• 30 Oct, 2026

ভোলার চরফ্যাশনের দক্ষিণে মেঘনা-তেঁতুলিয়ার মোহনায় চর কুকরি-মুকরি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য — ১৫ হাজারের বেশি হরিণ, বুনো মহিষের পাল, শীতের পরিযায়ী পাখি আর সাগরপাড়ের বালিয়াড়ি; কচ্ছপিয়া ঘাট থেকে ট্রলারের সময়সহ যাওয়ার পূর্ণ নির্দেশনা।

ভোলা জেলা শহর থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে, মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগরের কোলে জেগে থাকা এক দ্বীপ — চর কুকরি-মুকরি। নামটা শুনলেই হাসি পায়, কিন্তু এই চরই দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য: হাজার হাজার হরিণ, বুনো মহিষের পাল, শীতে সাইবেরিয়া থেকে আসা পরিযায়ী পাখি, আর চরের বুক চিরে সাগরে গিয়ে মেশা এক খাল। চরফ্যাশন শহরকে ঘাঁটি করে একদিনের নৌভ্রমণে এই বুনো দ্বীপ দেখে আসা যায়।

নামের গল্প ও গড়ে ওঠা বন

স্থানীয় বর্ণনা অনুযায়ী একসময় এই চরে কুকুর আর ইঁদুর (স্থানীয় ভাষায় "মেকুর") ছাড়া তেমন কিছুই চোখে পড়ত না — সেখান থেকেই নাম কুকরি-মুকরি (উইকিভ্রমণ/ভ্রমণট্রিপস)। আজকের ঘন বন কিন্তু অনেকটাই মানুষের হাতে গড়া: ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালে প্রশাসনিক উদ্যোগে এখানে বনায়ন শুরু হয় — প্রথমে শ্বাসমূলীয় গাছের চারা, পরে সুন্দরী, গেওয়া, পশুরসহ নানা প্রজাতি; গোটা এলাকাজুড়ে এখন সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে কেওড়া গাছ, সঙ্গে নারিকেল, বাঁশ ও বেতের বন মিলিয়ে তৈরি হয়েছে ম্যানগ্রোভ শ্বাসমূলীয় বনাঞ্চল (উইকিভ্রমণ)। ভ্রমণট্রিপসের হিসাবে দ্বীপের মোট বনভূমির একটি অংশ (তাদের হিসাবে ২১৭ হেক্টর) বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষিত, বাকি অংশে বসতি ও কৃষি — দ্বীপবাসীর প্রধান পেশা মাছ ধরা ও কৃষিকাজ। অধিকাংশ এলাকা দিনে দুবার জোয়ারে প্লাবিত হয়, আর বনটিকে ভাগ করেছে ছয়টি ছোট খাল বা ক্রীক (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

অভয়ারণ্যের প্রাণীজগৎ: হরিণ, মহিষ আর পরিযায়ী পাখি

বাংলা উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী এই অভয়ারণ্যে রয়েছে ১৫ হাজারেরও বেশি হরিণ — মূলত চিত্রা হরিণ। এ ছাড়া দেখা মেলে বুনো মহিষ ও বন্য গরুর বিশাল পাল, বানর, বনবিড়াল, মেছোবিড়াল, ভোঁদড়, শিয়াল ও বনমোরগের (বাংলা উইকিপিডিয়া/আদার ব্যাপারী)। পাখির মধ্যে বক, শঙ্খচিল, মথুরা, কাঠময়ূর ও কোয়েল; সরীসৃপের মধ্যে গুইসাপ, কচ্ছপ ও নানা সাপ; সৈকতে মেলে লাল কাঁকড়াও। শীতকালে দৃশ্যপট বদলে যায় — সাইবেরিয়াসহ শীতল অঞ্চল থেকে আসা হাজার হাজার অতিথি পাখিতে চরাঞ্চল মুখর হয়ে ওঠে (আমার দেশ/আদার ব্যাপারী)। হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্যের পাহাড়ি বনের সঙ্গে এই জোয়ার-ভাটার ম্যানগ্রোভ অভয়ারণ্যের অভিজ্ঞতা একেবারেই আলাদা — এখানে বন দেখতে হয় নৌকা আর জোয়ারের সময় মিলিয়ে।

