• 29 Oct, 2026

চট্টগ্রামের মাজার ও ধর্মীয় ঐতিহ্য: বোস্তামীর কাছিম থেকে শাহ আমানতের দরগাহ

চট্টগ্রামের মাজার ও ধর্মীয় ঐতিহ্য: বোস্তামীর কাছিম থেকে শাহ আমানতের দরগাহ

‘বারো আউলিয়ার দেশ’ চট্টগ্রামের ধর্মীয় ঐতিহ্যের ভ্রমণ-গাইড — হযরত বায়েজিদ বোস্তামীর মাজার ও বিশ্ববিখ্যাত বিপন্ন কাছিমের পুকুর, হযরত শাহ আমানতের দরগাহ, গরীবুল্লাহ শাহের দরবার, বদর আউলিয়া ও কদম মোবারক মসজিদ।

চট্টগ্রামকে বলা হয় ‘বারো আউলিয়ার দেশ’ — যুগে যুগে সমুদ্র ও পাহাড়ি পথ ধরে আসা সুফি দরবেশদের খানকাহ আর দরগাহ এই বন্দর নগরীর আত্মায় মিশে আছে। আজও প্রতিদিন হাজারো মানুষ এই মাজারগুলোতে আসেন — কেউ জিয়ারতে, কেউ ইতিহাস খুঁজতে, কেউ বা শুধু কাছিম দেখতে। লালদীঘি: চট্টগ্রামের ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি-র পাশ ঘিরেই এই আধ্যাত্মিক ভূগোলের শুরু।

হযরত বায়েজিদ বোস্তামীর মাজার: কাছিমের পুকুরের রহস্য

নাসিরাবাদে সেনানিবাসের কাছে ছোট পাহাড়ের চূড়ায় ইরানের প্রখ্যাত সুফি হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.) (মৃত্যু ৮৭৪ খ্রিস্টাব্দ)-এর নামে প্রতিষ্ঠিত দরগাহ। সৎভাবে বলা দরকার, ইতিহাসবিদদের মতে তাঁর প্রকৃত সমাধি এখানে নয় — এটি তাঁকে উৎসর্গ করে গড়া প্রতিরূপ; তবু ঊনবিংশ শতকে (প্রচলিত মতে ১৮৩১ সালে) পাহাড়ে আবিষ্কৃত এই সমাধিস্থল ঘিরে ভক্তির ধারা শতাব্দী ধরে অব্যাহত। পাহাড়ের পাদদেশে আওরঙ্গজেবের আমলের ধাঁচে তিন গম্বুজবিশিষ্ট প্রাচীন মসজিদ আর সুবিশাল পুকুর।

পুকুরটাই এখানকার বিশ্ববিখ্যাত আকর্ষণ: এতে বাস করে বোস্তামীর কাছিম — কালো নরম খোলসের কচ্ছপ (বৈজ্ঞানিক নাম নিলসোনিয়া নিগ্রিকান্স), যেটি পৃথিবীর মহাবিপন্ন প্রজাতিগুলোর একটি। একসময় বিজ্ঞানীরা মনে করতেন প্রজাতিটি বন্য পরিবেশে বিলুপ্ত, টিকে আছে শুধু এই পুকুরেই; পরবর্তী গবেষণায় উপমহাদেশের আরও দু-একটি জলাশয়ে এর সন্ধান মিললেও এই পুকুরই এর প্রাচীনতম আবাস। পুকুরে আনুমানিক দুই শতাধিক কাছিম ও প্রচুর গজার মাছ আছে — দর্শনার্থীরা কলা-খই খাওয়ালে তারা সারি বেঁধে ঘাটে ভেসে ওঠে। লোককথায় এরা সাধকের অভিশাপে কাছিমরূপী দুষ্ট জিন — বিশ্বাস যা-ই হোক, প্রাণীগুলোকে বিরক্ত না করাই নিয়ম; তত্ত্বাবধানে আছে চিটাগাং এনডাউমেন্ট কমিটি।

