• 29 Oct, 2026

পারকি সমুদ্র সৈকত ভ্রমণ গাইড: পতেঙ্গার উল্টো পাড়ে ঝাউবনের সৈকত

পারকি সমুদ্র সৈকত ভ্রমণ গাইড: পতেঙ্গার উল্টো পাড়ে ঝাউবনের সৈকত

চট্টগ্রাম শহর থেকে মাত্র ঘণ্টাখানেক দূরে, কর্ণফুলীর মোহনায় ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ পারকি সৈকত — ঝাউবন, লাল কাঁকড়া আর মোহনার সূর্যাস্ত; টানেল, সেতু ও নৌকা — তিন রুটের যাতায়াতসহ সম্পূর্ণ ভ্রমণ গাইড।

চট্টগ্রামে সৈকত বলতে সবাই ছোটে পতেঙ্গায়। অথচ কর্ণফুলী নদীর মোহনার ঠিক ওপারে, আনোয়ারা উপজেলায়, প্রায় ১৩ কিলোমিটার লম্বা আরেকটা সৈকত ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে ভ্রমণপিপাসুদের তালিকায় — পারকি সমুদ্র সৈকত, স্থানীয়দের কাছে ‘পারকির চর’। মোহনার পশ্চিম তীরে পতেঙ্গা, দক্ষিণ-পূর্ব তীরে পারকি — একই মোহনার দুই চরিত্র: একদিকে বন্দরনগরীর ব্যস্ত সৈকত, অন্যদিকে ঝাউবন আর মাছের ঘেরে ঘেরা শান্ত উপকূল। চট্টগ্রাম জেলার উপকূল ধরে আমাদের আগের লেখা সীতাকুণ্ড: একেক মৌসুমে একেক সাজ-এর পর এই সিরিজে পারকি।

কেন যাবেন পারকিতে?

  • ঝাউবন: সৈকতজুড়ে সারি সারি ঝাউ গাছের ছায়া — স্থানীয়রা জায়গাটাকে সৈকতের চেয়ে ‘ঝাউবাগান’ নামেই বেশি চেনে। বালির ওপর হাঁটার পাশাপাশি ঝাউয়ের ছায়ায় বসে থাকাটাই এখানকার আসল আরাম।
  • মোহনার দৃশ্য: সৈকতের উত্তর দিক ধরে হাঁটলে পৌঁছে যাবেন কর্ণফুলী নদী আর বঙ্গোপসাগরের মিলনস্থলে — একদিকে নদীর স্রোত, অন্যদিকে সাগরের ঢেউ, আর বহির্নোঙরে দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজের সারি।
  • লাল কাঁকড়া ও জেলে জীবন: ভাটার সময় বালুচরে লাল কাঁকড়ার দৌড়াদৌড়ি আর জেলেদের মাছ ধরা-জাল মেরামতের দৃশ্য পারকির নিজস্ব রং।
  • তুলনামূলক কম ভিড়: পতেঙ্গার তুলনায় অনেক শান্ত; পরিবার নিয়ে পিকনিকের জন্য আদর্শ। সৈকতে স্পিডবোট, সি-বাইক ও ঘোড়ায় চড়ার ব্যবস্থা আর ছাতা-চেয়ারের দোকানপাট আছে।

বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের উদ্যোগে এখানে আধুনিক পর্যটন কমপ্লেক্স গড়ার কাজ চলমান — ভবিষ্যতে সুবিধা আরও বাড়বে, তবে এখনকার পারকির আকর্ষণ এর কাঁচা, প্রাকৃতিক রূপটাই।

কীভাবে যাবেন? তিনটি রুট

রুট ১ — কর্ণফুলী টানেল দিয়ে (দ্রুততম অভিজ্ঞতা): দেশের প্রথম নদীর তলদেশের টানেল (প্রায় ৩.৩ কিলোমিটার) পতেঙ্গা প্রান্ত থেকে আনোয়ারায় বের হয়ে আসে। টানেল পেরিয়ে সার কারখানা (সিইউএফএল/কাফকো) যাওয়ার পথ ধরে পারকি। পথে ছোট ছোট পাহাড় আর কেইপিজেড এলাকার আঁকাবাঁকা রাস্তা — যাত্রাটাই দর্শনীয়। গাড়ি/মাইক্রো/সিএনজি রিজার্ভে যেতে হয়; টানেলের টোল ও নিয়মকানুন যাত্রার আগে জেনে নিন।

