলো)। নদীটি এখান থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে হলেও কাহিনিটি স্থানীয়দের কাছে প্রজন্ম ধরে চলে আসছে — সত্য-কিংবদন্তির সীমারেখা যাই হোক, দেড় শতকের বেশি সময় ধরে এরা এই জনপদের স্থায়ী বাসিন্দা, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই: ২০০৩ সালের ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনেও "শতাব্দীর বেশি সময় ধরে কেশবপুরের গ্রামে টিকে থাকা" হনুমানের কথা আছে।

সংখ্যা, দল আর খাদ্য-সংকট

বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি হিসাবে কেশবপুরে এখন হনুমানের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন শ থেকে চার শ; দলবদ্ধ প্রাণীটি প্রায় দশটি দলে ভাগ হয়ে কেশবপুর বাজার, উপজেলা চত্বর আর রামচন্দ্রপুর-ভার্মাকাঠির মতো গ্রামের ঝোপঝাড়ে থাকে (ডেইলি স্টার)। কিন্তু চিত্রটি উদ্বেগের: পঞ্চাশ বছর আগে যশোর-মাগুরা-কুষ্টিয়াজুড়ে ছিল কয়েক শ হনুমান; ফলের গাছ কমে যাওয়া আর বসতি বাড়ায় খাদ্য-সংকট এখন নিত্য। কেশবপুর পৌরসভার তৎকালীন মেয়রের পর্যবেক্ষণে, ছোটবেলায় দেখা হনুমান ফল খেত — এখন গাছ কমায় তারা রুটি-বিস্কুট-কেক খেতে শিখেছে, এমনকি ফসলের খেতেও হানা দেয়। সংকটের দুই বিখ্যাত অধ্যায়: ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে আহত শাবক কোলে নিয়ে একটি দল কেশবপুর থানা চত্বরে অবস্থান নেয় — সেই ছবি সে সময় শিরোনাম হয়; আর করোনার লকডাউনে দোকানপাট বন্ধ হয়ে মানুষের দেওয়া খাবার বন্ধ হয়ে গেলে ক্ষুধার্ত হনুমানের দল বাসাবাড়িতে হানা দেয়। বন বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে প্রতিদিন কলা, বাদাম ও বিস্কুট বিতরণের খাদ্য-কর্মসূচি চালিয়ে আসছে কেশবপুর-মণিরামপুরের নির্ধারিত কয়েকটি পয়েন্টে — তবু সব দলের কাছে তা পৌঁছায় না বলেই সংঘর্ষের ঝুঁকি থেকে যায়।

সহাবস্থানের ভঙ্গুর ভারসাম্য

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাকৃতিক খাদ্যে এরা আম, কাঁঠাল, তেঁতুল, বট, নিমসহ অন্তত পঁচিশ জাতের গাছের পাতা-ফুল-ফল খায় (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা জার্নালে প্রকাশিত কেশবপুর-ভিত্তিক গবেষণা) — অর্থাৎ গ্রামের ফলদ গাছ টিকে থাকলেই এদের টিকে থাকা। প্রতিটি দলে সাধারণত ১০–২০টি সদস্য; দলের ভেতরে মা-শাবকের যত্ন আর পরস্পরের গা-চুলকানোর (গ্রুমিং) সামাজিক জীবন পর্যবেক্ষণই গবেষকদের কাছে এই জনসংখ্যার বড় আকর্ষণ। অন্ধকার দিকও আছে: শাবক ধরে পোষা প্রাণী কিংবা সার্কাসের কাছে বিক্রির অভিযোগ বহু পুরনো (ডেইলি স্টার, ২০০৩) — সংরক্ষিত প্রাণী ধরা বা কেনাবেচা আইনত দণ্ডনীয়। কেশবপুরের বাইরে ঝিনাইদহের মহেশপুর ও মেহেরপুরের মুজিবনগরেও এই প্রজাতির ছোট ছোট পকেট আছে — অর্থাৎ গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলজুড়ে এরা এখন দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন কয়েকটি জনপদে আটকে আছে।