হযরত শাহ আমানত (রহ.)-এর দরগাহ: পাখাওয়ালা থেকে ওলি

লালদীঘির পূর্ব পাশে হযরত শাহ সুফী আমানত খান (রহ.)-এর দরগাহ — বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় অষ্টাদশ শতকের শেষভাগের এই দরবেশ বিহার শরীফ থেকে এসে চট্টগ্রাম জজ কোর্টে পাখা টানার (পাখাওয়ালা) সামান্য চাকরি করতেন; দিনে কোর্টের কাজ, রাতে ইবাদত — নিজের আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্য গোপন রাখাই ছিল তাঁর রীতি। এক অলৌকিক ঘটনায় (করামত) তাঁর প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পেলে তিনি চাকরি ছেড়ে সাধনায় মগ্ন হন। আজও মাজারে বিশেষত মামলা-মোকদ্দমায় জয় ও মানসিক শান্তি কামনায় অগণিত মানুষ আসেন; ২৭শে রমজানের রাতে এখানে অসাধারণ ভিড় হয়। তাঁর নামেই শহরের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও কর্ণফুলীর শাহ আমানত সেতু — নামটি চট্টগ্রামবাসীর দৈনন্দিন জীবনের অংশ।

আরও যাঁরা শুয়ে আছেন এই মাটিতে

  • শাহ গরীবুল্লাহ (রহ.): শহরের গরীবুল্লাহ হাউজিং এলাকায় তাঁর দরগাহ; লোকশ্রুতিতে তিনি ছিলেন শাহজাহানপুত্র দারাশিকোহর সেবক, প্রভুর দুর্দশায় বৈরাগ্য ধারণ করে চট্টগ্রামে এসে খানকাহ গড়েন — কাহিনিটি যাচাইয়ের চেয়ে ভক্তিই এখানে প্রধান।
  • বদর আউলিয়া (বদর শাহ): চট্টগ্রামে ইসলাম প্রচারের প্রাচীনতম নামগুলোর একটি; শহরের বদরপাতি এলাকায় তাঁর সমাধি।
  • কদম মোবারক মসজিদ: ১৭১৯ সালে নির্মিত এই মসজিদে মহানবী (সা.)-এর পদচিহ্ন সংরক্ষিত আছে বলে বিশ্বাস করা হয় — নামের উৎস সেটাই।
  • জেলাজুড়ে আরও আছে আনোয়ারায় মোহসেন আউলিয়া আর ফটিকছড়িতে মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ — যেগুলোর বিস্তারিত আমাদের সংশ্লিষ্ট উপজেলা-গাইডে পড়তে পারবেন।

জিয়ারতের নিয়ম ও একদিনের রুট

  • প্রতিটি স্থানই সক্রিয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান — পোশাকে শালীনতা, নীরবতা ও ছবি তোলার ক্ষেত্রে স্থানীয় নিয়ম মানুন; মাজার চত্বরে জুতা নির্দিষ্ট জায়গায় রাখুন।
  • একদিনের রুট: সকালে বায়েজিদ বোস্তামীর মাজার (কাছিম দেখতে সকাল সেরা) → লালদীঘি এলাকায় শাহ আমানতের দরগাহ ও কদম মোবারক → বিকেলে গরীবুল্লাহ শাহের দরবার।
  • উরস ও বিশেষ রাতগুলোতে ভিড় অনেক বেশি থাকে — শান্ত জিয়ারত চাইলে সাধারণ দিন বেছে নিন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

বোস্তামীর পুকুরের কাছিম কি খাওয়ানো যায়?
হ্যাঁ, ঘাটে নির্দিষ্ট খাবার (কলা, খই) পাওয়া যায় — প্লাস্টিক বা ক্ষতিকর কিছু পানিতে ফেলবেন না।

অমুসলিম দর্শনার্থী কি মাজারে যেতে পারেন?
সাধারণত বাইরের চত্বর ও পুকুরঘাট সব ধর্মের মানুষের জন্য উন্মুক্ত; জিয়ারতের জায়গায় স্থানীয় নিয়ম ও শালীনতা মানা আবশ্যক।

শাহ আমানতের মাজারে বিশেষ ভিড় কখন?
২৭ রমজানের রাতে এবং উরসের সময়।

শেষকথা

মাজারগুলো চট্টগ্রামের শুধু ধর্মীয় নয়, সামাজিক ঐতিহ্যও — এখানে ইতিহাস, লোকবিশ্বাস আর প্রকৃতি একসূত্রে গাঁথা। জেলার উত্তরের তীর্থধারার সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে পারেন সীতাকুণ্ড: একেক মৌসুমে একেক সাজ। শ্রদ্ধা নিয়ে ঘুরুন, জ্ঞান নিয়ে ফিরুন!