মাগুরা ছোট জেলা, শহরটাও ছিমছাম — কিন্তু শহরটাকে কেন্দ্র করে আধা দিনের হাঁটাপথেই ছড়িয়ে আছে তিনটি ভিন্ন যুগের গল্প: সন্ন্যাসীদের তপস্যাভূমি এক প্রাচীন মঠ, গুপ্তযুগের ধ্বংসাবশেষ বলে বিশ্বাস করা এক রহস্যময় ঢিবি, আর নবগঙ্গার পাড়ে এক পীরের দরগাহ। মোহাম্মদপুর আর শ্রীপুর দেখতে এলে শহরের এই ত্রয়ী ঘুরে গেলেই মাগুরা সফর পূর্ণ হয়।
আঠারখাদা সিদ্ধেশ্বরী মঠ: শ্মশান থেকে তীর্থ
মাগুরা শহর থেকে মাত্র দেড় মাইল (প্রায় ৩ কিলোমিটার) উত্তরে, আঠারখাদা গ্রামে নবগঙ্গা নদীর তীরে সিদ্ধেশ্বরী মঠ (আদার বেপারী)। সুপ্রাচীনকালে এই স্থানটির পরিচিতি ছিল "কালিকাতলা শ্মশান" — গভীর জঙ্গলে ঘেরা শান্ত পরিবেশে সন্ন্যাসীরা তপস্যা করতেন, আর সপ্তদশ শতক ও তারও আগে নবগঙ্গা ধরে কামাখ্যা তীর্থে যাওয়ার পথে পুণ্যার্থীরা এখানে সমবেত হতেন (আদার বেপারী)। মঠটির প্রাতিষ্ঠানিক রূপের কাহিনি জড়িত নলডাঙ্গার রাজপরিবারের সঙ্গে: প্রখ্যাত সন্ন্যাসী ব্রহ্মাণ্ডগিরি (ব্রহ্মানন্দগিরি) নলডাঙ্গার রাজা শ্রীমন্ত রায়কে (রণবীর খাঁ) দীক্ষা দিলে গুরুর আদেশে রাজা এখানে সাধুদের বসবাসের আশ্রম নির্মাণ করে দেন এবং মঠ পরিচালনার জন্য ২৫০ বিঘা নিষ্কর জমি দান করেন (আদার বেপারী)। সন্ন্যাসীর তিরোধানের পর অযত্নে মঠটি আবার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে জঙ্গলে ঢেকে যায়; প্রায় দুই শ বছর পর সাধু অমলানন্দ স্বপ্নাদেশ পেয়ে এখানে এসে প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের ওপর নতুন পাকা মন্দির নির্মাণ করে মঠটি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন (আদার বেপারী)। জেলা-তালিকাগুলোতে মঠবাড়িটিকে সুলতানি আমলে প্রতিষ্ঠিত বলেও উল্লেখ এসেছে। আজ মঠটি ভক্তদের কাছে তীর্থস্থান — নির্জন নদীতীর, বটের ছায়া আর মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি মিলে জায়গাটির পরিবেশ আজও ধ্যানমগ্ন।
ভাতের ভিটা: অর্ধেক বানানো মসজিদ আর ফেলে যাওয়া ভাতের ঢিবি
মাগুরা সদরের টিলা গ্রামে, ফটকী নদীর উত্তর পাড়ে ভাতের ভিটা ঢিবি — জেলার সবচেয়ে রহস্যময় পুরাকীর্তি। মনে করা হয়, গুপ্ত সাম্রাজ্যের সময়ে এখানে একটি বৌদ্ধ সংঘারাম ছিল (সববাংলায়)। নামের পেছনের গল্পটি লোককথার: পরবর্তীতে এক দরবেশ এখানে মসজিদ নির্মাণ শুরু করেন; নির্মাণের ফাঁকে ক্ষুধা মেটাতে ভাত রাঁধেন — কিন্তু মসজিদ শেষ হওয়ার আগেই ভোর হয়ে গেলে তিনি রান্না করা ভাত ফেলে দিয়েই স্থান ত্যাগ করেন। সেই ফেলে যাওয়া ভাত থেকেই নাকি জায়গাটির নাম "ভাতের ভিটা" (সববাংলায়)। ইতিহাস আর কিংবদন্তির কোন স্তরটি সত্য, তা খনন ছাড়া বলা কঠিন — তবে ঢিবিটির আকার ও অবস্থানই বলে দেয়, প্লাবনভূমির এই জনপদে একসময় তাৎপর্যপূর্ণ কোনো স্থাপনা ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক খনন হলে হয়তো মাগুরার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ হতো — আপাতত ঢিবিটি দাঁড়িয়ে আছে স্থানীয়দের গর্ব আর কৌতূহলের কেন্দ্র হয়ে।