ভাড়ানি খাল, বালুর ধুম আর সাগরপাড়

দ্বীপের বুক চিরে বয়ে গেছে ভাড়ানি খাল — মেঘনার বুক থেকে এসে খালটি পড়েছে বঙ্গোপসাগরে (যুগান্তর)। খাল পেরিয়ে সামনে বিস্তীর্ণ বালিয়াড়ি, যাকে স্থানীয়রা ডাকেন "বালুর ধুম" — সেখানে দাঁড়ালে সাগরের শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যায় না। একটু এগোলেই ঢাল চর, তারপরই বঙ্গোপসাগর; এই সাগরপাড় থেকে সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতা অনেকের কাছে কুয়াকাটা-কক্সবাজারের সঙ্গে তুলনীয় (যুগান্তর)। সৈকতের লাল-সবুজ আলো-আঁধারিতে সবুজ বনভূমি যেন আরও মায়াবী হয়ে ওঠে সন্ধ্যায়।

কীভাবে যাবেন ও দরকারি টিপস

পথটা দুই ধাপের: চরফ্যাশন শহর থেকে সড়কপথে কচ্ছপিয়া ঘাট প্রায় ২৫ কিলোমিটার, তারপর নদীপথে আরও ১০–১৫ কিলোমিটার (উইকিভ্রমণ)। কচ্ছপিয়া থেকে যাত্রীবাহী ট্রলার ছাড়ে প্রতিদিন দুপুর সাড়ে ১২টা ও বিকেল ৪টায় (উইকিভ্রমণ) — সময় বদলাতে পারে বলে আগের দিন ঘাটে খোঁজ নিন; দল বড় হলে স্পিডবোট বা ট্রলার রিজার্ভ করাই নির্ভরযোগ্য উপায়। মৌসুমি সতর্কতা: শীতকালে মেঘনা পেরোনো সহজ হলেও বর্ষায় নদী উত্তাল ও তরঙ্গবিক্ষুব্ধ থাকে — ঐ সময় জরুরি প্রয়োজন ছাড়া এই পথে যাওয়ার চেষ্টা না করাই ভালো (উইকিভ্রমণ)। দ্বীপে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা সীমিত — খাবার ও পানি সঙ্গে রাখুন, আর দিনে গিয়ে চরফ্যাশনে ফিরে আসার ছকই সবচেয়ে নিরাপদ; ক্যাম্পিংয়ের ইচ্ছা থাকলে স্থানীয় প্রশাসন/গাইডের সঙ্গে আগে থেকে ব্যবস্থা করে নিন। বনে ঢুকলে বন বিভাগের নিয়ম মানুন, প্রাণীদের খাবার দেবেন না বা তাড়া করবেন না, আর প্লাস্টিক ফেলে আসবেন না।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

চর কুকরি-মুকরি কোথায়?

ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার দক্ষিণে, মেঘনা-তেঁতুলিয়ার মোহনায় বঙ্গোপসাগরের কোলে — ভোলা শহর থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

নামটা এমন কেন?

একসময় চরে কুকুর ও ইঁদুরের (মেকুর) আধিক্য ছিল বলে স্থানীয়দের কাছে এই নামে পরিচিতি পায় (উইকিভ্রমণ/ভ্রমণট্রিপস)।

অভয়ারণ্যে কী কী প্রাণী দেখা যায়?

১৫ হাজারের বেশি হরিণ, বুনো মহিষ-গরুর পাল, বানর, বনবিড়াল, ভোঁদড়, শিয়াল, বনমোরগ আর শীতে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

কীভাবে যাব?

চরফ্যাশন থেকে সড়কে কচ্ছপিয়া ঘাট (প্রায় ২৫ কিমি), তারপর ট্রলারে নদীপথে ১০–১৫ কিমি; ট্রলার ছাড়ে দুপুর সাড়ে ১২টা ও বিকেল ৪টায় (উইকিভ্রমণ) — সময় যাচাই করে নিন।

কখন যাওয়া সবচেয়ে ভালো?

শীতকালে — নদী শান্ত থাকে, পরিযায়ী পাখি মেলে। বর্ষায় উত্তাল মেঘনা পেরোনো ঝুঁকিপূর্ণ (উইকিভ্রমণ)।

শেষকথা

কুকরি-মুকরি সেই বিরল জায়গা, যেখানে বন নিজে থেকে নয়, মানুষের হাতে রোপণ করা গাছে গড়ে উঠে শেষমেশ বন্যপ্রাণীর নিজের রাজ্য হয়ে গেছে। ভাড়ানি খালের নৌকা, বালিয়াড়ির নীরবতা আর হরিণের পালের সামনে দাঁড়ানোর মুহূর্তগুলোই বলে দেয় — বাংলাদেশের দক্ষিণতম এই বুনো দ্বীপে আসাটা ছিল সার্থক।