বরিশালের জমিদার-ইতিহাসের সবচেয়ে জীবন্ত অধ্যায় লাকুটিয়া — যেখানে তিন শতাব্দীর পুরনো এক প্রাসাদ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে হতেও ফিরে পেয়েছে নতুন জীবন। ২০২৫–২৬ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংস্কারের পর সাদা রঙের সাজে দাঁড়িয়ে থাকা এই দ্বিতল বাড়িটি এখন দক্ষিণ বাংলার ঐতিহ্য-ভ্রমণের অন্যতম সেরা গন্তব্য।
ইতিহাস: রূপচন্দ্র থেকে রাজচন্দ্র
লাকুটিয়া গ্রামে এই জমিদার বাড়ির গোড়াপত্তন করেন রূপচন্দ্র রায়, ব্রিটিশ শাসনের শুরুর দিকে (ডেইলি স্টার); জমিদারির ভিত গড়েন তাঁর উত্তরসূরিরা, আর বাড়িটির সম্প্রসারণ ও বর্তমান রূপ পায় তাঁর নাতি রাজচন্দ্র রায়ের আমলে, প্রায় ৫০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এস্টেটে (টিওবি/এভেন্ডো)। রায় পরিবার শুধু জমিদার ছিলেন না — শিক্ষা ও সমাজকল্যাণে তাঁদের অবদান বরিশালজুড়ে: তাঁদের প্রতিষ্ঠিত রাজচন্দ্র কলেজ ও পুষ্পরাণী স্কুল অঞ্চলের শিক্ষাবিস্তারে ভূমিকা রেখেছে (এভেন্ডো); স্থানীয় ভ্রমণ-লেখায় শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের এই বাড়িতে যাতায়াতের কথাও উল্লেখ আছে। চত্বরে মূল প্রাসাদ ছাড়াও রয়েছে একটি মঠ, পশ্চিম দিকে সারি বেঁধে কয়েকটি শিবমন্দির, সামনে-পেছনে বড় দীঘি ও মাঠ (বাসস/ডেইলি স্টার)।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও দীর্ঘ অবহেলা
এই বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের গর্বের ইতিহাস: ১৯৭১ সালে এখানে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং ক্যাম্প, বহু বীর মুক্তিযোদ্ধাকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল এই প্রাসাদে (বাসস)। কিন্তু পরের দশকগুলোতে অবহেলায় বাড়িটি প্রায় ধ্বংসের পথে চলে যায় — ভেঙে পড়ে ছাদ, দেয়ালে শ্যাওলা, বারান্দা জুড়ে ধস; একপর্যায়ে ভেতরে ঢোকাই ছিল ঝুঁকিপূর্ণ (ডেইলি স্টার)। বর্তমানে জায়গাটি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) তত্ত্বাবধানে রয়েছে (ডেইলি স্টার/বাসস) এবং "বরিশাল জেলার প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা" তালিকাভুক্ত (বাসস)।
সুখবর: ২০২৬-এ ফিরে পাওয়া গৌরব
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে ২০২৫ সালের ৪ মে শুরু হয় সংস্কার কাজ। বাসসের প্রতিবেদন (১১ জানুয়ারি ২০২৬) অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ: প্রায় ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে ভিত, ইটের কাজ ও ছাদ সংস্কার করা হয়েছে — পুরনো ছাদ খুলে সাতক্ষীরা থেকে আনা নতুন টালি বসানো হয়েছে, কাঠামো মজবুত করতে গোল ইটের স্তম্ভ তোলা হয়েছে, বৃষ্টি থেকে রক্ষায় বাইরের দেয়াল সাদা রঙ করা হয়েছে এবং ভেতরের কক্ষগুলো পরিষ্কার করে সাজানো হয়েছে; পুরনো দেয়ালের অংশ ধরে রাখতে ধাতব সাপোর্ট বসানো হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত কাঠের বিম বদলানো হয়েছে বার্নিশ করা কাঠের খণ্ড দিয়ে (বাসস)। বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরের সহকারী কাস্টোডিয়ান আরিফুর রহমান জানিয়েছেন, দ্বিতীয় পর্যায়ে দরজা, জানালা ও মেঝে মূল নকশা অনুযায়ী পুনরুদ্ধার করা হবে। অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক লাভলী ইয়াসমিনের ভাষ্য — পুরনো আলোকচিত্র, দলিল ও স্থানীয়দের বর্ণনা ব্যবহার করে বাড়িটিকে যতটা সম্ভব মূল রূপে ফিরিয়ে আনাই লক্ষ্য (টিওবি)। অর্থাৎ এখনই লাকুটিয়া দেখার সেরা সময় — তবে দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ চলমান থাকতে পারে বলে ভেতরে প্রবেশের সুযোগ এলাকায় গিয়ে যাচাই করে নেবেন।
কীভাবে যাবেন ও সফর-ছক
বাড়িটি বরিশাল শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার উত্তরে, বাবুগঞ্জ উপজেলার লাকুটিয়া গ্রামে (এভেন্ডো); আর দুর্গাসাগর দীঘি থেকে মাত্র প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে (ডেইলি স্টার) — তাই দুটি জায়গা একই সকালে দেখা সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত ছক: প্রথমে দুর্গাসাগরের জল-পাখি, তারপর লাকুটিয়ার প্রাসাদ-মন্দির-দীঘি। শহর থেকে অটোরিকশা বা সিএনজি রিজার্ভ করে গেলে দুটি জায়গাই স্বস্তিতে ঘোরা যায়। চত্বরে বিএডিসির বীজ উৎপাদন কেন্দ্র এলাকা রয়েছে — কর্মীদের নির্দেশনা মেনে চলুন এবং মন্দিরগুলোতে প্রবেশের সময় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
লাকুটিয়া জমিদার বাড়ি কোথায়?
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার লাকুটিয়া গ্রামে — শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার উত্তরে, দুর্গাসাগর দীঘি থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে।
বাড়িটি কারা তৈরি করেন?
প্রতিষ্ঠাতা রূপচন্দ্র রায় (ব্রিটিশ আমলের শুরুতে); নাতি রাজচন্দ্র রায়ের আমলে প্রাসাদ সম্প্রসারিত হয় প্রায় ৫০ একর এস্টেটে (টিওবি/ডেইলি স্টার)।
বাড়িটির বর্তমান অবস্থা কেমন?
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংস্কারে (শুরু ৪ মে ২০২৫) প্রথম পর্যায় শেষ হয়েছে জানুয়ারি ২০২৬-এ — ছাদ, ভিত ও বাইরের রূপ পুনরুদ্ধার হয়েছে; দরজা-জানালা-মেঝের দ্বিতীয় পর্যায় আসছে (বাসস)।
এখানে আর কী কী আছে?
দ্বিতল প্রাসাদ, একটি মঠ, পশ্চিমে সারিবদ্ধ শিবমন্দির, সামনে-পেছনে দীঘি ও মাঠ; সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং ক্যাম্পের স্মৃতি।
বাড়িটি কার তত্ত্বাবধানে?
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)-এর তত্ত্বাবধানে; সংস্কার করছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।
শেষকথা
তিন শতাব্দীর উত্থান-পতন, মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগ আর দীর্ঘ অবহেলার পর লাকুটিয়ার এই প্রত্যাবর্তন প্রমাণ করে — ঐতিহ্য হারায় না, শুধু যত্নের অপেক্ষায় থাকে। সংস্কারের তাজা রূপে বাড়িটিকে দেখার সুযোগ এখনই; বরিশালের সফর-তালিকায় এটিকে প্রথম সারিতে রাখুন।