• 30 Oct, 2026

কালীগঞ্জের বেথুলীতে (মল্লিকপুর/সুইতলা) ২০০–২৫০ বছরের বটগাছ — ৪৫টি উপবৃক্ষে ২.৩৩ হেক্টর ছাউনি, কলকাতার গ্রেট ব্যানিয়ানের চেয়েও বড় আচ্ছাদন। অথচ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদনে গাছটি অবহেলায় মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। ইতিহাস, বর্তমান সংকট ও যাওয়ার পথ।

একটি গাছ, অথচ দেখতে যেন একটি ছোট বন — শাখা থেকে নেমে আসা শত শত ঝুরি মাটিতে ঢুকে নিজেরাই কাণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর সেই কাণ্ডগুলোকে ধরে ছাউনি ছড়িয়ে গেছে ২.৩৩ হেক্টরজুড়ে। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বেথুলী গ্রামের এই বটগাছ (Ficus benghalensis) স্থানীয়দের কাছে মল্লিকপুর বা সুইতলার বটগাছ নামে পরিচিত; আকারের কারণে আজকাল অনেকে এটিকে "বিশ্ববট" নামেও ডাকছেন (বাংলাপিডিয়া)। একই কালীগঞ্জের মাটিতে ঘুমিয়ে থাকা সুলতানি শহর বারোবাজারের পাশাপাশি এই জীবন্ত প্রাচীন বৃক্ষটিও জেলার অনন্য সম্পদ — কিন্তু চলতি অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদনগুলোর খবর উদ্বেগের: দীর্ঘ অবহেলায় গাছটি আজ ধ্বংসের মুখে।

গাছটির পরিচয়: কুমারের কুয়া থেকে ৪৫টি গাছ

বাংলাপিডিয়ার নথি অনুযায়ী গাছটির অবস্থান কালীগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার পূর্বে, কালীগঞ্জ-আড়পাড়া-খাজুরা সড়কের ত্রিমোহনীর পাশে, মালিয়াট ইউনিয়নের বেথুলী গ্রামের উত্তর-পশ্চিম কোণে। জনশ্রুতি বলছে, প্রায় ২০০–২৫০ বছর আগে এক স্থানীয় কুমারের কুয়ার দেয়াল বেয়ে গাছটির জন্ম। মূল গাছটি অনেক আগেই মারা গেছে; তার শাখা-ঝুরি থেকে সৃষ্টি হয়েছে মোট ৪৫টি উপবৃক্ষ — যার ৩৪৫টি ঝুরি ইতিমধ্যে মাটিতে প্রতিষ্ঠিত, ৩৮টি এখনো ঝুলন্ত অবস্থায় আছে। মাঝখানটা ফাঁকা, চারপাশ দেয়াল দিয়ে ঘেরা সংরক্ষিত বটতলা। জেলা প্রশাসনের পর্যটন-তথ্যে গাছটিকে এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ও প্রাচীন বটবৃক্ষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; সংবাদ-প্রতিবেদনে বয়স ২৫০–৩০০ বছর বা তারও বেশি বলা হলেও বাংলাপিডিয়ার হিসাব ২০০–২৫০ বছর — বৈজ্ঞানিক নথি হিসেবে সেটিই নির্ভরযোগ্য ভিত্তি।

কলকাতার বিখ্যাত বটগাছের চেয়েও বড় ছাউনি

তুলনাটা চমকপ্রদ: কলকাতার শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনের বিশ্ববিখ্যাত "দ্য গ্রেট ব্যানিয়ান"-এর আচ্ছাদন ২.২২ হেক্টর, বেথুলীর বটগাছের ছাউনি ২.৩৩ হেক্টর — আচ্ছাদনের হিসাবে বেথুলীর গাছটিই কিছুটা বড় (বাংলাপিডিয়া)। পার্থক্য হলো পরিবেশে: শিবপুরের গাছটি বেড়ে উঠেছে সুনিয়ন্ত্রিত উদ্ভিদ-উদ্যানের যত্নে, বেথুলীরটি প্রাকৃতিক নিয়মে, চারদিকের কৃষিজমির ভেতরে — কারো পরিকল্পনা ছাড়াই। এই "যত্নহীন বিস্তার" একদিকে তার মহিমা, অন্যদিকে আজকের সংকটেরও কারণ।