রুট ২ — শাহ আমানত সেতু হয়ে: তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু পার হয়ে বটতলী-মহসেন আউলিয়ার মাজারগামী বাসে আনোয়ারা; ‘সেন্টার’ (মালখান বাজার) এলাকা থেকে স্থানীয় পরিবহনে সৈকত। সময় ও খরচ তুলনামূলক বেশি হলেও পাবলিক পরিবহনে যাওয়ার এটাই সহজ পথ।

রুট ৩ — নৌকায় নদী পেরিয়ে (রোমাঞ্চ প্রিয়দের জন্য): পতেঙ্গার ১৫ নম্বর জেটি ঘাট থেকে বোটে কর্ণফুলী পার হয়ে ওপারের ঘাট, সেখান থেকে অটোরিকশায় পারকি। নদীপথের অভিজ্ঞতা আলাদা, তবে আবহাওয়া ও জোয়ার-ভাটা মেনে এই রুট বেছে নিন।

সব মিলিয়ে শহর থেকে পৌঁছাতে লাগে প্রায় ১ ঘণ্টা (সড়কপথে দূরত্ব প্রায় ৩০–৩৫ কিলোমিটার)। ফেরার গাড়ি আগেই ঠিক করে রাখুন — সন্ধ্যার পর সৈকত এলাকা থেকে শহরমুখী পরিবহন কমে যায়।

কাছাকাছি আরও যা দেখবেন

  • মহসেন আউলিয়ার মাজার (বটতলী, আনোয়ারা): এলাকার বিখ্যাত প্রাচীন মাজার — সেতু রুটে গেলে যাওয়া-আসার পথেই পড়ে।
  • যাত্রাপথের দৃশ্য: কেইপিজেড এলাকার পাহাড়ি-আঁকাবাঁকা সড়ক আর সার কারখানা এলাকার শিল্প-দৃশ্য পারকি যাত্রার বাড়তি অংশ।

সেরা সময় ও টিপস

  • সেরা সময়: বিকেল — মোহনায় সূর্যাস্ত পারকির সেরা দৃশ্য। ঋতু হিসেবে শীতকাল সবচেয়ে আরামদায়ক; বর্ষায় সৈকত সবুজ থাকে, তবে আবহাওয়া দেখে যান।
  • সাঁতারের ব্যবস্থা ও লাইফগার্ড এখানে সীমিত — গভীর পানিতে নামা থেকে বিরত থাকুন, বিশেষ করে মোহনার স্রোতের কাছে।
  • খাবারের জন্য সৈকতের দোকানপাটে সাধারণ খাবার-নাস্তা মেলে; বড় আয়োজনের খাবার সঙ্গে নেওয়াই ভালো।
  • ভাটার সময় গেলে লাল কাঁকড়া আর বিস্তীর্ণ চর দেখা যায়; জোয়ারে পানি ঝাউবনের কাছাকাছি চলে আসে — সময়টা জোয়ার-ভাটা দেখে ঠিক করুন।
  • নিজের বর্জ্য নিজে ফিরিয়ে আনুন; এই সৈকতের পরিষ্কার রূপটাই এর সম্পদ।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

পারকি সৈকত চট্টগ্রাম শহর থেকে কত দূরে?

সড়কপথে প্রায় ৩০–৩৫ কিলোমিটার; টানেল বা সেতু হয়ে যেতে সময় লাগে প্রায় ১ ঘণ্টা।

পারকি নাকি পতেঙ্গা — কোনটা ভালো?

সুবিধা, খাবার ও সন্ধ্যার আড্ডার জন্য পতেঙ্গা; শান্ত পরিবেশ, ঝাউবন আর মোহনার প্রকৃতির জন্য পারকি। হাতে একদিন থাকলে দুটোই দেখা সম্ভব — সকালে পতেঙ্গা, বিকেলে টানেল হয়ে পারকি।

পারকিতে থাকার ব্যবস্থা আছে?

সৈকত এলাকায় আবাসন সীমিত; সাধারণত চট্টগ্রাম শহরে থেকেই দিনে গিয়ে ফিরে আসা হয়।

শেষকথা

পারকি সেই বিরল জায়গাগুলোর একটি, যেখানে শহর থেকে মাত্র ঘণ্টাখানেক গেলেই পাওয়া যায় একদম অন্যরকম সৈকত — ঝাউয়ের ছায়া, মোহনার বিস্তার আর জেলে জীবনের ছোঁয়া। পরেরবার পতেঙ্গা গেলে টানেলটা পেরিয়ে ওপারটাও দেখে আসুন। আর শহরে ফিরে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যের গল্পে ডুব দিতে চাইলে পড়ুন লালদীঘি নিয়ে আমাদের লেখাটি। আপনার পারকি ভ্রমণ হোক নিরাপদ আর শান্ত!