• 30 Oct, 2026

নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার ইতনা গ্রামে গোয়েন্দা কিরীটী রায়ের স্রষ্টা ঔপন্যাসিক-চিকিৎসক নীহাররঞ্জন গুপ্তের (১৯১১–১৯৮৬) প্রায় দুই শ বছরের পৈতৃক বাড়ি — সংরক্ষিত পুরাকীর্তি, যেখানে এস এম সুলতান উদ্বোধন করেছিলেন "শিশুস্বর্গ-২"।

বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্রদের একজন কিরীটী রায় — লম্বা, কালো আলখাল্লা পরা সেই তীক্ষ্ণ বুদ্ধির ডিটেকটিভ। তাঁর স্রষ্টা নীহাররঞ্জন গুপ্তের পৈতৃক বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার ইতনা গ্রামে — পুকুরপাড়ে, গাছগাছালির ছায়ায়, ব্রিটিশ আমলের এক দ্বিতল বাড়ি, যার নাম "আনন্দ অন্নদা কুটির"। সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য এটি খুলনা বিভাগের অন্যতম আবেগঘন ঠিকানা।

লেখক: চিকিৎসক, কবিরাজ-বংশ, দুই শতাধিক বই

নীহাররঞ্জন গুপ্তের জন্ম ১৯১১ সালের ৬ জুন কলকাতায়, বাবার কর্মস্থলে (বাংলা উইকিপিডিয়া) — পৈতৃক বাড়ি ছিল ইতনায়; বিখ্যাত কবিরাজ বংশের সন্তান তিনি নিজেও ছিলেন চিকিৎসক (দৈনিক যশোর)। মাত্র ১৮ বছর বয়সে প্রথম উপন্যাস "রাজকুমার" লিখে সাহিত্যিক স্বীকৃতি পান; জীবনে রচনা করেছেন প্রায় ২০০ গ্রন্থ — কালোভ্রমর, উল্কা, নিশিপদ্ম, হাসপাতাল, রাতের রজনীগন্ধা, চৌধুরী বাড়ি, লালু ভুলুসহ (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস/অচিনদেশে)। তবে তাঁর অমর সৃষ্টি গোয়েন্দা কিরীটী রায় — উপমহাদেশজুড়ে স্মরণীয় হয়ে আছেন এই চরিত্রের স্রষ্টা হিসেবে। ১৯৮৬ সালের ২০ জানুয়ারি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয় (বাংলা উইকিপিডিয়া)। জন্ম-কর্ম কলকাতায় হলেও ইতনার এই বাড়িটিই ছিল তাঁর শিকড় — এবং আজ তাঁর স্মৃতির একমাত্র স্থাপত্য-ঠিকানা।

বাড়িটি: দশ কক্ষ, কুলঙ্গি-আলমারি, পুকুর আর মন্দির

প্রায় ৭০ শতক (প্রায় দুই বিঘা) জমির ওপর ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলীর দ্বিতল বাড়িটি (বাংলা উইকিপিডিয়া/ভ্রমণগাইড) স্থানীয় ইতিহাসে প্রায় দুই শ বছরের পুরনো বলে কথিত (দৈনিক যশোর)। বাড়ির বিন্যাসটা অভিনব: একাংশ দ্বিতল — বারান্দাসহ তিনটি কক্ষ; অন্য অংশ একতলা — খিলানযুক্ত সরু বারান্দাসহ সাতটি কক্ষ; সবমিলিয়ে মোট দশটি ঘর (ভ্রমণগাইড/অচিনদেশে)। প্রতিটি কক্ষে একাধিক কুলঙ্গি ও দেয়াল-খাঁজে তৈরি আলমারি; দরজা-জানালা ও আলমারিতে কাঠের কারুকার্যময় ফুল-লতাপাতার অলংকরণ বাড়িটির শৈল্পিক সৌন্দর্য বাড়িয়েছে (ভ্রমণগাইড)। সামনে একটি পুকুর, চত্বরে পরিবারের পূজার মন্দির — যেখানে নীহাররঞ্জনের পরিবার পূজা-অর্চনা করত (অচিনদেশে)। আসবাবপত্র তেমন টিকে নেই, কিন্তু স্থাপত্যের কাঠামোটাই যথেষ্ট চোখে পড়ার মতো।

শিশুস্বর্গ-২: যখন সুলতান এলেন ইতনায়

বাড়িটির ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়টি এস এম সুলতানের সঙ্গে জড়িত। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এই বাড়িতেই চলত ইতনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (বাংলা উইকিপিডিয়া)। এরপর ১৯৯৩ সালের ২৪ নভেম্বর ইতনার চিত্রশিল্পী আলী আজগর রাজা ও শিক্ষক নারায়ণ চন্দ্র বিশ্বাস বাড়িটিতে গড়ে তোলেন শিশুদের ছবি আঁকা শেখানোর কেন্দ্র "শিশুস্বর্গ-২" — উদ্বোধন করেন স্বয়ং এস এম সুলতান (বাংলা উইকিপিডিয়া)। যিনি নিজের "শিশুস্বর্গ" বজরা নিয়ে নড়াইলে শিশুদের রং শেখাতেন, তিনিই এসে আরেক সাহিত্যিকের ভিটায় জ্বালিয়েছিলেন দ্বিতীয় শিশুস্বর্গের প্রদীপ। দুর্ভাগ্যবশত যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে কার্যক্রমটি পরে বন্ধ হয়ে যায় (ভ্রমণগাইড)।