শুধু গাছ নয়, একটি বাস্তুতন্ত্র

বটগাছের ছাউনি মানেই ছায়ার নিচে আরেক জগৎ: এর ছোট লাল পাকা ফল পাখিদের প্রিয় খাবার, শাখা-ঝুরির জটে বাসা বাঁধে নানা পাখি ও প্রাণী (বাংলাপিডিয়া) — অর্থাৎ গাছটি মরলে ক্ষতিটা শুধু একটি গাছের নয়, একটি পুরো আবাস-ব্যবস্থার। বট হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে পবিত্র বৃক্ষ হিসেবেও শ্রদ্ধেয়, ভেষজমূল্যের কথাও প্রাচীনকাল থেকে জানা। মল্লিকপুরের ক্ষেত্রে বাড়তি মাত্রা হলো ইতিহাস — এই ছাউনির নিচে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পথিক বিশ্রাম নিয়েছে, হাটের মানুষ ছায়া খুঁজেছে। তাই বটতলায় দাঁড়ালে অনুভূতিটা শুধু "বিশাল গাছ দেখলাম" নয় — একটি জীবন্ত ঐতিহ্যের ভেতরে ঢুকে পড়া।

মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে: অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদন

সাম্প্রতিক দুটি প্রতিবেদনের সুর একই এবং কঠোর। বাংলাদেশের খবরের প্রতিবেদনে (অক্টোবর ২০২৬) শিরোনামই বলছে — "এশিয়ার বৃহত্তম বটবৃক্ষ আজ মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে": দীর্ঘদিনের অযত্ন, অবহেলা ও অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণে গাছটি প্রায় ধ্বংসের মুখে; একসময় যার ছায়ায় পথিকের ক্লান্তি দূর হতো আর পাখির কলকাকলিতে চারপাশ মুখর থাকত, সেই গাছের টিকে থাকাই এখন প্রশ্নের মুখে। আরেকটি প্রতিবেদনে (ক্রাইমঅব২৪, ২৩ অক্টোবর ২০২৬) স্থানীয়দের অভিযোগের সারমর্ম: সঠিক পরিচর্যা ও তদারকির অভাবে মূল ও শাখা-প্রশাখা নষ্ট হচ্ছে; স্থানটি ঝিনাইদহে হলেও বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণ-কাঠামো যশোরকেন্দ্রিক হওয়ায় তদারকিতে জটিলতা তৈরি হয়েছে; দর্শনার্থীরা এলেও গাছের দেখভালের কেউ নেই — স্থানীয়রা অবিলম্বে কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। পরিস্থিতিটা যশোরের কেশবপুরে অবহেলা আর খাদ্য-সংকটে থাকা হনুমানদের মতোই — প্রাকৃতিক ঐতিহ্য টিকে থাকে যত্নে, অবহেলায় নয়। দর্শনার্থী হিসেবে আপনার ভূমিকা: দেয়ালের ভেতরে গাছের গায়ে ভর দেবেন না, ঝুরি টানবেন না, ময়লা ফেলবেন না — আর সম্ভব হলে এই সংকটের কথা ছড়িয়ে দিন, জনসচেতনতাই এ ধরনের সম্পদের প্রথম রক্ষাকবচ।