আরও দুটি ঠিকানা ও এক বেলার ছক
শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার পশ্চিমে, মাগুরা-ঝিনাইদহ বিশ্বরোডের পাশে নবগঙ্গার তীরে হযরত পীর মোকাররম আলী শাহ (র.)-এর দরগাহ — মুসলিম ভক্তদের পবিত্র স্থান, যেখানে প্রতি বছর অসংখ্য ভক্তের সমাগম হয় (স্থানীয় ভ্রমণ-তালিকা)। জেলা-তালিকায় আরও নাম পাওয়া যায় তালখড়ি ও কাদিরপাড়া জমিদার বাড়ি, শত্রুজিৎপুর মদনমোহন মন্দির, শ্রীপুরের পীর তোয়াজউদ্দিনের মাজার ও শালিখার চণ্ডীদাস-রজকিনীর ঐতিহাসিক ঘাটের (শিক্ষক বাতায়ন/জেলা তালিকা) — সময় থাকলে সেগুলো পরবর্তী সফরের জন্য তুলে রাখুন। প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য শহর থেকে যাওয়া যায় সিরিজদিয়া বাওড়েও — ঢাকা রোড বাসস্ট্যান্ড থেকে আলোকদিয়া হয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার ভ্যানপথের এই প্রাকৃতিক জলাভূমি পর্যটকদের আকর্ষণ করে (স্থানীয় ভ্রমণ-তালিকা)। শহর-কেন্দ্রিক এক বেলার ছক: সকালে সিদ্ধেশ্বরী মঠ (রিকশা/ভ্যানে ৩ কিলোমিটার), ফিরতি পথে ভাতের ভিটা, বিকেলে মোকাররম আলীর দরগাহ; আর পুরো জেলা চাইলে আগের দুই দিনে মোহাম্মদপুরের সীতারাম রাজধানী আর শ্রীপুরের দুই বাড়ি যোগ করুন। ধর্মীয় স্থানগুলোতে শালীন পোশাক ও স্থানীয় রীতির প্রতি শ্রদ্ধা রাখুন; ভাতের ভিটার ঢিবিতে ওঠা বা খোঁড়াখুঁড়ি করা থেকে বিরত থাকুন — এটি সম্ভাব্য প্রত্নস্থল।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সিদ্ধেশ্বরী মঠ কোথায় এবং কীভাবে যাব?
মাগুরা সদরের আঠারখাদা গ্রামে, শহর থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার উত্তরে নবগঙ্গা নদীর তীরে — রিকশা, টেম্পু বা ভ্যানে যাওয়া যায়।
মঠটির ইতিহাস কী?
প্রাচীন কালিকাতলা শ্মশান ও সন্ন্যাসীদের তপস্যাস্থল; নলডাঙ্গার রাজা শ্রীমন্ত রায় গুরু ব্রহ্মাণ্ডগিরির আদেশে আশ্রম নির্মাণ ও ২৫০ বিঘা নিষ্কর জমি দান করেন; ধ্বংসের পর প্রায় দুই শ বছর বাদে সাধু অমলানন্দ মঠটি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন (আদার বেপারী)।
ভাতের ভিটা কী?
টিলা গ্রামে ফটকী নদীর পাড়ের একটি পুরাকীর্তি ঢিবি — গুপ্তযুগের বৌদ্ধ সংঘারাম ছিল বলে মনে করা হয়; নামের পেছনে অর্ধেক-বানানো মসজিদ ও এক দরবেশের ফেলে যাওয়া ভাতের লোককথা (সববাংলায়)।
মোকাররম আলী শাহের দরগাহ কোথায়?
শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার পশ্চিমে, মাগুরা-ঝিনাইদহ সড়কের পাশে নবগঙ্গার তীরে; বছরে ভক্তদের বড় সমাগম হয়।
মাগুরা শহরে কত সময় রাখা উচিত?
শহরের তিনটি স্থান এক বেলায় (৩–৪ ঘণ্টা) দেখা যায়; পুরো জেলা — মোহাম্মদপুর ও শ্রীপুরসহ — দুই দিনের সফর আদর্শ।
শেষকথা
মাগুরা শহরের সৌন্দর্য তার আকারে নয়, তার স্তরে স্তরে জমে থাকা সময়ে — গুপ্তযুগের সম্ভাব্য সংঘারাম, সুলতানি-নবাবি যুগের মঠ, আর নদীতীরের দরগাহ। ছোট শহরটির এই তিন ঠিকানা মিস করলে মাগুরার অর্ধেক গল্পই অজানা থেকে যাবে।