• 30 Oct, 2026

পুরান ঢাকার বকশিবাজারে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির — বল্লাল সেনের প্রতিষ্ঠা-প্রবাদ, শক্তিপীঠ পরিচয়, দেশভাগে মূল বিগ্রহের কলকাতা যাত্রা আর ১৯৯৬ সালের জাতীয় মন্দির স্বীকৃতিসহ বাংলাদেশের প্রধান হিন্দু তীর্থের পূর্ণ গাইড।

ঢাকার নামের সঙ্গে যে দেবীর নাম জড়িয়ে আছে বলে শত শত বছর ধরে মানুষ বিশ্বাস করে এসেছে, তিনি ঢাকেশ্বরী — "ঢাকার ঈশ্বরী"। পুরান ঢাকার বকশিবাজার-অরফানেজ রোড এলাকায় অবস্থিত ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু তীর্থ: রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এই মন্দিরটি ১৯৯৬ সালে দেশের "জাতীয় মন্দির" হিসেবে স্বীকৃতি পায় — মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রে জাতীয় হিন্দু মন্দির থাকার দিক থেকে এটি পৃথিবীতে অনন্য (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। পাশের লালবাগ কেল্লা থেকে হাঁটা দূরত্বেই এই প্রাচীন কমপ্লেক্স।

বল্লাল সেন, "ঢাকা" দেবী আর নামের কিংবদন্তি

প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, ১২শ শতাব্দীতে সেন বংশের রাজা বল্লাল সেন এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। কিংবদন্তি বলে, বল্লাল সেন জঙ্গলে আচ্ছাদিত (ঢাকা পড়ে থাকা) এক দেবীমূর্তি পেয়েছিলেন — "ঢাকা" অবস্থা থেকে দেবীর নাম হয় ঢাকেশ্বরী, আর একটি মত অনুযায়ী দেবীর নামেই শহরের নাম "ঢাকা" (শিক্ষক বাতায়ন)। আরেক কিংবদন্তিতে বল্লাল সেনের জন্মই এই অঞ্চলের জঙ্গলে — মা লাঙ্গলবন্দে স্নানে যাওয়ার পথে তাঁর জন্ম দেন, পরে রাজা হয়ে জন্মস্থানে মন্দির গড়েন (স্মৃতি ও চেতনা)। তবে সৎভাবে বলা দরকার: বহু ইতিহাসবিদ মনে করেন, বর্তমান মন্দিরের চুন-বালির গাঁথুনি মুসলিম আমলের স্থাপত্যরীতির — সেন আমলের মূল কাঠামো আজ আর চেনা যায় না; বারবার মেরামতি ও পুনর্নির্মাণে মন্দিরটি বর্তমান রূপ পেয়েছে, যার বয়স কেউ কেউ প্রায় দুইশ বছর বলে উল্লেখ করেছেন (শিক্ষক বাতায়ন/ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। প্রচলিত বিশ্বাসে এটি একটি শক্তিপীঠ — দেবী সতীর মুকুটের রত্ন এখানে পড়েছিল বলে বিশ্বাস করা হয়।

মূল বিগ্রহের কলকাতা যাত্রা ও ১৯৭১

মন্দিরের ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায় দেশভাগের সময়ের: ১৯৪৮ সালে সাম্প্রদায়িক আক্রমণের আশঙ্কায় প্রধান পুরোহিত মূল প্রাচীন বিগ্রহটি গোপনে কলকাতার কুমোরটুলিতে নিয়ে যান; সেখানে ১৯৫০ সালে ব্যবসায়ী দেবেন্দ্রনাথ চৌধুরী সেই বিগ্রহের জন্য মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। ঢাকার মন্দিরে এখন অষ্টধাতুর প্রতিরূপ মূর্তিতে পূজা চলে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী রমনা কালী মন্দির ধ্বংস করলে ঢাকেশ্বরীই হয়ে ওঠে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু উপাসনালয় (একই সূত্র); ১৯৮৯–৯০ সালের হামলায়ও মন্দিরটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বাংলাদেশের আরেক বিখ্যাত শক্তিপীঠ সাতক্ষীরার যশোরেশ্বরী মন্দিরের সঙ্গেও এর বিশ্বাসগত মিল রয়েছে।

কমপ্লেক্সে যা দেখবেন ও পূজার আবহ

প্রশস্ত কমপ্লেক্সে রয়েছে মূল ঢাকেশ্বরী মন্দির, দুর্গামণ্ডপ, বিশাল নাটমন্দির, একটি পুকুর এবং সারিবদ্ধ চারটি শিব মন্দির (প্রবাদ আছে, ১৬শ শতকে রাজা মানসিংহ এখানে চারটি শিবলিঙ্গ স্থাপন করেন — স্মৃতি ও চেতনা)। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় আরতি ও পূজা চলে; শারদীয় দুর্গাপূজায় এই মন্দিরের কেন্দ্রীয় আয়োজন দেশের সবচেয়ে বড়গুলোর একটি, তখন সারাদেশ থেকে লক্ষাধিক দর্শনার্থী আসেন। দর্শনের নিয়ম: এটি সক্রিয় ও পবিত্র উপাসনালয় — কমপ্লেক্সে প্রবেশে পোশাকে শালীনতা বজায় রাখুন, গর্ভগৃহের সামনে জুতা খুলুন, পূজার সময় ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন। ধর্ম নির্বিশেষে সবাই শ্রদ্ধা রেখে ঘুরে দেখতে পারেন। যাতায়াত: গুলিস্তান/ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে রিকশায় বকশিবাজার; দুর্গাপূজার সময় আশপাশের রাস্তায় তীব্র ভিড় থাকে, হাতে সময় রাখুন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

ঢাকেশ্বরী মন্দির কে প্রতিষ্ঠা করেন?

প্রচলিত মতে ১২শ শতাব্দীতে সেন রাজা বল্লাল সেন; তবে বর্তমান কাঠামো পরের যুগে বারবার পুনর্নির্মিত (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)।

মন্দিরটি "জাতীয় মন্দির" কেন?

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এই মন্দিরকে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের জাতীয় মন্দির হিসেবে ঘোষণা করা হয় (মাছিন্নামস্তা/ইংরেজি উইকিপিডিয়া)।

মূল বিগ্রহটি এখন কোথায়?

দেশভাগের অশান্তির সময় ১৯৪৮ সালে মূল মূর্তি কলকাতার কুমোরটুলিতে নেওয়া হয়; ঢাকায় এখন প্রতিরূপ মূর্তির পূজা হয় (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)।

ঢাকার নাম কি দেবীর নামে?

একটি প্রচলিত মত অনুযায়ী হ্যাঁ — জঙ্গলে "ঢাকা" (আচ্ছাদিত) অবস্থায় পাওয়া দেবী থেকে ঢাকেশ্বরী, সেখান থেকে ঢাকা (শিক্ষক বাতায়ন)।

দুর্গাপূজায় কি সাধারণ দর্শনার্থী যেতে পারেন?

পারেন — দুর্গাপূজায় মন্দির সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে, তবে ভিড় প্রচণ্ড হয়; পূজার শৃঙ্খলা ও নিয়ম মেনে চলতে হয়।

শেষকথা

ঢাকেশ্বরী মন্দির শুধু একটি উপাসনালয় নয় — এটি ঢাকা নামের শেকড়, সেন যুগ থেকে দেশভাগ পেরিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত শহরের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। পুরান ঢাকার হাঁটায় এই কমপ্লেক্সের শান্ত আঙিনা শহরের কোলাহলের মাঝে এক অদ্ভুত থেমে-যাওয়া সময় উপহার দেয়।