কীভাবে যাবেন ও কখন

ঝিনাইদহ শহর বা যশোর দিক থেকে বাসে কালীগঞ্জ বাজার; সেখান থেকে পূর্বদিকে প্রায় ৯ কিলোমিটার — ভ্যান/ইজিবাইক/অটোতে হাসপাতাল মোড় হয়ে মল্লিকপুর বাজার, তার কাছেই বেথুলীর বটতলা (ভ্রমণ-বর্ণনা অনুযায়ী)। বটতলায় সাধারণত অনানুষ্ঠানিক দর্শন চলে; স্থানীয় দোকানপাট ও ছায়ায় বসার জায়গা আছে। বিশাল ছাউনির পুরো চেহারা দেখতে সকালের আলো ভালো; গরমের দিনে বটতলার ঠান্ডা ছায়াই বাড়তি পাওনা। একই সফরে কালীগঞ্জের দক্ষিণে বারোবাজার (প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে উপজেলা সদর থেকে) যোগ করলে দিনটি হয়ে ওঠে প্রকৃতি ও প্রত্নতত্ত্বের জোড়া অভিজ্ঞতা; উপজেলার আরেক পরিচিত লোক-ঐতিহ্যের ঠিকানা গাজী-কালু-চম্পাবতীর মাজারও পথে পড়তে পারে। থাকার ব্যবস্থা কালীগঞ্জ বা ঝিনাইদহ শহরে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

গাছটি কোথায়, কী নামে পরিচিত?

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বেথুলী গ্রামে (মালিয়াট ইউনিয়ন); মল্লিকপুর/সুইতলার বটগাছ নামে পরিচিত, আকারের জন্য "বিশ্ববট" নামেও ডাকা হয় (বাংলাপিডিয়া)।

গাছটি কত বড় ও কত পুরনো?

৪৫টি উপবৃক্ষ নিয়ে ছাউনি ২.৩৩ হেক্টর; ৩৪৫টি ঝুরি মাটিতে প্রতিষ্ঠিত। বয়স বাংলাপিডিয়ার হিসাবে আনুমানিক ২০০–২৫০ বছর (কুমারের কুয়ার দেয়ালে জন্ম — জনশ্রুতি)।

"এশিয়ার বৃহত্তম" দাবিটি কি নির্ভরযোগ্য?

জেলা প্রশাসনের পর্যটন-তথ্যে এটিকে এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ও প্রাচীন বটবৃক্ষ বলা হয়েছে; কলকাতার গ্রেট ব্যানিয়ানের (২.২২ হেক্টর) চেয়ে এর আচ্ছাদন বড় — তবে "বৃহত্তম" কোনো একক আনুষ্ঠানিক পরিমাপের স্বীকৃত খেতাব নয়।

গাছটির বর্তমান অবস্থা কেমন?

অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী আশঙ্কাজনক — অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ক্ষয় বাড়ছে; স্থানীয়রা জরুরি সরকারি উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন।

দেখতে কতক্ষণ লাগবে?

তাড়াহুড়ো না করলে আধঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা — ছাউনির ভেতরটা হেঁটে, মূল কাণ্ডের ফাঁকা কেন্দ্রটা ঘুরে আর ঝুরির সারিগুলো খেয়াল করে দেখতেই সময় যায়। সকালে গেলে পাখির ডাকের বাড়তি সঙ্গ মেলে।

দেখতে টিকিট লাগে?

আনুষ্ঠানিক টিকিটের নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি; বটতলা দেয়াল-ঘেরা সংরক্ষিত এলাকা — পৌঁছে স্থানীয় নিয়ম জেনে ভেতরে যান।

শেষকথা

দুই শতকের বেশি সময় ধরে নিজে নিজেই বেড়ে ওঠা এই গাছটির কাছে আমরা ঋণী তার ছায়া, তার পাখি আর তার নীরব মহিমার জন্য। প্রতিবেদনগুলো যা বলছে তা স্পষ্ট — সময় থাকতে যত্ন না নিলে "এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম বটগাছ" শুধু বাংলাপিডিয়ার পাতায়ই থেকে যাবে। যান, দেখুন, ছবি তুলুন — আর গাছটির জন্য আওয়াজটাও তুলুন।