বাংলাদেশের আঞ্চলিক খাবারের মানচিত্রে খুলনার জায়গাটা আলাদা — এখানকার রান্নাঘর দাঁড়িয়ে আছে তিন স্তম্ভে: নদী ও ঘেরের চিংড়ি-মাছ, নারকেলের দুধ, আর একটি অসাধারণ মসলা-লতা, চুইঝাল। মেজবানি মাংস চট্টগ্রামের, সাতকড়া সিলেটের — আর চুইঝালে কষানো মাংস খুলনার স্বাক্ষর। এই পোস্টে ভ্রমণকারীর জন্য সাজানো হলো খুলনায় কী কী খাবেন, কোথায় খাবেন, আর বাড়ি ফেরার পথে কী কিনে আনবেন। শহরের দর্শনীয় জায়গার পরিকল্পনা পাবেন আমাদের খুলনা শহর গাইডে।
চুইঝাল: যে লতা মাংসকে করে তোলে কিংবদন্তি
চুইঝাল হলো একটি লতাজাতীয় গাছের কাণ্ড — বড় গাছ বেয়ে উঠে বেড়ে ওঠা এই লতার মোটা কাণ্ড টুকরো করে কেটে মাংসের তরকারিতে দেওয়া হয়। স্বাদে এটি গোলমরিচের মতো ঝাঁঝালো হলেও গন্ধ একেবারে নিজস্ব — মাটি ও কাঠের একটা গভীর সুগন্ধ, যা একবার খেলে চেনা যায়। রান্নায় লতার টুকরোগুলো নরম হয়ে ঝোলে মিশে যায়; খাওয়ার সময় কেউ কেউ টুকরোটা চিবিয়ে ঝাঁঝটা আলাদা করে উপভোগ করেন। খুলনা-বাগেরহাট অঞ্চলের চুইঝালকে স্বাদে-গন্ধে সেরা বলে মনে করা হয়, এবং এটি এখন শুধু এই অঞ্চলের রান্নাঘরেই সীমাবদ্ধ নয় — ঢাকাসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে চুইঝালের মাংসের চাহিদা। গরু, খাসি এমনকি হাঁসের মাংসও চুইঝাল দিয়ে রান্না হয়, তবে সবচেয়ে বিখ্যাত রূপটি হলো গোটা রসুন আর মসলা দিয়ে কষানো খাসির মাংস।
চুকনগরের আব্বাস হোটেল: ১৯৫০ থেকে একই স্বাদ
চুইঝালের গল্পে সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর বাজারের আব্বাস হোটেল। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ফিচার অনুযায়ী, ১৯৫০ সালে আব্বাস আলী মোড়ল গোলপাতায় ছাওয়া ছোট্ট একটি ঘরে, স্কুলের বেঞ্চে বসিয়ে, হোটেলটি শুরু করেন — মেনুতে মাত্র দুটি পদ: চুইঝাল দিয়ে খাসির মাংস আর ভাত, প্লেট প্রতি দাম মাত্র এক টাকা। মাদ্রাজে শেখা রান্নার কৌশলের সঙ্গে তিনি মিশিয়েছিলেন আঞ্চলিক উপকরণ — সেই সংমিশ্রণই হয় কিংবদন্তি। সাত দশকের বেশি সময় পেরিয়ে আজও এই হোটেলে রাতদিন ভিড় লেগে থাকে; দেশের দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন শুধু এক প্লেট চুইঝালের মাংস খেতে। চুকনগর খুলনা শহর থেকে ডুমুরিয়ার পথে — সুন্দরবন বা সাতক্ষীরা রুটে যাতায়াত থাকলে পথিমধ্যে এই হোটেলে ঢুঁ মারা খুলনা ভ্রমণের সবচেয়ে সার্থক খাদ্য-বিরতি। শহরের ভেতরেও এখন শিববাড়ি-জিরো পয়েন্ট এলাকাসহ নানা হোটেলে চুইঝালের মাংস পাওয়া যায়, তবে 'অরিজিনাল' অভিজ্ঞতার জন্য চুকনগরই ঠিকানা।
গলদা ও বাগদা: ঘের থেকে থালায়
খুলনা অঞ্চলকে বলা হয় চিংড়ির দেশ — ঘেরে চাষ হওয়া চিংড়ি এখানকার অর্থনীতির 'সাদা সোনা'। দুই রাজা: মিঠাপানির গলদা (বড় মাথা আর লম্বা নীলচে দাঁড়াওয়ালা দৈত্যাকার চিংড়ি) আর লবণাক্ত পানির বাগদা (গায়ে কালো ডোরাকাটা দাগ)। গলদা দিয়ে সবচেয়ে বিখ্যাত পদ চিংড়ির মালাইকারি — নারকেলের দুধ, পোস্ত ও গরম মসলায় ধীরে কষানো ঘন ঝোল, শেষে এক চিমটে ঘি। বাগদা ভুনা বা দোপেয়াজার জন্যও সমান উপযোগী। সুন্দরবন ট্যুরের জাহাজগুলোতেও মৌসুমে তাজা চিংড়ির পদ পরিবেশন করা হয় — তবে শহরের ভালো রেস্তোরাঁগুলোতে বেছে নেওয়ার সুযোগ বেশি। চিংড়ি কেনার বা অর্ডার করার সময় আকার দেখে নিন: দাম আকারভেদে অনেক বদলায়, আর 'গলদা' নামে ছোট চিংড়ি ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
