ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় লাল ইটের যে বিশাল দোতলা ভবনটি এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে শহরের সবচেয়ে চেনা স্থাপত্য-ছবিগুলোর একটি, সেটি কার্জন হল — বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান অনুষদের ঠিকানা। লাল রঙের সম্মুখভাগ, সারি সারি খিলান আর সামনের প্রশস্ত বাগান মিলিয়ে এটি শুধু শিক্ষাভবন নয়, ঢাকার রাজনৈতিক ইতিহাসেরও নীরব সাক্ষী। পাশেই শাহবাগের বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর — দুটো মিলিয়ে আধাবেলার ঐতিহ্য-হাঁটা সাজানো যায়।
টাউন হলের পরিকল্পনা থেকে বিজ্ঞান অনুষদ
কার্জন হলের শুরু ঢাকা কলেজকে কেন্দ্র করে: ১৯০৪ সালে কলেজের গ্রন্থাগার হিসেবে এই ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা হয়, যার অর্থায়ন করেন ভাওয়াল রাজপরিবারের রাজকুমাররা (প্রায় দেড় লাখ রুপি); ১৯০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভাইসরয় লর্ড কার্জন ঢাকায় এসে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন, আর তাঁর নামেই ভবনের নাম হয় কার্জন হল (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। নির্মাণ শেষ হয় ১৯০৮ সালে। মাঝে বঙ্গভঙ্গের পর (১৯০৫) ঢাকা পূর্ববঙ্গ ও আসামের রাজধানী হলে ভবনটি প্রাদেশিক প্রশাসনের কাজে ব্যবহৃত হয় — কেউ কেউ বলেন, এটি নতুন প্রদেশের পরিষদ ভবনের উদ্দেশ্যেই গড়া হয়েছিল, যদিও বঙ্গভঙ্গ রদ হলে (১৯১১) তা আর হয়নি (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)। এরপর ঢাকা কলেজ এই ভবনে স্থানান্তরিত হয়, আর ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে কার্জন হল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের ভবনে পরিণত হয় — সেই পরিচয় আজও অটুট (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়/ইংরেজি উইকিপিডিয়া)।
স্থাপত্য ও প্রাঙ্গণ
ঢাকার স্থাপত্যের সেরা নমুনাগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃত এই ভবনে ইউরোপীয় ও মোগল রীতির সুখী মিশেল ঘটেছে — বিশেষত উত্তরের সম্মুখভাগের অশ্বখুরাকৃতি ও খাঁজকাটা (কাস্পড) খিলানে তা সবচেয়ে স্পষ্ট (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। কেন্দ্রীয় বিশাল হল, দুই পাশে শ্রেণিকক্ষ ও পরীক্ষার হল; সামনে ফুলের বাগান ও প্রশস্ত মাঠ, পেছনে বড় পুকুর — যার পাড়ে শেরেবাংলা ফজলুল হক হল (আদার ব্যাপারী)। প্রাঙ্গণে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেন, যা উদ্ভিদবিদ্যার পাঠ ও গবেষণায় ব্যবহৃত হয় (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। ভবনের উল্টোদিকে দোয়েল চত্বর ও শিশু একাডেমি — এলাকাটি হাঁটার জন্য মনোরম।
ভাষা আন্দোলনের সাক্ষী
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রথম প্রকাশ্য প্রতিবাদের অনেকটাই উচ্চারিত হয়েছিল এই ভবন ও এই ক্যাম্পাস থেকে; ১৯৪৮–৫৬ সালের ভাষা আন্দোলনের বহু সভা-মিছিলের কেন্দ্র ছিল কার্জন হল (ইংরেজি উইকিপিডিয়া/ইতিহাসের গল্প)। কাছেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ক্যাম্পাসের ভেতরে অপরাজেয় বাংলা ভাস্কর্য আর মধুর ক্যান্টিনের আড্ডা — বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাটি তাই স্থাপত্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক ইতিহাসের খোলা জাদুঘর। ক্যাম্পাস থেকে বকশিবাজারের দিকে একটু হাঁটলেই ঢাকেশ্বরী মন্দির ও হোসেনি দালান।
দর্শনার্থীদের জন্য তথ্য
কার্জন হল সক্রিয় শিক্ষাভবন — ক্লাস ও পরীক্ষা চলে এখানে। সাধারণ দর্শনার্থীরা সাধারণত বাইরের প্রাঙ্গণ, বাগান ও পুকুরপাড় ঘুরে দেখতে পারেন; ভবনের ভেতরে প্রবেশ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মের ওপর নির্ভরশীল — শান্ত পরিবেশ বজায় রাখুন, পাঠদান ব্যাহত করবেন না। সেরা সময়: সকালের আলোয় লাল ইটের রঙ সবচেয়ে সুন্দর ধরা পড়ে; সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ক্যাম্পাস তুলনামূলক শান্ত থাকে। যাতায়াত: মেট্রোরেলে শাহবাগ/ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন থেকে হাঁটা দূরত্ব; গুলিস্তান-নিউমার্কেট দিক থেকে রিকশাও সহজলভ্য।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
কার্জন হল কবে, কার নামে নির্মিত?
১৯০৪ সালে ভাইসরয় লর্ড কার্জন ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন; নির্মাণ শেষ ১৯০৮ সালে; অর্থায়নে ভাওয়ালের রাজকুমাররা (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)।
ভবনটি প্রথমে কী উদ্দেশ্যে গড়া হয়েছিল?
ঢাকা কলেজের গ্রন্থাগার/টাউন হল হিসেবে পরিকল্পনা হয়েছিল; পরে প্রাদেশিক প্রশাসন ও ঢাকা কলেজের ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয় (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)।
এখন কার্জন হলে কী হয়?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান অনুষদের শ্রেণিকক্ষ ও পরীক্ষার হল (আদার ব্যাপারী)।
সাধারণ মানুষ কি ভেতরে ঢুকতে পারে?
বাইরের প্রাঙ্গণ ঘোরা যায়; এটি সক্রিয় শিক্ষাভবন বলে ভেতরে প্রবেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতির বিষয়।
কাছাকাছি আর কী আছে?
শাহবাগে জাতীয় জাদুঘর, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, দোয়েল চত্বর এবং হাঁটা দূরত্বে ঢাকেশ্বরী মন্দির ও হোসেনি দালান।
শেষকথা
কার্জন হল ঢাকার সেই বিরল ভবন, যার লাল ইটে ঔপনিবেশিক আমল, ভাষা আন্দোলন আর একশ বছরের বিদ্যাচর্চা একসঙ্গে লেখা আছে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এলে শুধু ছবি তুলে নয়, বাগানের বেঞ্চে একটু বসে এই ইতিহাসটা অনুভব করে যান।