• 30 Oct, 2026

শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সংসদ ভবন — লুই আই কানের বিশ্ববিখ্যাত নকশা, ১৯৬৪–৮২ নির্মাণকাল, আগা খান পুরস্কার, সংসদ লেক ও মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে দেখার নিয়মসহ আগারগাঁও এলাকার পূর্ণ গাইড।

লেকের পানিতে প্রতিবিম্ব ফেলে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল কংক্রিটের জ্যামিতিক কাঠামোটি পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত আধুনিক ভবনগুলোর একটি — ঢাকার শেরেবাংলা নগরের জাতীয় সংসদ ভবন। মার্কিন স্থপতি লুই আই কানের এই সৃষ্টি শুধু সংসদের অধিবেশন-কক্ষ নয়, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় স্থাপত্য-আইকন। মানিক মিয়া এভিনিউ ধরে হাঁটলেই এর দেখা মেলে — অনেকটা কার্জন হলের লাল ইটের মতোই, এই ভবনও ঢাকার পরিচয়-চিহ্ন।

দ্বিতীয় রাজধানীর পরিকল্পনা থেকে কানের নকশা

গল্পের শুরু পাকিস্তান আমলে: ১৯৫৯ সালে ঢাকাকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাজধানী করার পরিকল্পনায় শেরেবাংলা নগরে সংসদ ভবন গড়ার সিদ্ধান্ত হয়; ১৯৬১ সালে অধিগ্রহণ করা হয় ২০৮ একর জমি (অনুশীলন/রোর বাংলা)। তরুণ স্থপতি মাজহারুল ইসলামের পরামর্শে প্রথমে আলভার আলটো ও ল্য করবুসিয়েকে প্রস্তাব দেওয়া হলেও তাঁরা ব্যস্ত থাকায় দায়িত্ব পান মাজহারুলের ইয়েল-শিক্ষক লুই আই কান — ১৯৬২ সালের মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে (রোর বাংলা)। কান নকশা জমা দেন ১৯৬২ সালেই; নির্মাণ শুরু হয় ১৯৬৪ সালে। প্রাথমিক পরিকল্পনায় কমপ্লেক্সে সুপ্রিম কোর্ট, মসজিদ ও রাষ্ট্রপতির বাসভবনও ছিল — পরে সেগুলো বাদ দিয়ে মূল ভবনকেই কেন্দ্রে রাখা হয় (অনুশীলন)।

যুদ্ধ, কানের মৃত্যু আর ১৯৮২-এর উদ্বোধন

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্মাণ বন্ধ থাকে; কাজ আবার শুরু হয় ১৯৭৪ সালে — সেই বছরই মারা যান লুই কান, বাকি কাজ এগিয়ে নেন মাজহারুল ইসলামসহ তাঁর সহযোগীরা (অনুশীলন/সুকবিলাশ)। ব্যয় প্রাথমিক ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ ডলারে। নির্মাণ শেষে ১৯৮২ সালের ২৮ জানুয়ারি ভবনটি উদ্বোধন করা হয়, আর ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮২-তে বসে প্রথম সংসদ অধিবেশন (অনুশীলন)। ১৯৮৯ সালে ভবনটি পায় স্থাপত্যের মর্যাদাপূর্ণ আগা খান অ্যাওয়ার্ড (অনুশীলন)।