দর্শনার্থীর জন্য: কোথায় দেখবেন, কী মেনে চলবেন

হনুমান দেখার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জায়গা কেশবপুর পৌর এলাকা — বাজার ও উপজেলা পরিষদ চত্বরের বড় গাছগুলোতে সকাল ও বিকেলে দলগুলো সবচেয়ে সক্রিয় থাকে; গ্রামের দিকের ঝোপঝাড়ে (রামচন্দ্রপুর-ভার্মাকাঠি এলাকা) যেতে স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করে নিন। এরা স্বভাবে শান্ত ও মানুষে অভ্যস্ত — উপজেলা চত্বরের মালির ভাষ্যে "মানুষের কোনো ক্ষতি করে না" (ডেইলি স্টার) — তবু দর্শনের শিষ্টাচার জরুরি: হাতে ধরে প্যাকেটজাত খাবার খাওয়াবেন না (ওদের স্বাস্থ্যের জন্যই ক্ষতিকর, আর এতে খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি-আক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে), শাবক কোলে নেওয়ার চেষ্টা বা তাড়া করা একদম নয়, ছবি তুলতে নিরাপদ দূরত্ব রাখুন। মনে রাখুন — এরা পোষা প্রাণী নয়, বিপন্ন বন্যপ্রাণী; আপনার এক দিনের বিনোদন ওদের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াই। সময় থাকলে একই সফরে সাগরদাঁড়ির মধুপল্লী ঘুরে আসুন — একই উপজেলায় সাহিত্য, প্রত্নতত্ত্ব আর বন্যপ্রাণীর বিরল ত্রিভুজ পূর্ণ হবে। সাম্প্রতিক সংযোজন হিসেবে স্থানীয়দের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা পাঁজিয়ার গড়ভাঙ্গা-বাটবিলা সড়কটিও (পদ্মবিল আর বিলের মাঝের মনোরম পথ) বিকেলের বাড়তি গন্তব্য হতে পারে (খুলনার সংবাদ)।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

কালোমুখো হনুমান কোন প্রজাতি?

Northern Plains Grey Langur (Semnopithecus entellus) — ধূসর শরীর, কালো মুখ, লম্বা লেজ। বাংলাদেশের তিন ল্যাঙ্গুর প্রজাতির মধ্যে একমাত্র এরা বনের বদলে বসতিতে থাকে।

কেশবপুরে কতগুলো হনুমান আছে?

সরকারি ও গবেষণা হিসাবে প্রায় ৩৫০–৪০০, প্রায় দশটি দলে বিভক্ত; পাশের মণিরামপুরেও এদের দল আছে।

হনুমানগুলো এখানে এল কীভাবে?

প্রচলিত কাহিনি (১৮৬৭ সালের দিল্লি গেজেটের বর্ণনাভিত্তিক): এক তীর্থযাত্রীর আনা এক জোড়া হনুমান থেকেই এই জনসংখ্যার উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়।

ওদের খাবার দেয় কে?

বন বিভাগ প্রতিদিন কলা-বাদাম-বিস্কুট বিতরণের কর্মসূচি চালায়; তবে তা সব দলের জন্য যথেষ্ট নয় — দর্শনার্থীদের প্যাকেটজাত খাবার না খাওয়ানোই ওদের জন্য ভালো।

কখন গেলে দেখা নিশ্চিত?

সকাল ও বিকেল — কেশবপুর পৌর এলাকার বড় গাছগুলোতে দলগুলো তখন সক্রিয় থাকে। নির্দিষ্ট অভয়ারণ্য-গেট নেই; স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করলেই সেদিনের অবস্থান জানা যায়।

শেষকথা

হনুমান গ্রাম কোনো সাজানো পর্যটন-পার্ক নয় — এটি একটি চলমান সহাবস্থানের পরীক্ষা: মানুষের গ্রামে বিপন্ন প্রাণীর টিকে থাকা, যার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে গাছ বাঁচানো আর সহানুভূতি টিকিয়ে রাখার ওপর। কেশবপুরে গেলে শুধু ছবি তুলে ফিরবেন না — চোখে পড়বে যে সংরক্ষণ মানে সব সময় বেড়া দেওয়া অভয়ারণ্য নয়, কখনো কখনো পাশের বাড়ির গাছটাই শেষ আশ্রয়।