ভৈরব নদের তীরে একই প্রাঙ্গণে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে এগারোটি প্রাচীন শিব মন্দির — বাংলাদেশে একই জায়গায় এতগুলো শিব মন্দিরের এমন সমাবেশ আর কোথাও দেখা যায় না বলেই বলা হয়ে থাকে। যশোরের অভয়নগর উপজেলার বাঘুটিয়া ইউনিয়নের এই প্রাঙ্গণ শুধু স্থাপত্য নয়, আড়াই শ বছরের পুরনো এক পিতৃস্নেহের স্মৃতি: প্রচলিত ইতিহাসে এই মন্দিরগুলোর পেছনে আছেন এক অকাল-বিধবা রাজকন্যা, যাঁর নামেই আজকের অভয়নগর। যশোর থেকে যশোর-খুলনা মহাসড়ক ধরে নওয়াপাড়া হয়ে, শেষ অংশে খেয়া নৌকায় ভৈরব পেরিয়ে যাওয়া — যাত্রাপথটাও এই ভ্রমণের অংশ।
রাজকন্যা অভয়ার গল্প
প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী (বাংলা উইকিপিডিয়া ও একাধিক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে একই বর্ণনা) মন্দিরগুলো নির্মাণ করেন রাজা প্রতাপাদিত্যের বংশধর রাজা নীলকণ্ঠ রায় — তাঁর রাজধানী ছিল চাঁচড়ায়, কিন্তু বসবাস ছিল ভৈরবের পাড়ের এই জনপদে। তাঁর মেয়ে অভয়ার বিয়ে হয় নড়াইলের জমিদারের ছেলে নীলাম্বর রায়ের সঙ্গে; বিয়ের কিছুদিন পর দুরারোগ্য ব্যাধিতে নীলাম্বর মারা গেলে অল্প বয়সে বিধবা হন অভয়া। সে যুগের সামাজিক বাস্তবতায় দ্বিতীয় বিয়ের পথ ছিল না — অভয়া বাকি জীবন পূজা-অর্চনায় কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। শিবভক্ত মেয়ের ইচ্ছেয় পিতা নীলকণ্ঠ ১৭৪৫ সাল থেকে ১৭৬৪ সালের মধ্যে নদীর ধারে নির্মাণ করেন এগারোটি শিব মন্দির, আর জনপদটির নাম রাখেন মেয়ের নামে — অভয়ানগর, কালক্রমে অভয়নগর। গল্পটির বিস্তারিত ইতিহাসের চেয়ে জনশ্রুতির ধারায় এসেছে, তবে মূল কাঠামো — নির্মাতা, সময়কাল, নামকরণ — সব প্রধান সূত্রেই একরকম।
প্রাঙ্গণের বিন্যাস ও স্থাপত্য
প্রায় ৬০ একরজুড়ে বিস্তৃত প্রাঙ্গণে (স্থানীয় ভ্রমণ-বর্ণনা অনুযায়ী) মন্দিরগুলো সাজানো নির্দিষ্ট নকশায়: সবচেয়ে উত্তরে প্রধান শিব মন্দির, তার পূর্ব ও পশ্চিমে চারটি করে আটটি, আর প্রবেশপথের দুই ধারে দুটি — মোট এগারো। একসময় প্রাঙ্গণে প্রধান-অপ্রধান মিলিয়ে মোট ২১টি মন্দির-কাঠামো ছিল বলে জানা যায় (কালান্তর নিউজ, অক্টোবর ২০২৬)। প্রধান মন্দিরটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪ ফুট ৪ ইঞ্চি, প্রস্থ ২২ ফুট ৩ ইঞ্চি, দেয়াল প্রায় ৩ ফুট ৪ ইঞ্চি পুরু — ইট, চুন-সুরকি আর টেরাকোটার অলংকরণে গড়া এই মন্দিরগুলো অষ্টাদশ শতকের বাংলার মন্দির-স্থাপত্যের প্রতিনিধি। প্রতিটি মন্দিরে খিলান-দরজা, মাঝে প্রশস্ত উঠান। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে থাকা এই স্থাপনায় ২০১৪ সাল থেকে কয়েক বছর সংস্কার কাজ চলার তথ্য মেলে; তবু জরাজীর্ণতা পুরোপুরি কাটেনি।
হারিয়ে যাওয়া শিবলিঙ্গ আর আজকের অবস্থা
জনশ্রুতি ও স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী প্রতিটি মন্দিরে স্থাপিত ছিল একটি করে কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ — কালক্রমে সেগুলোর সবকটিই চুরি হয়ে গেছে (কালান্তর নিউজ, অক্টোবর ২০২৬)। বর্তমানে স্থানীয়দের প্রচেষ্টায় প্রধান মন্দিরে একটি শিবলিঙ্গ স্থাপন করে পূজা চলে; বাকি দশটি মন্দির বিগ্রহশূন্য। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোর সুর একই — সংরক্ষণ, নিয়মিত পরিচর্যা আর পর্যটন-বান্ধব পরিবেশ ছাড়া এই ঐতিহ্য ধরে রাখা কঠিন হচ্ছে; ইতিহাসপ্রেমী দর্শনার্থীদের ভিড় থাকলেও অবকাঠামো সীমিত। স্থানীয় লোককথায় আরেকটি কথা চালু আছে — গভীর রাতে মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে নারীকণ্ঠের চাপা কান্না শোনা যায়, যেন রাজকন্যা অভয়ার দুঃখ আজও বাতাসে ভাসে। লোককথাকে লোককথা হিসেবেই নিন; তবে সন্ধ্যার আলোয় ভৈরবের পাড়ে দাঁড়ালে গল্পটা কেন জন্মেছে, বুঝতে অসুবিধা হয় না। পূজা-অর্চনার স্থান বলে ভেতরে শালীন পোশাক ও নিয়ম মেনে চলুন।