স্থাপত্য: আলো, জ্যামিতি আর পানি

প্রায় ২০০ একর কমপ্লেক্সের মাঝখানে ৯ তলা মূল ভবনটির (উচ্চতা প্রায় ৪৯.৭ মিটার, কুহুডাক) তিনটি অংশ — প্রধান প্লাজা, দক্ষিণ প্লাজা ও প্রেসিডেন্সিয়াল প্লাজা; কেন্দ্রে বৃত্তাকার অ্যাসেম্বলি হল, যেখানে ৩৫৪ জন সদস্যের আসন (ইভেন্ডো)। দেয়ালে বৃত্ত, বর্গ ও ত্রিভুজের বিশাল জ্যামিতিক খোলস-জানালা, গভীরে ঢুকে যাওয়া বারান্দা আর আলো-আঙিনা (লাইট কোর্ট) দিয়ে ভেতরে ঢোকে প্রাকৃতিক আলো — কানের বিখ্যাত "আলো ও নীরবতা"র দর্শন এখানে মাটি-পানির বাংলার রূপ পেয়েছে। ভবনটি ঘিরে থাকা সংসদ লেকের কারণে দূর থেকে মনে হয়, কাঠামোটি পানির ওপর ভাসছে। কমপ্লেক্সে আরও আছে সাংসদদের আবাসিক ভবন, বাগান ও প্রশস্ত লন — রমনা-সোহরাওয়ার্দীর পর এটাই রাজধানীর দ্বিতীয় বড় সবুজ-জলাশয়ের পরিসর।

দর্শনার্থীদের জন্য নিয়ম

সংসদ ভবন সংরক্ষিত এলাকা — ভেতরে ঢুকতে হলে আগে থেকে সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট (প্রোটোকল) বিভাগ থেকে অনুমতি/দর্শনার্থী পাস নিতে হয়, অধিবেশন চলাকালে বিধিনিষেধ আরও কঠোর (ইভেন্ডো)। সাধারণ ভ্রমণকারীর জন্য সেরা উপায় বাইরের পরিসর: মানিক মিয়া এভিনিউ ও দক্ষিণ প্লাজা দিক থেকে ভবন ও লেকের প্রশস্ত দৃশ্য, বিকেলের আলোয় ছবি তোলা, ও লেকপাড়ের হাঁটা। ড্রোন ওড়ানো নিষিদ্ধ (কুহুডাক)। যাতায়াত: মেট্রোরেলে আগারগাঁও স্টেশন নেমে রিকশা/হাঁটা; ফার্মগেট থেকেও কাছাকাছি। এলাকায় আরও আছে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর এবং কাছেই নভোথিয়েটার — আগারগাঁও ঘোরাটা একসঙ্গে সাজানো যায়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

জাতীয় সংসদ ভবনের স্থপতি কে?

মার্কিন স্থপতি লুই আই কান; বাংলাদেশি স্থপতি মাজহারুল ইসলামের উদ্যোগে তিনি দায়িত্ব পান (রোর বাংলা)।

নির্মাণ কবে শুরু ও শেষ হয়?

শুরু ১৯৬৪ সালে, যুদ্ধের কারণে বিরতি দিয়ে শেষ ১৯৮২ সালে; উদ্বোধন ২৮ জানুয়ারি ১৯৮২ (অনুশীলন)।

ভবনটি কোন পুরস্কার পেয়েছে?

১৯৮৯ সালে স্থাপত্যের আগা খান অ্যাওয়ার্ড (অনুশীলন)।

সাধারণ দর্শনার্থী কি ভেতরে যেতে পারেন?

আগাম অনুমতি/পাস সাপেক্ষে; সাধারণত বাইরের প্লাজা ও লেকপাড় থেকেই দর্শন করা হয় (ইভেন্ডো)।

কীভাবে যাবেন?

মেট্রোরেলে আগারগাঁও স্টেশন, সেখান থেকে রিকশা বা হাঁটা; ফার্মগেট দিক থেকেও সহজ (ইভেন্ডো)।

শেষকথা

পৃথিবীর স্থাপত্য-শিক্ষার্থীরা যে ভবনটি দেখতে ঢাকায় আসেন, সেটি আমাদের নিজের শহরেই দাঁড়িয়ে আছে পানির ধারে। বিকেলের আলোয় সংসদ লেকের পাড়ে দাঁড়িয়ে জ্যামিতিক দেয়ালে আলোর খেলা দেখা — ঢাকার সবচেয়ে গভীর স্থাপত্য-অভিজ্ঞতাগুলোর একটি।