পুরান ঢাকার বকশিবাজারে, একটি বড় পুকুরের পাড়ে সাদা সৌধের যে ইমারতটি দাঁড়িয়ে আছে, সেটি হোসেনি দালান — ঢাকার শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রধান ইমামবাড়া (হুসাইনিয়া) ও মহরমের প্রাণকেন্দ্র। ইমাম হোসেনের (রা.) কারবালার শাহাদাতের স্মরণে গড়া এই দালান প্রায় চারশ বছর ধরে পুরান ঢাকার ধর্মীয় জীবনের অংশ। হাঁটা দূরত্বেই হিন্দু তীর্থ ঢাকেশ্বরী মন্দির — বকশিবাজারের এই ছোট্ট এলাকাটিতেই ঢাকার বহুস্তর ধর্মীয় ঐতিহ্য পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।
১৬৪২ সালের শিলালিপি আর ঐতিহাসিকদের বিতর্ক
ভবনের দেয়ালের ফারসি শিলালিপি অনুযায়ী, শাহজাহানের পুত্র সুবেদার শাহ সুজার নৌ-সেনাপতি মীর মুরাদহিজরি ১০৫২ (১৬৪২ খ্রিষ্টাব্দ) সালে প্রথমে এখানে একটি তাজিয়া খানা নির্মাণ করেন — হোসেনি দালান তারই পরিবর্ধিত রূপ (বাংলা উইকিপিডিয়া)। জনশ্রুতি অনুযায়ী মীর মুরাদ স্বপ্নে ইমাম হোসেনকে শোকের ঘর গড়তে দেখেই এই কাজে হাত দেন (জেমস টেলরের বর্ণনা)। প্রত্নতাত্ত্বিক পরীক্ষায় শিলালিপিটিকে আসল বলা হয়েছে এবং ঐতিহাসিক এম হাসান দানীও মীর মুরাদকেই প্রথম ইমামবাড়ার স্থপতি মানেন (বাংলা উইকিপিডিয়া)। তবে বিতর্ক আছে: হাকিম হাবিবুর রহমান শিলালিপিটিকে সন্দেহ করে নায়েব-নাজিম নসরত জংকে (মৃ. ১৮২৩) বর্তমান ভবনের নির্মাতা বলেছিলেন — যদিও সমসাময়িক বিবরণ (ডি'অয়লি, ১৮০৮; টেলর, ১৮৩২) সেই দাবি সমর্থন করে না। স্থানীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী নায়েব-নাজিম জসারত খাঁ ১৮শ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে দালানটি পুনর্নির্মাণ করেন; ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হলে নবাব আহসানউল্লাহ তা মেরামত করেন। আজকের রূপটিতে তাই মুঘল-পারসিক ভিতের ওপর ব্রিটিশ আমলের ছাঁচও স্পষ্ট (বাংলা উইকিপিডিয়া)। প্রসঙ্গত, ঢাকার প্রাচীনতম ইমামবাড়া বলে ধরা হয় ফরাশগঞ্জের বিবি কা রওজাকে (১৬০৮) — হোসেনি দালান তার পরের প্রজন্মের (দ্য ডেইলি স্টার)।
ভবন, পুকুর ও নায়েব-নাজিমদের কবর
দোতলা মূল ভবনের নিচতলায় কবরস্থান — এখানে ঢাকার কয়েকজন নায়েব-নাজিমের কবর রয়েছে; এক সময়ের সমাধি-সৌধটি না থাকলেও কবরগুলো আজও আছে (ইভেন্ডো)। ভবনের দক্ষিণে বিশাল পুকুর, উত্তরে প্রশস্ত মাঠ পেরিয়ে প্রধান ফটক; চাঁদের শুরুতে এখানকার নহবতখানায় বাজে ঐতিহ্যের নহবত। মোগল আমলের আরও এক নিদর্শন তিন গম্বুজ বজরা শাহী মসজিদের মতোই এখানেও স্থাপত্যের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে চারশ বছরের অবিচ্ছিন্ন ধর্মীয় চর্চা।
মহরম: ঢাকার সবচেয়ে বড় শোক-মিছিলের শুরু এখানে
মহরম মাসে হোসেনি দালান ঢাকার শিয়া সম্প্রদায়ের সব আয়োজনের কেন্দ্র — প্রথম দশকে প্রতিদিন মজলিস ও শোক-আলোচনা চলে, আর আশুরার (১০ মহরম) দিনে এখান থেকে বের হয় ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিল, যা পুরান ঢাকার রাজপথ ধরে এগিয়ে যায়; শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে হাজারো মানুষ এই আয়োজনে অংশ নেন বা দেখতে আসেন (ইভেন্ডো)। দর্শনার্থীদের জন্য: মহরমের দিনগুলোতে এলাকায় প্রচণ্ড ভিড় থাকে — ভিড় ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে সময় হাতে রাখুন। অন্য সময়ে গেলে শান্ত পরিবেশে ভবনটি দেখা যায়; তবে মনে রাখুন এটি সক্রিয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও কবরস্থান — পোশাকে শালীনতা, নীরবতা ও ছবি তোলার আগে অনুমতি নেওয়া এখানে শিষ্টাচার। যাতায়াত: গুলিস্তান/ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিক থেকে রিকশায় বকশিবাজার — ঢাকেশ্বরীর সঙ্গে একই হাঁটায় দুটোই দেখা সুবিধাজনক।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
হোসেনি দালান কে, কবে নির্মাণ করেন?
শিলালিপি অনুযায়ী শাহ সুজার নৌ-সেনাপতি মীর মুরাদ ১৬৪২ সালে তাজিয়া খানা নির্মাণ করেন; তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের বিতর্ক রয়েছে (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
ইমামবাড়া কী?
ইমাম হোসেনের (রা.) শাহাদাতের শোক পালনের ঘর — মহরমে মজলিস ও তাজিয়া রাখার কেন্দ্র; হোসেনি দালান ঢাকার প্রধান ইমামবাড়া।
তাজিয়া মিছিল কখন বের হয়?
আশুরার দিন (১০ মহরম) হোসেনি দালান থেকে মিছিল শুরু হয়ে পুরান ঢাকার রাস্তায় যায় (ইভেন্ডো)।
এখানে কাদের কবর আছে?
ভবনের নিচতলার কবরস্থানে ঢাকার কয়েকজন নায়েব-নাজিমের কবর রয়েছে (ইভেন্ডো)।
সাধারণ দর্শনার্থী কি ভেতরে যেতে পারেন?
সাধারণত পারেন, তবে এটি সক্রিয় উপাসনালয় — নামাজ/মজলিসের সময় শৃঙ্খলা মেনে ও অনুমতি নিয়ে ঘুরতে হয়।
শেষকথা
হোসেনি দালান ঢাকার সেই বিরল জায়গাগুলোর একটি, যেখানে ইতিহাস শুধু দেয়ালে নয়, প্রতি বছর মহরমে জীবন্ত হয়ে ওঠে রাস্তায়। পুকুরপারের সাদা দালান, নহবতের সুর আর চারশ বছরের শোক-ঐতিহ্য — পুরান ঢাকার আত্মাকে বুঝতে এই ঠিকানা অপরিহার্য।