সংরক্ষিত পুরাকীর্তি, তবু অবহেলার অভিযোগ

২০০৩ সালে বাংলাদেশ সরকার বাড়িটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে; মালিকানা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের (বাংলা উইকিপিডিয়া)। দৈনিক যশোরের প্রতিবেদন (২০২৩) অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ভগ্নদশায় থাকার পর ২০১৭ সালে বাড়িটির সংস্কার করা হয়েছিল। অন্যদিকে ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে চিত্রটি ভিন্ন: বাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে, লেখকের জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকীও এখানে যথাযথ পালিত হয় না (গ্রামবাসী আলী আজগর রাজা), প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সামনে একটি সাইনবোর্ড টাঙিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে বলে ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের অভিযোগ; তবে উপজেলা প্রশাসন ও জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে সংরক্ষণের উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)। অর্থাৎ, ঘোষণা আছে, সাইনবোর্ড আছে, ইতিহাস আছে — নেই শুধু নিয়মিত যত্নের নিশ্চয়তা। দর্শনার্থী হিসেবে যান এই বাস্তবতা মেনে: ভেতরে ঢুকতে পারা নির্ভর করবে স্থানীয়দের সহযোগিতার ওপর।

কীভাবে যাবেন

বাড়িটি লোহাগড়া সদর থেকে মাত্র ৫.৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে ইতনা গ্রামে (বাংলা উইকিপিডিয়া) — ইতনা বাজারের পশ্চিম দিক দিয়ে ইতনা বালিকা বিদ্যালয়গামী রাস্তা ধরে এগিয়ে কাঁচা রাস্তার সামনে বাড়িটির অবস্থান। নড়াইল জেলা শহর থেকে লোহাগড়া হয়ে আসতে হয় (ভ্রমণগাইড অনুযায়ী শহর থেকে ~১৮ কিলোমিটার)। একদিনের ছক: সকালে সুলতান কমপ্লেক্স, দুপুরে লোহাগড়া-ইতনা, বিকেলে নূর মোহাম্মদ নগর। কাছেই রয়েছে নিরিবিলি পিকনিক স্পট — রাত্রিযাপনের সুযোগসহ (অচিনদেশে); নড়াইলে রাত কাটালে সেটি বা সুলতান কমপ্লেক্স-কেন্দ্রিক শহরের থাকার ব্যবস্থা দেখুন। বাড়িতে গেলে স্থানীয় কাউকে সঙ্গে নিন — গ্রামের রাস্তায় বাড়িটি খুঁজে পেতে এবং ভেতরটা দেখতে তাঁদের সাহায্যই সবচেয়ে কার্যকর।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

নীহাররঞ্জন গুপ্ত কে ছিলেন?

জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক ও চিকিৎসক (১৯১১–১৯৮৬) — গোয়েন্দা চরিত্র কিরীটী রায়ের স্রষ্টা; প্রায় ২০০ গ্রন্থের লেখক, যার মধ্যে কালোভ্রমর, উল্কা, নিশিপদ্ম উল্লেখযোগ্য।

বাড়িটি কোথায়, কত পুরনো?

লোহাগড়া উপজেলার ইতনা গ্রামে, উপজেলা সদর থেকে ৫.৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে; স্থানীয় ইতিহাসে প্রায় ২০০ বছরের পুরনো বলে কথিত (দৈনিক যশোর)। ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলীর দ্বিতল বাড়িটির নাম "আনন্দ অন্নদা কুটির"।

শিশুস্বর্গ-২ কী ছিল?

১৯৯৩ সালে আলী আজগর রাজা ও নারায়ণ চন্দ্র বিশ্বাসের প্রতিষ্ঠিত শিশু চিত্রকলা কেন্দ্র, যা উদ্বোধন করেন এস এম সুলতান; পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এখন বন্ধ।

বাড়িটি কি এখন দেখা যায়?

২০০৩ সালে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষিত (প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর); ২০১৭-তে সংস্কারের খবর এলেও অবহেলার অভিযোগও রয়েছে — ভেতরে প্রবেশ স্থানীয় সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল।

কাছে আর কী আছে?

লোহাগড়ার নিরিবিলি পিকনিক স্পট (রাত্রিযাপনসহ) ও একই জেলায় সুলতান কমপ্লেক্স ও নূর মোহাম্মদ কমপ্লেক্স।

শেষকথা

কিরীটী রায়ের গল্প পড়ে বড় হওয়া প্রজন্মের কাছে ইতনার এই বাড়িটি কেবল একটি পুরনো ভবন নয় — বাংলা রহস্যসাহিত্যের জন্মভূমির শিকড়। সাইনবোর্ডের বাইরে এর যত্ন যেমনই হোক, একবার দাঁড়িয়ে পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে বাড়িটির দিকে তাকালে দুই শ বছরের ইতিহাস নিজে থেকেই কথা বলে ওঠে।