আরও যা চেখে দেখবেন
খুলনা-যশোর অঞ্চলের রান্নায় নারকেলের উপস্থিতি সর্বত্র — মাছের ঝোলে নারকেল দুধ দেওয়ার রীতি এই অঞ্চলের অনন্য বৈশিষ্ট্য। নদীর মাছে সেরা পাবদা দোপেয়াজা আর শর্ষে ইলিশ; লইট্টা মাছের ভর্তা-ভুনা উপকূলীয় স্বাদের প্রতিনিধি। শেষপাতে তিনটি নাম মাথায় রাখুন: খুলনার ঘন স্পেশাল দই, শীতকালে খেজুরের গুড়ের পায়েস, আর সুন্দরবনের খাঁটি মধু (মৌসুমে সংগ্রহ করা মধু কিনতে চাইলে বিশ্বস্ত বিক্রেতা দেখে কিনুন — ভেজাল এই বাজারের চেনা সমস্যা)। আর সন্ধ্যার আড্ডার জন্য খুলনার নিউমার্কেট এলাকার মালাই চা স্থানীয়দের কাছে রীতিমতো প্রতিষ্ঠান — ঘন সর-দুধের এই চা কফির মগে পরিবেশন করা হয়, আর প্রচণ্ড গরম থাকে বলে তাড়াহুড়োর চুমুকে জিভ পোড়ানোর অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। দেশের আরেক বিখ্যাত মিষ্টি-ঐতিহ্যের গল্প চাইলে আমাদের কুমিল্লার রসমালাই গাইড পড়ুন।
কিনে আনুন: চুইঝাল চেনার টিপস
বাড়ি ফেরার স্মারক হিসেবে খুলনা থেকে সবচেয়ে ভালো কেনাকাটা এক বাণ্ডিল চুইঝাল। কেনার সময় জানা থাকুক: আসল খুলনা-বাগেরহাট অঞ্চলের চুইয়ের গায়ে শিকড় বেশি ও চিকন হয়, গিঁটের ফাঁক ছোট থাকে, আর রান্নায় তুলনামূলক দ্রুত নরম হয়ে যায়। বয়স্ক, মোটা কাণ্ডের দাম বেশি — স্বাদও গাঢ়। শহরের বাজার ও মসলা বিক্রেতাদের কাছে বছরের সব সময়ই চুইঝাল পাওয়া যায়; শুকনো অবস্থায় এটি অনেক দিন ভালো থাকে বলে সহজে বহনযোগ্য। সঙ্গে সুন্দরবনের মধু আর শীতে খেজুরের গুড় — এই তিন মিলিয়ে খুলনার স্বাদের পুরো প্যাকেজ।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
চুইঝাল আসলে কী?
একটি লতাজাতীয় গাছের কাণ্ড, যা টুকরো করে মাংসের তরকারিতে মসলা হিসেবে ব্যবহার হয়। ঝাঁঝে গোলমরিচের কাছাকাছি হলেও এর সুগন্ধ একেবারে স্বতন্ত্র। খাওয়ার সময় টুকরোগুলো নরম হয়ে যায়।
চুইঝালের মাংসের সবচেয়ে বিখ্যাত ঠিকানা কোনটি?
ডুমুরিয়ার চুকনগর বাজারের আব্বাস হোটেল — ১৯৫০ সাল থেকে চুইঝালের খাসির মাংসের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত। খুলনা শহরের ভেতরের অনেক হোটেলেও এখন পদটি পাওয়া যায়।
গলদা আর বাগদার পার্থক্য কী?
গলদা মিঠাপানির বড় চিংড়ি (ঘের-পুকুরে চাষ হয়), আর বাগদা লবণাক্ত পানির ডোরাকাটা চিংড়ি। মালাইকারির জন্য গলদাই বেশি প্রিয়।
খুলনায় চিংড়ির দাম কেমন?
আকার ও মৌসুম অনুযায়ী দামে বড় ওঠানামা হয় — রেস্তোরাঁয় অর্ডারের আগে ওজন/আকার অনুযায়ী দাম জেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
উপহার হিসেবে কী কেনা যায়?
চুইঝাল (শুকনো, টেকসই), খাঁটি সুন্দরবনী মধু (বিশ্বস্ত উৎস থেকে) আর শীতকালে খেজুরের গুড় — এই তিনটিই খুলনার সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল খাদ্য-স্মারক।
শেষকথা
খুলনা ভ্রমণ সুন্দরবনে শেষ হয় না — শেষ হয় এক প্লেট চুইঝালের মাংস, এক বাটি মালাইকারি আর এক মগ মালাই চায়ে। এই শহরের স্বাদগুলো তার নদী, ঘের আর বনেরই প্রতিচ্ছবি। পেট ভরে খেয়ে, বাণ্ডিলে চুইঝাল বেঁধে ফিরুন — বাড়ির রান্নাঘরে খুলনা আরও কিছুদিন বেঁচে থাকবে।