প্রাঙ্গণে হাঁটতে হাঁটতে
দর্শনের অভিজ্ঞতাটা ধীরে উপভোগ করার মতো: প্রবেশপথের দুই ধারের মন্দির পেরিয়ে প্রশস্ত উঠানে ঢুকতেই দুই সারিতে টেরাকোটা-অলংকৃত মন্দিরগুলোর চূড়া চোখে পড়ে, সারির শেষে উত্তরে প্রধান মন্দির — সেখানেই এখন পূজা চলে বলে ঘণ্টার শব্দ আর ধূপের গন্ধে প্রাঙ্গণের এক প্রান্ত জীবন্ত, বাকিটা নীরব। স্থাপত্যে শেষ-মুঘল ও ঔপনিবেশিক যুগের প্রভাবের মিশেল দেখা যায় (ইভেন্ডোর স্থাপত্য-বর্ণনা); প্রতিটি মন্দিরের খিলান-দরজা আর পুরু দেয়ালের ভেতরের ঠান্ডা ছায়া গরমের দিনেও আলাদা। ভৈরবের দিক থেকে বাতাস আসে বলে বিকেলের দিকটা সবচেয়ে আরামদায়ক — নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে পুরো সারিটা এক ফ্রেমে ধরা যায়। ছবি তোলার জন্য সকালের কোমল আলোও ভালো, তবে প্রাঙ্গণের নীরবতা ধরে রাখাটাই এখানকার অনানুষ্ঠানিক নিয়ম।
কীভাবে যাবেন
যশোর সদর থেকে মন্দির প্রাঙ্গণের দূরত্ব প্রায় ৪৫ কিলোমিটার। পথ: যশোর শহর থেকে যশোর-খুলনা মহাসড়কে নওয়াপাড়া (অভয়নগরের শিল্প-শহর ও রেলস্টেশন) — সেখান থেকে ভ্যান বা ইজিবাইকে রাজঘাট এলাকা; তারপর খেয়া নৌকায় ভৈরব নদ পেরিয়ে ওপার থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার হাঁটা বা স্থানীয় যানে মন্দির প্রাঙ্গণ (ভিউজ বাংলাদেশ ও ভ্রমণ-বর্ণনা অনুযায়ী)। অন্য বর্ণনায় নওয়াপাড়ার নুরবাগ থেকে খেয়া ধরে সিংগাড়ি-ভাটপাড়া হয়ে নদীর তীরের রাস্তা — কোন ঘাটে নামবেন, নওয়াপাড়া পৌঁছে স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করে ঠিক করে নিন। খুলনা দিক থেকে এলেও নওয়াপাড়াই মূল গেটওয়ে। দিনের সফর সাজাতে চাইলে: সকালে যশোর শহর থেকে রওনা, দুপুরের আগে প্রাঙ্গণে পৌঁছে ধীরে ঘোরা, বিকেলে নদীর পাড়ে কাটিয়ে সন্ধ্যার আগে ফেরা — শিবরাত্রি ও দোলের সময় ভক্ত-দর্শনার্থীর বিশেষ ভিড় হয়। থাকার ব্যবস্থা যশোর শহর বা নওয়াপাড়ায় সাধারণ মানের।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
মন্দিরগুলো কে, কবে নির্মাণ করেন?
প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী যশোরের রাজা নীলকণ্ঠ রায়, ১৭৪৫–১৭৬৪ সালের মধ্যে — তাঁর বিধবা কন্যা অভয়ার পূজার জন্য। অভয়নগর নামটিও অভয়ার নাম থেকে বলে মনে করা হয়।
আসলে কয়টি মন্দির আছে?
প্রধান এগারোটি শিব মন্দির; একসময় অপ্রধানসহ মোট ২১টি কাঠামো ছিল। উত্তরেরটি প্রধান মন্দির।
শিবলিঙ্গগুলো কোথায়?
স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী আসল কষ্টিপাথরের লিঙ্গগুলো চুরি হয়ে গেছে; এখন প্রধান মন্দিরে স্থানীয়দের স্থাপিত লিঙ্গে পূজা হয়।
যেতে নৌকা লাগে কেন?
প্রাঙ্গণটি ভৈরব নদের ওপারে — নওয়াপাড়া/রাজঘাট দিক থেকে খেয়া নৌকায় নদী পেরোনো যাত্রার অংশ।
খুলনা থেকে যাওয়া যাবে?
যাবে — মহাসড়ক বা ট্রেনে নওয়াপাড়া, সেখান থেকে একই রুট।
শেষকথা
এগারো শিব মন্দিরের শক্তি তার উচ্চতায় নয়, তার গল্পে — এক পিতার গড়া এগারোটি প্রার্থনাঘরে একটি মেয়ের সমগ্র জীবন জড়িয়ে থাকার কথা বাংলার স্থাপত্য-ইতিহাসে বিরল। ভৈরবের স্রোতের শব্দে, টেরাকোটার রেখায় আর বিগ্রহশূন্য গর্ভগৃহের নীরবতায় সেই গল্প আজও শোনা যায় — যদি সময় নিয়ে শোনা যায়।